ভারতে ‘তেলাপোকাদের’ দাবি মেনে এফআইআর খারিজ করলেন সুপ্রিম কোর্ট
‘তেলাপোকাদের’ দাবি আবার মেনে নিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। যন্তর মন্তর আন্দোলনের সময় গত ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখী পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে এবং তারপর ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যত এফআইআর দায়ের হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট গতকাল মঙ্গলবার বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সব খারিজ করে দিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের অনুরোধেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত ককরোচ জনতা পার্টিকে (সিজেপি) খুশি করেছে। ফলে তারাও ৫ সেপ্টেম্বরের প্রস্তাবিত বিক্ষোভ মিছিল করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।
এর ফলে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগে কেন্দ্রীয় সরকার এক বড়সড় বিড়ম্বনা এড়াতে পারল। ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে বসছে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন।
নয়াদিল্লিতে যন্তর মন্তর আন্দোলনের সময় সিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, তাতে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে সব এফআইআর প্রত্যাহারের দাবি ছিল অন্যতম। জেন-জি প্রজন্মের দাবি মেনে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। সিজেপি নেতাদের অন্য দুটি দাবির একটি ছিল আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে দিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্য পুলিশের করা এফআইআর প্রত্যাহার।
অন্যটি ছিল নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর দেশজুড়ে যেসব পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিলেন, তাঁদের পরিবারকে এককালীন অর্থ সাহায্য করা। এই দুই দাবি মানতে টালবাহানা করায় সিজেপি নেতৃত্ব ৫ সেপ্টেম্বর দিল্লির ইন্ডিয়া গেট থেকে মিছিল করে পুলিশ সদর দপ্তরে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
বিক্ষোভ মিছিলে জেন-জি অটল থাকায় এবং তাদের বিরত করতে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপে অস্বীকার করায় কেন্দ্রীয় সরকার এই পদক্ষেপে বাধ্য হয় বলে মনে করা হচ্ছে।
সিজেপির বিক্ষোভ সমাবেশ রুখতে শাসকগোষ্ঠীর অনুগত কেউ কেউ সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন। তাঁদের আরজি ছিল, ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আগে এ ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ দেশের ভাবমূর্তির পক্ষে ক্ষতিকর। অতএব তা বন্ধে সর্বোচ্চ আদালত হস্তক্ষেপ করুন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই আরজি খারিজ করে দেন।
এর পরেই গতকাল সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশ। কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর এজলাসে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে যেন সব এফআইআর খারিজ করে দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে সলিসিটর জেনারেল এ কথাও বলেন, যেসব পরীক্ষার্থী নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দরুন আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। সে জন্য সরকার ৯০ দিন সময় চেয়েছে।
সিজেপি নেতাদের দাবি ছিল, আত্মহত্যা করা পড়ুয়াদের পরিবার পিছু ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক। সিজেপির সঙ্গে আলোচনার সময় দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং সেই দাবি নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছিলেন বলে পড়ুয়াদের দাবি।
কেন্দ্রীয় সরকারের আরজি মেনে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের পরেই সিজেপি নেতারা তাঁদের প্রস্তাবিত বিক্ষোভ মিছিল প্রত্যাহার করে নেন। সিজেপির যুগ্ম আহ্বায়ক সৌরভ দাস এক বিবৃতিতে সে কথা বলেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের আরজি মেনে সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপ সিজেপি নেতৃত্ব নিজেদের জয় বলে মেনে নিচ্ছেন। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, মহারাষ্ট্রসহ অন্যান্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ২০-২৫ জুলাইয়ের আন্দোলনের জন্য দায়ের করা এফআইআর বাতিল তো হলোই, ওই অপরাধে কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নতুর করেও কোনো এফআইআর দায়ের করা যাবে না। দায়ের করা সব মামলা খারিজ বলে ধরে নেওয়া হবে। ফলে ১৩০টিরও বেশি এফআইআর গতকাল খারিজ হয়ে গেল।
সিজেপি নেতাদের মতো দিল্লি পুলিশও অবশ্য মনে করছে, এই সিদ্ধান্তে তারাও জয়ী। কারণ, তারা তাদের মনোভাবে অটল থাকতে পেরেছে। যন্তর মন্তরে ছাত্রসমাজের আন্দোলন ও ২০ জুলাই সংসদমুখী অভিযানকে কেন্দ্র করে ঘটা হিংসাত্মক ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ দিল্লি পুলিশ মোট ২ হাজার ৮৭৩ জনকে চিহ্নিত করেছে, যাদের বিরুদ্ধে অতীত অপরাধের অভিযোগ আছে। সেই সব অভিযোগ গুরুতর।
দিল্লি পুলিশ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ‘ফেশিয়াল রেকগনিশন’ করে এই সিদ্ধান্তে এসেছে। এই ব্যক্তিদের ছেড়ে দিতে দিল্লি পুলিশ রাজি হচ্ছিল না। তাদের দাবি, চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অতীতে নানা ধরনের গুরুতর অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সুপ্রিম কোর্টের পদক্ষেপের পর তাঁদের বিরুদ্ধে অতীত অপরাধের অভিযোগে নতুন করে মামলা করা যাবে।