মরদেহটা ওলটানোর পর দেখা গেল এক লাইফ জ্যাকেটে মা–ছেলে, জড়িয়ে ধরে আছেন দুজনই

বার্গি বাঁধের জলাধারে ডুবে যাওয়া নৌকাটির নিচে ভাসছে লাইফ জ্যাকেটে থাকা মরদেহ। জবলপুর, মধ্যপ্রদেশ, ভারত। ১ মে ২০২৬ছবি: এএনআইয়ের ভিডিও থেকে

বৃহস্পতিবার বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৫টা। ত্রিজা চৌহানের (৩৬) মুঠোফোনটি বেজে ওঠে। বোন মেরিনা ভিডিও কল দিয়েছেন। মেরিনা তখন বার্গি বাঁধের জলাধারে পর্যটকবাহী নৌকায় করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ত্রিজা কলটি ধরার পর দেখতে পান বাতাসে হাস্যোজ্জ্বল মেরিনার চুল বাতাসে উড়ছে। এরপর মেরিনা ক্যামেরা ঘুরিয়ে নৌকা ও অন্য যাত্রীদের দেখান ত্রিজাকে।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের জবলপুর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে এই জলাধার। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে ৪৩ জনকে নিয়ে ঝোড়ো হাওয়ার তোড়ে নৌকাটিতে দুলতে শুরু করে। একপর্যায়ে পানি ঢুকে নৌকাটি ডুবে যায়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৯ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। তিন শিশুসহ নিখোঁজ রয়েছে ৪ জন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মেরিনা ও তাঁর চার বছরের ছেলে ত্রিশান। যখন তাঁদের মরদেহ পাওয়া যায়, তখন ত্রিশান মায়ের লাইফ জ্যাকেটের ভেতরে। মা বুকে ছেলেকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। মারা গেছেন মেরিনার মা মধু ম্যাসিও।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে দিল্লি ক্যান্টনমেন্টে বাবা-মায়ের বাড়িতে বসে হিন্দুস্তান টাইমসের সঙ্গে ত্রিজা কথা বলছিলেন আর কাঁদছিলেন। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ত্রিজা বলেন, বিকেলে কল দিয়ে মেরিনা বলল, ‘দেখো ত্রিজা, জায়গাটা কত সুন্দর...বাঁধটা দেখো, পানিটা দেখো!’

ত্রিজার মুঠোফোনে মেরিনার পরের কলটি আসে সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে। ত্রিজা বলেন, ‘ও প্রচণ্ড আতঙ্কিত ছিল। চিৎকার করছিল, কাঁদছিল আর বলছিল তারা ডুবে যাচ্ছে। ও আমাকে ওদের জন্য প্রার্থনা করতে বলল। বারবার বলছিল, “আমাদের বাঁচাও, আমাদের বাঁচাও” এবং এরপর কলটি কেটে যায়।’

এরপরও বেশ কয়েকবার ত্রিজা যোগাযোগের চেষ্টা করেন উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি বেশ কয়েকবার কল করি, কিন্তু কেউ ধরেনি...বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে যখন ও আমাকে কল করেছিল, তখন তাদের কারও গায়ে লাইফ জ্যাকেট ছিল না। ওই সময় বিষয়টাতে আমি অবাক হলেও আমি কিছু বলিনি। কারণ, চারপাশের দৃশ্য দেখানোর সময় মেরিনাকে খুব খুশি দেখাচ্ছিল।’

বার্গি বাঁধের জলাধারে ডুবে যাওয়া নৌকাটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে টেনে তোলা হচ্ছে। জবলপুর, মধ্যপ্রদেশ, ভারত। ১ মে ২০২৬
ছবি: এএনআই

স্থানীয় লোকজনের হিসাবে ‘নর্মদা কুইন’ নামের নৌকাটিতে অন্তত ৪৩ জন যাত্রী ছিল। আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে এটি ডুবে যায়। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, জানা গেছে, নৌকাটিতে ভ্রমণের জন্য টিকিট কাটা হয়েছিল মাত্র ২৯টি। সেদিন আবহাওয়া দপ্তর আগেই ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল তীব্র বৈরী আবহাওয়া ও ঝোড়ো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এবং বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এরপরও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই এই নৌকাটিকে বার্গি বাঁধের জলাধারে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছিল।

