পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় সিপিআইএম–দলীয় বিধায়কের ‘পুশ ব্যাক’ নিয়ে বক্তব্যে বিতর্ক
ভারত সরকারের কথিত অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন পশ্চিমবঙ্গের বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান রানা। তিনি রাজ্যের বিধানসভায় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া–মার্ক্সিস্ট বা সিপিআইএমের একমাত্র বিধায়ক।
মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকল বিধানসভা থেকে নির্বাচিত সিপিআইএমের বিধায়কের এ অবস্থান বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, ভারতের মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বাংলাদেশে ভারতের ‘পুশ ব্যাক’ অনৈতিক ও আইনবহির্ভূত।
তবে ভারতে ‘পুশ ব্যাক’ এখন একটি স্বীকৃত ঘটনা। এটি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রচারমাধ্যম, নাগরিক সমাজ বা রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত এর বিরোধিতা করে না। কিন্তু বিধানসভায় একটি কমিউনিস্ট পার্টির একমাত্র সদস্য এই ধরনের মন্তব্য করায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ নিয়ে প্রবল বিতর্ক শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভারত যেটাকে পুশ ব্যাক বলছে, বাংলাদেশ সেটাকে বলছে ‘পুশ ইন’।
গত মঙ্গলবার বিধানসভায় মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী থাক এই রাজ্যে, [তা] আমরা কেউ চাই না।’
নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে এই বিধায়ক বলেন, ‘আমি জানি আমার বিজেপি বন্ধু বিধায়কেরা বলবেন, আপনারা ৩৪ বছর কী করেছেন? আমি বলতে চাইছি না সেটা। এই বিতর্ক করতে গেলে অন্তহীন বিতর্ক হবে, বিধানসভা সেটার জায়গা নয়, আমি বলছি অনুপ্রবেশকারী যাক, পুশ ব্যাক হোক। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ের যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের আছে…দেখেছেন বীরভূমের এক মহিলাকে হয়তো পুশ ব্যাক করে আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে, যার ফলে এটাতে একটা অংশের আমাদের দেশের নাগরিকদের মধ্যে…[আতঙ্ক তৈরি হয়েছে]।...কিন্তু আমাদের দেশের কোনো বৈধ নাগরিক যাতে এটাতে আতঙ্কিত না হয়, সে যে অংশেরই হোক, সে সংখ্যালঘু হতে পারে, সংখ্যাগুরু হতে পারে, এটাতে যেন কোনো ধরনের এ [বৈষম্য] না হয়…।’
এ পর্যন্ত কতজনকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়েছে, তার কোনো তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না উল্লেখ করে মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটা দুঃখের বিষয় যে অনুপ্রবেশকারী বলা হচ্ছে বারবার। কিন্তু নির্দিষ্ট সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে…এক দেড় মাস ধরে যে কথা বলা হচ্ছে বারবার…তার কিন্তু কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত বিধানসভায় পেলাম না।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক
কমিউনিজম বা সাম্যবাদ সাধারণভাবে আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী। তেমন আদর্শে বিশ্বাসী একটি দলের একমাত্র বিধায়কের এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একদিকে মুস্তাফিজুর রহমানকে তীব্র আক্রমণ করা হয়েছে, অন্যদিকে অনেকে বলেছেন, এই সময় দাঁড়িয়ে এটাই একটি কমিউনিস্ট দলের সঠিক অবস্থান।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রাইটসের সহসভাপতি রঞ্জিত শূর লিখেছেন, ‘মুর্শিদাবাদ থেকে নির্বাচিত সিপিএম বিধায়ক মুস্তাফিজুর আজ বিধানসভায় পুশ ব্যাক সমর্থন করে বক্তব্য রাখলেন। হায় লাল ঝান্ডা!’
এই কথা বলায় রঞ্জিত শূর বিজেপি ও সিপিআইএম দুই পক্ষ থেকেই আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তবে তাঁর সমর্থনেও কথা বলেছেন কেউ কেউ।
মুস্তাফিজুর রহমানের মন্তব্যের সমালোচনা করে একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘গোটা বক্তব্যটা শুনে এর একটাই ব্যাখ্যা হয়—উনি পুশ ব্যাক সমর্থন করেছেন। অবৈধ অনুপ্রবেশ বলাটাকেও সমর্থনই জানিয়েছেন, যেটাকে সমর্থন জানানো মানে পরোক্ষভাবে বিজেপি-আরএসএসের সিএএ, এনআরসি, এসআইআর-কে সমর্থন জানানো।’
ভারতের পুশ ব্যাক নীতির সমালোচনা করে ১৬ জুন একটি বিবৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বিবৃতিতে সংস্থাটির এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, ‘ভারতের কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়ে পরিবারগুলোকে বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে আসছেন এবং রেখে দিচ্ছেন। তাঁদের মানবাধিকারের প্রশ্নকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে এটা করা হচ্ছে।...একজন মানুষ যে দেশেরই হোন না কেন, তাঁকে কোনোমতেই দুই দেশের সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীর মধ্যে খোলা মাঠে রেখে দেওয়া উচিত নয়।’