পশ্চিমবঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার দপ্তরে হামলা হিন্দুত্ববাদীদের
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বাংলা সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকা হিন্দুত্ববাদীদের হামলার শিকার হলো। একদল বিক্ষোভকারী সংবাদপত্রের মধ্য কলকাতার প্রধান দপ্তরের সামনে বেশ কিছুক্ষণ স্লোগান দেয়, হিন্দুত্ববাদীদের পছন্দের গেরুয়া রঙে পত্রিকার প্রবেশপথের সাদা থাম রাঙিয়ে দেয়, গেরুয়া কাপড়ও জড়ায়।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে হিন্দুত্ববাদের সমর্থকদের ২০-৩০ জনের এই দল এরপরে পত্রিকার দপ্তরের সামনে বসে বেশ কিছুক্ষণ স্লোগান দেয়। আগাগোড়াই সেখানে পুলিশ থাকলেও তারা এই বিক্ষোভকারীদের সংবাদপত্রের অফিসে হামলা চালাতে বাধা দেয়নি। পরে পত্রিকার কর্তৃপক্ষ গেরুয়া থাম ফের সাদা রং করে দেয়। তবে এ ঘটনা নিয়ে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ দায়ের করেনি, কোনো বিবৃতিও দেয়নি। সংবাদপত্রের টেলিভিশন চ্যানেল বা ওয়েবসাইটেও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
হিন্দুত্ববাদী বিক্ষোভকারীরা দুপুরে আনন্দবাজার পত্রিকার অফিসের সামনে জড়ো হয় এবং ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেয়। তারা বলে, পশ্চিমবঙ্গ ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মাটি, বিবেকানন্দের মাটি, গেরুয়ার মাটি’ এবং সেখানে আনন্দবাজার পত্রিকার মতো ‘দিমাগি নকশালদের স্থান নেই’।
স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে এই শব্দবন্ধ ‘দিমাগি নকশাল’ ব্যবহার করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দিমাগি নকশাল অর্থাৎ বুদ্ধিমান নকশাল হিসেবে আনন্দবাজার পত্রিকাকে চিহ্নিত করে মঙ্গলবারের বিক্ষোভকারীরা। তাৎপর্যপূর্ণ, পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলনের সময় অর্থাৎ ১৯৬৯ সালেও আক্রান্ত হয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকা। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত আনন্দবাজার পত্রিকার ওপরে হামলা হয়েছে।
বামফ্রন্ট আমলে সংবাদপত্রটির দপ্তরে আগুন লাগার পর পত্রিকার বিরুদ্ধে সাংবাদিক বৈঠকও করেছিল সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন কলকাতা করপোরেশন। এর আগে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে বারবার আনন্দবাজার পত্রিকার নাম করে পত্রিকাটিকে আক্রমণ করেছেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এ রকম সংগঠিতভাবে পত্রিকার ওপরে হামলা হয়নি, পত্রিকার প্রবেশপথের রংও পাল্টে দেওয়া হয়নি।
আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের খোলাখুলি সংঘাত শুরু হয় গত ২০ আগস্টের পরে। ওই দিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনার এক দিন পরে আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের প্রথম পাতায় একটি শিরোনামে ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ কথাটি ব্যবহার করে। এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিজেপির পক্ষের লোকেরা বলতে শুরু করেন যে আনন্দবাজার পত্রিকা গেরুয়া অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদীদের রংকে অপমান করেছে।
এই শব্দচয়নের সমালোচনা করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংবাদপত্রের কর্তৃপক্ষকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলেন। তিনি জানান, গেরুয়া শব্দটিকে কালিমালিপ্ত করেছে আনন্দবাজার পত্রিকা। পাশাপাশি ‘হিন্দু জাগরণ মঞ্চ’ নামে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর বিরুদ্ধে বউবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়।
অন্যদিকে আনন্দবাজার পত্রিকার পক্ষেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রবল জনসমর্থন গত দুই সপ্তাহে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু মানুষ লিখেছেন, ভারতে বিজেপির বিরুদ্ধে যখন মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যম প্রায় কোনো অবস্থানই নিচ্ছে না, তখন আনন্দবাজার পত্রিকার বিজেপিবিরোধী এই অবস্থান প্রশংসনীয়। আনন্দবাজার পত্রিকার বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগের সমালোচনা করে সংবাদ সংস্থা ও সংবাদকর্মীদের অন্তত দুটি সর্বভারতীয় সংগঠন অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
মঙ্গলবারের হামলার পরও আনন্দবাজার পত্রিকার পক্ষে–বিপক্ষে মতামত সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ করা যায়। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও তাদের সমর্থকেরা যেমন এই হামলাকে সমর্থন জানিয়েছেন, অন্যদিকে এর নিন্দাও করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটসের তরফে রঞ্জিত শূর লিখেছেন, ‘গেরুয়া বাহিনী আজ আনন্দবাজার অফিসে গুন্ডামি করে প্রমাণ করে দিল আনন্দবাজার পত্রিকার “গেরুয়া গুন্ডামি” হেডিং কত ঠিক ছিল।’
পশ্চিমবঙ্গে কয়েক বছর ধরেই সংবাদকর্মীদের ওপরে নানা ধরনের আক্রমণ হয়েছে; কিন্তু সরাসরি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে বড় ধরনের আক্রমণ হয়নি। এ ঘটনার পরে বেসরকারি সংবাদ সংস্থার ওপরে আক্রমণ বাড়বে বলে সামাজিক মাধ্যমে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।