এ ঘটনার শেষ মুহূর্তের দিককার একটি ভিডিও প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে দেখা যায়, যাত্রীরা যাঁর যাঁর আসনে বসে আছেন আর নৌকায় হঠাৎ করে পানি ঢুকতে শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হাসিগুলো মিলিয়ে আতঙ্কের দৃশ্যে পরিণত হয়। নৌকাটি প্রচণ্ডভাবে দুলতে থাকে।

নৌকা ডুবতে শুরু করার পর নৌকাটির কর্মীদের তাড়াহুড়ো করে বেঁধে রাখা লাইফ জ্যাকেটগুলো খুলতে দেখা যায়। যাত্রীরা ছোটাছুটি শুরু করেন, অনেকের গায়ে লাইফ জ্যাকেট ছিল না এবং তাঁরা মরিয়া হয়ে সিল করা স্টোরেজ থেকে সেগুলো বের করার চেষ্টা করছিলেন।

বেঁচে ফেরা যাত্রীদের অভিযোগ, নৌযানটিতে মৌলিক নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করা হয়নি। এবং প্রবল ঝড়ের মধ্যে যাত্রীদের ভাগ্য তাঁদের নিজেদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই ভিডিও তাঁদের এই অভিযোগগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে।

হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, ৩৯ বছর বয়সী মেরিনা তাঁর বাবা জুলিয়াস (৭০) ও মা মধু ম্যাসি (৬২), স্বামী প্রদীপ কুমার ভার্মা (৩৯), মেয়ে সিয়া (১৪) এবং ছেলে তৃশানকে (৪) নিয়ে নৌকায় ছিলেন।

ডুবে যাওয়া নৌকাটি উদ্ধারের দৃশ্য দেখতে জড়ো হয়েছেন স্থানীয় লোকজন। জবলপুর, মধ্যপ্রদেশ, ভারত। ১ মে ২০২৬
ছবি: এএনআই

মেরিনার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা জুলিয়াস জানান, নৌকাটি যখন ঢেউয়ের আঘাতে আছড়ে পড়ছিল, তখন মেরিনা তৃশানকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, আর তাঁর স্বামী প্রদীপ, যিনি সাঁতার জানতেন, তিনি মেয়ে সিয়ার সঙ্গে ছিলেন। শুক্রবার উদ্ধারকারীরা যখন মেরিনা ও তৃশানকে পানি থেকে টেনে তোলেন, তখনো তাঁরা একসঙ্গেই ছিলেন—মা এবং ছেলে একই লাইফ-জ্যাকেটের ভেতর একে অপরকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ছিলেন।

প্রদীপ হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘আমি ও আরেকজন মিলে লাইফ জ্যাকেট বের করতে তালা ভেঙে ফেলি। আমার শ্বশুর একটি টিউব ধরে নদীর তীরে পৌঁছে যান। আমি ও আমার মেয়ে জ্যাকেট পরে ছিলাম এবং দড়ির সাহায্যে আমাদের উদ্ধার করা হয়। শেষবার দেখলাম নৌকাটি ডুবে যাচ্ছে আর মেরিনা তৃশানকে জ্যাকেট পরাতে সাহায্য করছিল। একপর্যায়ে সে ছেলেকে নিজের জ্যাকেটের ভেতর জড়িয়ে ধরেছিল। আমার সব হারিয়ে গেল।’

আগ্রা থেকে আসা ডুবুরিরা উদ্ধার করতে গিয়ে মেরিনা আর ত্রিশানকে আঁকড়ে ধরে রাখা অবস্থায় দেখে কেঁদে ফেলেন। তাঁদের একজন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা (প্রমোদতরির) ধ্বংসাবশেষের কাছে একটি মৃতদেহ ভাসতে দেখি। এটি নড়ছিল না। যখন আমরা এটি উল্টে দিই, তখন সবাই কেঁদে ওঠে...মা ও ছেলে যেভাবে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে ছিল, বোঝা যায় ছেলেকে বাঁচাতে তিনি কতটা মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন।’

এখনো ঘটনা বুঝে ওঠার চেষ্টা করছেন উল্লেখ করে ত্রিজা বলেন, ‘বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে আমি জানতে পারি যে আমার মা মারা গেছেন…আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর্যন্ত আমি বাকিদের বিষয়ে কিছুই জানতাম না। শুক্রবার সকালেই আমি জানতে পারি যে আমার বোন এবং ভাগনেও ডুবে মারা গেছে।’

