পাকিস্তানের ‘বন্ধু’ তুরস্ককে কেন কাছে রাখতে চাইছে ভারত

ভারত–তুরস্ক সম্পর্ক বুঝতে হলে শুধু কাশ্মীর, পাকিস্তান কিংবা রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সাম্প্রতিক অবস্থানের দিকে তাকালে হবে না। এর পেছনে কাজ করে ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, তুরস্কের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির আকাঙ্ক্ষা এবং বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা।

তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মুদাসসির কামারের তুর্কিয়ের ফরেন পলিসি আন্ডার দ্য একেপি: ইমপ্লিকেশনস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস ফর ইন্ডিয়া এই জটিলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দেয়। ভারতীয় গবেষক ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম এশিয়া অধ্যয়ন কেন্দ্রের সহযোগী অধ্যাপক মুদাসসির কামারের সম্প্রতি প্রকাশিত এই বইটিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোগত ভিত্তির পাশাপাশি কয়েকটি বিশেষ প্রবণতার কথা বলা হয়েছে।

এর মধ্যে আছে ‘কৌশলগত গভীরতা’ বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে শূন্য-সমস্যার নীতি, ‘ব্লু হোমল্যান্ড’ বা সমুদ্রকেন্দ্রিক কৌশল, এরদোয়ানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাব, প্যান-ইসলামবাদ এবং নব্য-উসমানীয় ভাবনা। কামারের বিশ্লেষণে, তুরস্ক নিজেকে শুধু ইউরোপের একটি দেশ বা ন্যাটোর সদস্য হিসেবে দেখে না। ইতিহাস ও ভৌগোলিক অবস্থান তাকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও এশিয়ার সঙ্গে একই সঙ্গে সম্পর্ক রাখার সুযোগ দিয়েছে।

এই আকাঙ্ক্ষার অবশ্য সীমাবদ্ধতাও আছে। তুরস্কের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন তার পররাষ্ট্রনীতির পরিসরকে প্রভাবিত করে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা পাকিস্তান।

কামারের বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, পাকিস্তান ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা ভারত ও তুরস্কের সম্পর্ককে সীমিত করে রেখেছে। তাঁর প্রস্তাব, পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে তুরস্ককে দেখার বদলে ভারতকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও কূটনীতির মাধ্যমে পাকিস্তান-ফ্যাক্টর থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আলাদা করার চেষ্টা করতে হবে।

এই জায়গাতেই বর্তমান ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের মূল দ্বন্দ্বটি ধরা পড়ে। দুই দেশের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য আছে। আবার একে অপরকে উপেক্ষা করার মতো বাস্তবতাও নেই।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত গবেষণা গ্রন্থ পিপলস মিশন টু দ্য অটোম্যান এম্পায়ার: এম এ আনসারি অ্যান্ড দ্য ইন্ডিয়ান মেডিকেল মিশন, ১৯১২–১২। ছবিতে দুই ভাই মোহাম্মদ আলী ও এম এ আনসারি। ১৯১২ সালের প্রথম বলকান যুদ্ধের সময় ভারতীয় মুসলিম সমাজের উদ্যোগে ডা. মুখতার আহমেদ আনসারির (এম এ আনসারি) নেতৃত্বাধীন একটি চিকিৎসা মিশন তুরস্কে যায়

পুরোনো সম্পর্কের গল্প

ভারত ও তুরস্কের সম্পর্ক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চেয়েও পুরোনো। ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে উসমানীয় সাম্রাজ্যের যোগাযোগ ছিল বাণিজ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি ও কূটনীতির নানা স্তরে। বিংশ শতকের গোড়ায় এই যোগাযোগ নতুন রাজনৈতিক অর্থ পায়।

১৯১২ সালের প্রথম বলকান যুদ্ধের সময় ভারতীয় মুসলিম সমাজের উদ্যোগে ডা. মুখতার আহমেদ আনসারির (এম এ আনসারি) নেতৃত্বাধীন একটি চিকিৎসা মিশন তুরস্কে যায়। এটি মূলত আহত উসমানীয় সেনাদের চিকিৎসায় সহায়তা করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। খিলাফত আন্দোলনের আগের এই সময়ের ঘটনাটি ভারতীয় উপমহাদেশে তুরস্কের প্রতি সহমর্মিতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের প্রতি ব্রিটিশ নীতির বিরোধিতা করেছিল ভারতীয় মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ। খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গেও তুরস্কের প্রশ্নটি গভীরভাবে যুক্ত ছিল। মহাত্মা গান্ধীও তুরস্কের প্রতি ব্রিটিশ নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। ভারতে গড়ে ওঠা খিলাফত আন্দোলনের প্রতিও তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন।

