সরকার পতন নয়, অবাধ নির্বাচন চাই: বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের সঙ্গে তুলনার জবাবে শশী থারুর

শশী থারুরছবি: এএনআই

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ বা ফ্রান্সের পরিস্থিতির তুলনার দাবি নাকচ করে দিয়েছেন কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুর। সোমবার তিনি বলেছেন, তাঁদের বিরোধী দলের মূল দাবি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন—সরকার ফেলে দেওয়া নয়।

এর আগে রোববার এক্সে এক পোস্টে ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদবিষয়কমন্ত্রী কিরেন রিজিজু অভিযোগ করে বলেছিলেন, ভারতবিরোধী গোষ্ঠী ও কিছু রাজনীতিক মিলে তরুণদের উসকে সহিংসতা ছড়ানোর ষড়যন্ত্র করেছে। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের অস্থিরতার মতো একই ধরনের একটি ষড়যন্ত্র ভারতেও করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

মূলত কিরেন রিজিজুর ওই পোস্ট নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শশী থারুর এ কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ভারত কখনোই সহিংসতা সমর্থন করে না। যেকোনো আন্দোলন শান্তিপূর্ণ হওয়া উচিত। অন্য দেশের অস্থিরতার সঙ্গে ভারতের এই তুলনার যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

থারুর বলেন, ‘আমার মনে হয়, ভারত বাংলাদেশ নয়, আর ভারত ফ্রান্সও নয়। আমি এই ধরনের তুলনার কোনো যৌক্তিকতা দেখি না...ফ্রান্সে বাস ও থানায় আগুন দেওয়ার মতো যেসব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, আমরা কখনোই সেগুলো সমর্থন করি না।

আমরা কেবল শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাস করি...আমি নিজেও এ ধরনের আন্দোলনেই অংশ নিয়েছি। আর আমি বিশ্বাস করি, সাধারণ অর্থে বিরোধীরা এটাই সমর্থন করে...আর বৃহত্তর সমস্যাগুলোর কথা যদি বলি, তবে ‘সরকার বদল’ বা এই ধরনের কথাগুলোকে বিকৃত করার কোনো মানে হয় না...আমরা শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দাবি করছি...বর্তমানে উদ্বেগের বিষয় হলো, একটি সম্পূর্ণ ঝামেলাপূর্ণ, অনিয়মিত এবং আংশিক বেআইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই আমরা এসব বাতিল করার দাবি জানাচ্ছি...এটি একটি সাংবিধানিক বিষয়। এটি কোনো সরকার ফেলার চেষ্টা বা ওই জাতীয় কিছু নয়...।’

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করার জন্য নাগরিকদের অধিকারের পক্ষেও কথা বলেন শশী থারুর। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে তাঁর এই সমালোচনা এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ করার ধরন নিয়ে, তাদের অস্তিত্ব নিয়ে নয়।

‘...গণতন্ত্র কারও দেওয়া উপহার নয়...আমরা, ভারতের সাধারণ নাগরিকেরাই এর রক্ষক...আমাদের গণতন্ত্র রক্ষার অধিকার প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের আছে...আমি শুধু এটাই বলছি যে নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা ঠিকমতো আচরণ করতে বলছি। ভারতের গণতান্ত্রিক সংবিধান অনুযায়ী তাদের যে দায়িত্ব পালন করার কথা, সেটাই তাদের করতে বলছি। বিষয়টা শুধুই এতটুকুই। আমি কোনোভাবেই একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করছি না। তারা যেভাবে আচরণ করছে এবং যেভাবে নিজেদের পরিচালিত করছে, আমি শুধু সেটাকেই চ্যালেঞ্জ করছি। আর সত্যি বলতে, এ বিষয়টি নিয়ে ভারতের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের সবারই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত...।’—       বলেন শশী থারুর।

‘সরকার বদল’ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া ওই পোস্টে রিজিজু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে যে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এবং ফ্রান্সে যে দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে, ভারতের জন্যও ঠিক তেমনই একটি ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।’ তিনি জোর দিয়ে আরও বলেন, ভারতে সরকার পরিবর্তন কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই হতে পারে।

এরপর প্রবীণ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে চলা এই আন্দোলনকে ‘সরকার বদলের লড়াই’ বলে মন্তব্য করলে বিতর্ক আরও জোরালো হয়। এ ছাড়া অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরাও বাংলাদেশে ‘জেন–জি’ বা নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

এর আগে রিজিজু অভিযোগ করেছিলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও কর্মীরা অস্থিরতা তৈরি করতে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিতিশীল করতে রাস্তার আন্দোলনকে ব্যবহার করছে।

মাস্কের স্টারলিংক প্রসঙ্গে থারুরের মন্তব্য

ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক নিয়ে ইলন মাস্কের সাম্প্রতিক মন্তব্যেরও জবাব দিয়েছেন থারুর। থারুর বলেন, সরকার জানিয়েছে এই সেবা দেওয়ার জন্য দরপত্র জমা দেওয়া সব কোম্পানিই একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং একই রকম সময়ক্ষেপণের সম্মুখীন হচ্ছে।

‘সরকারের এই অবস্থানকে যদি আমরা আক্ষরিক অর্থে ধরি, তার মানে হলো এই লাইনে মাস্ক খুব একটা পিছিয়ে নেই, আর আম্বানিও খুব একটা এগিয়ে নেই। আমার মনে হয়, প্রক্রিয়াটি শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাদের শুধু অপেক্ষা করতে হবে...এখানে বেশ কিছু বিষয় রয়েছে। প্রযুক্তির প্রশ্ন আছে, নির্দিষ্ট কিছু নিরাপত্তার বিষয় আছে, স্যাটেলাইট আপলিংকিংয়ের নানা খুঁটিনাটি আছে এবং সবশেষে খরচের বিষয়টিও আছে।’—বললেন থারুর।

থারুর বলেন, ‘শেষ বিষয়টির (খরচ) সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষই নেবে। আপনি যদি আমাকে কোনো সেবা দেন এবং অন্য কেউ যদি সেই একই সেবা ১০ গুণ দামে দেয়, তবে আমি হয়তো আপনার থেকেই সেটা নেব। আর আমার যদি সত্যি মনে হয় যে তার সেবাটি ১০ গুণ টাকা দিয়ে কেনার মতোই ভালো, তবে আমি তাকেই টাকাটা দেব। এটা প্রত্যেক গ্রাহককে নিজেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমার সাধারণ ইন্টারনেট সংযোগ নিয়েই আমি বেশ খুশি। আমি নিজে স্টারলিংক খুঁজছি না। কিন্তু যদি এমন কেউ থাকে যাদের কাছে এসব দরকারি মনে হয়, তবে একটি স্বাধীন দেশে তাদের সেই সুযোগ পাওয়া উচিত।’