ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের পুরোনো মামলায় পশ্চিমবঙ্গের কবি শ্রীজাতের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি আদালত। দীর্ঘ সাত বছর আগে একটি কবিতার মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে করা একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত এই আদেশ দিয়েছেন।

তবে শ্রীজাত বলেছেন, ভারতবর্ষে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, এর থেকেই তা অনুমেয়। সাত বছর আগের মামলায় শ্রীজাতের বিরুদ্ধে নির্বাচনের আগের দিন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়েছে।

সাধারণভাবে শ্রীজাতকে হিন্দুত্ববাদবিরোধী কবি বলে মনে করা হয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পছন্দের মানুষ কবি শ্রীজাত।

শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় আজ বুধবার দুপুরে কলকাতার এক টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এ ঘটনা প্রমাণ করছে, এই মুহূর্তে মানুষ কী অবস্থায় রয়েছে।

কবি শ্রীজাত বলেন, ‘আমি যেটুকু শুনেছি, কয়েক বছর আগে একটি মামলা হয়েছিল। সেই মামলায় এ ধরনের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার জারি করা হয়েছে। এটিই বলে দেয়, আমরা কোন সময় বাস করছি। দার্শনিক প্লেটো বলেছিলেন, আদর্শ রাষ্ট্রে কবির কোনো জায়গা হতে পারে না। আমরা হয়তো আদর্শ রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগোচ্ছি, যেখানে কবির কোনো জায়গা নেই।’

শ্রীজাত বলেন, ‘গলা খুলে, মাথা তুলে কথা বলা তো নানান সমাজে অন্যায় বলে বিচার করা হয়। হয়তো সেই অন্যায় আমার একটু বেশি হয়ে গেছে, তার মাশুল দিতে হবে।’

কোন পরিপ্রেক্ষিতে এই পরোয়ানা

২০১৭ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা একটি কবিতার জেরেই এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। পরোয়ানাটি জামিন অযোগ্য। ২০১৭ সালে শ্রীজাতের কবিতাটি প্রকাশিত হয়। ওই সময় উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যোগী আদিত্যনাথ শপথ নেওয়ার পর শ্রীজাত তাঁর ফেসবুকে ‘অভিশাপ’ শীর্ষক ১২ লাইনের একটি কবিতা প্রকাশ করেন।

কবিতার শেষ দুই লাইনের শব্দচয়ন নিয়ে বড়সড় বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন দাবি করে, কবি হিন্দুদের পবিত্র প্রতীক ‘ত্রিশূল’ নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছেন।

কবিতা প্রকাশের পর অর্ণব সরকার নামের শিলিগুড়ির এক কলেজছাত্র শিলিগুড়ি থানায় শ্রীজাতের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধের অভিযোগে লিখিত অভিযোগ করেন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫–এ (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত) এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭ ধারায় মামলাটি করা হয়।

সে সময় শ্রীজাতের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলের বড় অংশ। তাঁর সুরক্ষায় রাজ্য সরকারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই মামলার জেরেই শিলিগুড়ি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে এখন জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

নির্বাচনের এক দিন আগে আদালতের এই নির্দেশ পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছে। লেখক, শিল্পীর স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত—এই দুয়ের যে বিরোধ, তা নিয়ে তর্কবিতর্কে উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজ্যের রাজনীতিতে।

একে তো কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বিপুল পরিমাণে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে রাজ্যে। আবার ৯২ লাখ ভোটারকে বাদ দিয়ে এই নির্বাচন হচ্ছে। তার ওপর রাজ্যের প্রথম সারির এক কবিকে গ্রেপ্তারের ফলে মেরুকরণ দ্রুত আরও গভীর হচ্ছে। পরিস্থিতি ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।