অর্থাৎ ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের শুরুতেই ছিল একধরনের ঐতিহাসিক সহমর্মিতা; কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব বদলে যায়।

হিসাব বদলে গেল

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে, ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শীতল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। তুরস্কও ন্যাটোর সদস্য হিসেবে পশ্চিমা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ দেশ ছিল। ফলে ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের ওপর পাকিস্তান-ফ্যাক্টর ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

কাশ্মীর প্রশ্ন এই দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করে। ভারত কাশ্মীরকে নিজের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ের অংশ হিসেবে দেখে। তুরস্ক বরং কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

এখানেই ঐতিহাসিক যোগাযোগের সঙ্গে নতুন ভূরাজনীতির সংঘাত শুরু হয়।

শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (ডানে) ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ব্রিকস সম্মেলনে দলীয় ছবি তোলার আগে। ২৭ জুলাই ২০১৮
ফাইল ছবি: রয়টার্স

এরদোয়ানের তুরস্ক ও নতুন সম্ভাবনা

এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে আরও সক্রিয় ও বহুমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও আঙ্কারা মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। ভারতও সেই বৃহত্তর কৌশলের বাইরে নয়।

দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক সব সময় মসৃণ না হলেও বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি থেমে যায়নি।

২০১৯ সাল সম্পর্কের বড় মোড়

২০১৯ সালে ভারত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করার পর ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। এরদোয়ান ভারতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন এবং কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান।

দিল্লি এতে অসন্তুষ্ট হয়। ভারতের দৃষ্টিতে কাশ্মীর প্রশ্নে তুরস্কের অবস্থান ছিল ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং দ্বিপক্ষীয় বিরোধকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নেওয়ার চেষ্টা। তবে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। কূটনীতির দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

পাকিস্তান: সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকা তৃতীয় দেশ

ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো এখানে প্রায় সব সময় একটি তৃতীয় দেশ উপস্থিত থাকে। সেটি পাকিস্তান।

তুরস্ক ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। সামরিক সরঞ্জাম, যুদ্ধজাহাজ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং ড্রোনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা ভারতের নজরে এসেছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলের পাকিস্তানে গিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্প, বিমান প্রযুক্তি ও ড্রোনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।

তুরস্কের জন্য পাকিস্তান শুধু একটি ঘনিষ্ঠ মুসলিম দেশ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে ভারতের কাছে তুরস্ক–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সরাসরি নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আঙ্কারা ইসলামাবাদের যত কাছে যায়, দিল্লির সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর তত চাপ তৈরি হয়।

পুরোনো বিরোধ নতুন মাত্রা পেল

২০২৫ সালের এপ্রিল ও মে মাসের ভারত–পাকিস্তান সংঘাত এই সম্পর্কের টানাপোড়েনকে আরও তীব্র করে। ওই বছরের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরে হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ে। ৭ মে ভারত পাকিস্তানের ভেতরে সামরিক অভিযান চালায়। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করে সংঘর্ষ হয়।

সংঘাতের সময় তুরস্ক পাকিস্তানের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়, অপারেশন সিন্দুরের পর ভারত–তুরস্ক সম্পর্ক একপর্যায়ে তলানিতে নেমে গিয়েছিল।

পাকিস্তানের ব্যবহৃত ড্রোন নিয়েও তুরস্কের ভূমিকা আলোচনায় আসে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। সংঘাতে ব্যবহৃত সব ড্রোন তুরস্কের তৈরি ছিল না। পাকিস্তানের নিজস্ব এবং অন্য দেশের তৈরি ড্রোনও ব্যবহৃত হয়েছে। তুরস্কের তৈরি ড্রোন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ছিল বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সম্পর্কের একটি অংশ। অর্থাৎ ড্রোনের প্রশ্নটি শুধু সামরিক প্রযুক্তির বিষয় নয়, ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের বৃহত্তর কৌশলগত টানাপোড়েনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকে করমর্দন করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। চীনের তিয়ানজিনে, ৩১ আগস্ট ২০২৫
ছবি: রয়টার্স