তৃশান গত ৬ এপ্রিল সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল। সিয়া অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। জবলপুরে প্রদীপের ভাইয়ের গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ছয় সদস্যের এই পরিবার গত মঙ্গলবার দিল্লি ছেড়েছিল এবং শনিবার বাড়ি ফেরার আগে বৃহস্পতিবার তারা নৌকা ভ্রমণে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

গণমাধ্যমকর্মী প্রদীপ আরও বলেন, ‘বাচ্চারা, বিশেষ করে তৃশান নৌকায় করে বেড়াতে বেশ আগ্রহী ছিল... আমরা টিকিট কিনেছিলাম এবং ভ্রমণ উপভোগ করছিলাম, হঠাৎ করেই আবহাওয়া বদলে যায়...আমি সবকিছু হারিয়েছি।’

প্রদীপ হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘যখন ঝোড়ো বাতাস নৌকায় আঘাত হানছিল, তখন হু হু করে পানি ঢুকতে শুরু করে। লাইফ জ্যাকেট বের করার জন্য আমি আর এক লোক মিলে তালা ভাঙি। আমার শ্বশুর একটি টিউব আঁকড়ে ধরে নদীর তীরে পৌঁছান। আমি এবং আমার মেয়ে জ্যাকেট পরি এবং দড়ির সাহায্যে রক্ষা পাই। নৌকাটি যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন আমি শেষবার মেরিনাকে দেখেছিলাম তৃশানকে তার জ্যাকেট পরাতে সাহায্য করতে। সে তাকে নিজের জ্যাকেটের ভেতর জড়িয়ে নিয়েছিল। এই দুঃসহ ঘটনায় আমি সবকিছু হারিয়েছি।’

প্রদীপ আরও বলেন, ‘নৌকার লোকজন আমাদের বারবার বলছিল যেন আমরা ঠিক যেভাবে আছি সেভাবেই বসে থাকি, তারা কোনো লাইফ জ্যাকেট বা অন্য কোনো ধরনের সহায়তা করেনি।’

এই দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে ফেরা ৭২ বছর বয়সী রিয়াজ হুসাইন প্রায় চার ঘণ্টা ধরে পানিতে ছিলেন। বলেন, নৌকাটি যখন বিপজ্জনকভাবে হেলে পড়েছিল, তখন যাত্রীরা প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে আতঙ্কে ছোটাছুটি করলেও কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
ভারতের দ্য ইনল্যান্ড ভেসেলস অ্যাক্ট, ২০২১ অনুযায়ী, নৌযাত্রা শুরুর আগে প্রত্যেক যাত্রীকে লাইফ জ্যাকেট সরবরাহ করতে হবে এবং তাদের তা সঠিকভাবে পরতে হবে। কিন্তু প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, বাধ্যতামূলক নিয়মটি চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়ে থাকতে পারে।

এনডিটিভির খবর বলা হয়, যদিও জানা গেছে যে সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু প্রথম উদ্ধারকারী দলটি সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটের আগে রওনা দিতে পারেনি এবং অভিযোগ রয়েছে যে তাদের যানটি চালু হচ্ছিল না। এরপর সরঞ্জামগুলো অন্য একটি যানে স্থানান্তর করতে হয়। অবশেষে সন্ধ্যা সাতটার দিকে দ্বিতীয় একটি উদ্ধারকারী দল রওনা দেয়।

প্রথম অবস্থায় স্থানীয় জেলে এবং কৃষকেরাই উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে ১৫ জনের বেশি মানুষকে বাঁচিয়েছিলেন।

এরপরই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) মতো বিশেষায়িত দলগুলো উদ্ধারকাজের দায়িত্ব নেয়। টানা ভারী বর্ষণের কারণে শুক্রবার সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান স্থগিত করতে হয়।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. মোহন যাদব মধ্যপ্রদেশজুড়ে প্রমোদতরি, মোটরবোট এবং ওয়াটার স্পোর্টস পরিষেবা স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ওই নৌযানের পাইলট মহেশ প্যাটেল, সহকারী ছোটেলাল গোন্দ এবং টিকিট কাউন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিজেন্দ্রকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।