শুধু ড্রোন নয়, ভূরাজনীতিও আছে

ভারতের জন্য তুরস্কের গুরুত্ব শুধু পাকিস্তানের সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণে নয়। তুরস্ক এমন একটি ভূগোলে অবস্থিত, যেখানে কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, মধ্যপ্রাচ্য, বলকান ও ইউরোপ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের পর কৃষ্ণসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। একই সঙ্গে ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় তুরস্কের সক্রিয়তা ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আজারবাইজানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এর একটি উদাহরণ। অন্যদিকে ভারত আর্মেনিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরেও ভারতের গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে। এগুলোকে সরাসরি তুরস্কবিরোধী জোট বলা ঠিক হবে না; বরং ভারতের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এগুলোকে দেখা যায়।

ভারত মধ্য এশিয়ায় নিজের উপস্থিতি বাড়াতে চায়, ইউরোপের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যপথ ও যোগাযোগের সুযোগ খুঁজছে। তুরস্ক সেই ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি দরজা।

তাহলে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে গেল না কেন?

এর সহজ উত্তর অর্থনীতি এবং বাস্তববাদ।

ভারত ও তুরস্কের মধ্যে পণ্যবাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও ব্যবসায়ী মহলের যোগাযোগ পুরোপুরি থেমে যায়নি। ভারতের জন্য তুরস্ক যেমন একটি বড় বাজার ও ইউরোপ-এশিয়া সংযোগের সম্ভাব্য সেতু, তুরস্কের কাছেও ভারত একটি বিশাল বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ এশীয় শক্তি।

অর্থনীতি অবশ্যই রাজনীতির বিকল্প নয়; কিন্তু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও অর্থনৈতিক স্বার্থ অনেক সময় সম্পর্কের একটি ন্যূনতম ভিত্তি ধরে রাখে।

ভারতের জন্য তুরস্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ?

প্রথমত, তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তুরস্ক মধ্য এশিয়া ও ককেশাসে নিজের প্রভাব বাড়াচ্ছে। ভারতেরও এই অঞ্চলগুলোতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে।

তৃতীয়ত, তুরস্ক ইউরোপের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের বৃহত্তর ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যপথ, জ্বালানি, পরিবহন ও সংযোগের প্রশ্নে তুরস্ককে বাদ দিয়ে ভারতের হিসাব পুরোপুরি করা কঠিন।

চতুর্থত, তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি খারাপ হলে ভারত পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে আঙ্কারার নীতিতে প্রভাব ফেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারাতে পারে।

এ কারণেই দিল্লির কৌশল সম্ভবত তুরস্ককে বন্ধু বা শত্রু হিসেবে এক কথায় চিহ্নিত করার বদলে সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে আলাদা করে দেখা।

তুরস্কের জন্য ভারতও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়

বিষয়টি শুধু ভারতের প্রয়োজনের নয়। তুরস্কেরও ভারতের প্রয়োজন আছে।

ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতি এবং বিশাল একটি বাজার। তুরস্ক যদি নিজেকে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, মুসলিম বিশ্ব ও এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে ভারতের মতো বড় অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক উপেক্ষা করা তার জন্যও সহজ নয়।

পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই সম্পর্কের কারণে ভারতকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দিলে আঙ্কারাকেও কিছু অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ হারাতে হবে।

সেখানেই দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তববাদী দিকটি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়।

সম্পর্কের এই বাস্তবতাই হয়তো ২০২৬ সালে দুই দেশকে আবার আনুষ্ঠানিক আলোচনার টেবিলে এনেছে।

৮ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ভারত–তুরস্ক পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের ১২তম আলোচনা। ভারতের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব পশ্চিম সিবি জর্জ এবং তুরস্কের পক্ষে ছিলেন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিস একিনজি।

আলোচনার পুনরারম্ভের তাৎপর্য আছে। কারণ এটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন কাশ্মীর, পাকিস্তান ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য স্পষ্ট। তারপরও দুই দেশ আলোচনায় বসেছে। অর্থাৎ মতপার্থক্য থাকলেও সম্পর্কের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়ার নীতি তারা নেয়নি।

ভারত চায়, পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা যেন ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের সব ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ না করে। তুরস্কও চায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও ভারতের বাজার, অর্থনীতি ও কৌশলগত গুরুত্বকে উপেক্ষা না করতে।

যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের পর (বাঁ থেকে) তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। সৌদি আরবের মক্কায়। ৭ আগস্ট ২০২৬
ছবি: এএফপি

মক্কা চুক্তি কি নতুন হিসাব তৈরি করছে?

৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও যৌথ প্রতিরোধক্ষমতা জোরদারের কথা বলা হয়েছে।

ভারতের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণে। প্রথমত, পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এখন একটি আনুষ্ঠানিক ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরব এই কাঠামোর অংশ হওয়ায় এর ভূরাজনৈতিক পরিসর পাকিস্তান–তুরস্ক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে গেছে।

তবে মক্কা চুক্তিকে সরাসরি ভারতবিরোধী জোট বলা ঠিক হবে না। চুক্তির ঘোষিত উদ্দেশ্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরোধক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করা। তুরস্কও এটিকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট হিসেবে উপস্থাপন করেনি; বরং চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে অন্য দেশ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।

তারপরও ভারতের জন্য একটি বাস্তব প্রশ্ন থেকে যায়। পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা যদি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে ভারত–তুরস্ক সম্পর্ককে পাকিস্তান-ফ্যাক্টর থেকে আলাদা রাখার দিল্লির চেষ্টা আরও কঠিন হতে পারে।

এই জায়গায় মুদাসসির কামারের বিশ্লেষণটি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি যে পাকিস্তানকে ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, মক্কা চুক্তি সেই সীমাবদ্ধতাকে আরও বড় আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে এসেছে।

আর ২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্যও দেখা যাচ্ছে। এপ্রিল মাসে দিল্লি ও আঙ্কারা আবার পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের আলোচনায় বসেছে। আগস্টে আঙ্কারা আবার ইসলামাবাদ ও রিয়াদের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় গেছে। অর্থাৎ একই বছরে দুই ধরনের বার্তা। একদিকে ভারত ও তুরস্ক সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তুরস্ক পাকিস্তানের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক করছে।

মুদাসসির কামারের তুর্কিয়ের ফরেন পলিসি আন্ডার দ্য একেপি: ইমপ্লিকেশনস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস ফর ইন্ডিয়া

সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোথায়?

ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ তিনটি বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে নির্ভর করবে।

প্রথমত, কাশ্মীর প্রশ্নে তুরস্কের অবস্থান কতটা বদলায়।

দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা কোন দিকে যায়।

তৃতীয়ত, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, পর্যটন এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ দুই দেশকে কতটা কাছাকাছি রাখে।

এর সঙ্গে এখন আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে। মক্কা চুক্তি কি শুধু সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যে সীমিত থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে এটি আরও বড় আঞ্চলিক কাঠামো হয়ে উঠবে?

ভারতের জন্য উত্তরটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চুক্তির পরিসর যত বাড়বে, তুরস্কের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে পাকিস্তান-ফ্যাক্টর থেকে আলাদা রাখার চ্যালেঞ্জও তত বাড়তে পারে।

তবু ভারত–তুরস্ক সম্পর্ককে শুধু বন্ধুত্ব কিংবা বিরোধের খাতায় রাখা কঠিন। এখানে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা পাশাপাশি থাকবে। থাকবে মতপার্থক্য, আবার প্রয়োজনের জায়গায় যোগাযোগও থাকবে।

একসময় ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। পরে সেই জায়গা অনেকটাই দখল করে নেয় পাকিস্তান ও কাশ্মীরের রাজনীতি। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ভূরাজনীতি, বাণিজ্য, মধ্য এশিয়া, ককেশাস, ইউরোপ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং মক্কা চুক্তির মতো নতুন নিরাপত্তা কাঠামো।

তাই ভারত তুরস্ককে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে দিতে পারছে না। আবার তুরস্কের সঙ্গেও এমন কোনো সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না, যেখানে পুরোনো মতপার্থক্যগুলো সহজে মুছে যাবে।

সম্ভবত এটাই ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের সবচেয়ে বাস্তব চিত্র। দুই দেশ একে অপরের সঙ্গে একমত নয়; কিন্তু একে অপরকে উপেক্ষাও করতে পারছে না।

তথ্যসূত্র:

১. মুদাসসির কামার, তুর্কিয়ের ফরেন পলিসি আন্ডার দ্য একেপি: ইমপ্লিকেশনস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস ফর ইন্ডিয়া, পেন্টাগন প্রেস।

২. ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভারত–তুরস্ক পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের ১২তম বৈঠক, ৮ এপ্রিল ২০২৬।

৩. মক্কা শীর্ষ সম্মেলনের যৌথ প্রতিরক্ষা বিবৃতি, ৭ আগস্ট ২০২৬।

৪. রয়টার্স ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন।