এসআইআর নিয়ে কি ফেঁসে যেতে পারেন সিইসি জ্ঞানেশ, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কী বলছেন
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কোনো সিদ্ধান্ত আইনানুগ না হলে তা বাতিল করা হবে বলে জানিয়ে দিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। তবে সেই সঙ্গে জানানো হলো, কমিশনের বক্তব্য না শুনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে সাময়িক বরখাস্ত করা যায় না। বিচারপতিরা বলেন, খবরের কাগজের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁরা কোনো নির্দেশ দিতে পারেন না।
জ্ঞানেশ কুমারের কাজকর্মের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার শুনানির প্রথম দিন আজ সোমবার নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারকে একাধিক নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশ পাঠানো হয়েছে সিইসি জ্ঞানেশ কুমার, দুই ইসি যথাক্রমে সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী, উপনির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ এবং ইসির আইটি বিভাগের মহাপরিচালক সীমা খান্নাকে। সেই সঙ্গে নোটিশ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকেও।
প্রত্যেককে এক সপ্তাহের মধ্যে নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার এজলাস মামলার আবেদনকারীদের জানান, আইন অনুযায়ী ইসিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সর্বসম্মতিতে, নয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। কোনো সিদ্ধান্ত আইনানুগ না হলে বেঞ্চ তা রদ করে দেবেন।
সিইসির একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ–সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে। তাতে বলা হয়, গত ১০ মাসে দুই ইসি সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী ১৪ বার বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের আপত্তি জানান। সেই সব আপত্তি গ্রাহ্য হয়নি।
প্রতিবেদনে এ কথাও লেখা হয়, ইসির সভার আলোচ্যসূচিও আগে থেকে জানানো হতো না। বৈঠকের আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয়গুলোর ‘মিনিটস’ও দেওয়া হতো না। সিইসি একতরফাভাবে ফর্ম ৬–এ বদল ঘটিয়েছেন, যা আইনসম্মত ও বিধিবদ্ধ নয়।
প্রধানত সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। এক মামলায় এসআইআরে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এক বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন বা বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়।
অন্য এক মামলার আরজি, মামলাগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত সিইসিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হোক। এসব কিছু নিয়েই প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ সংশ্লিষ্টদের নোটিশ পাঠান।
আবেদনকারী রাকেশ কুমার সিংয়ের আইনজীবী বিকাশ সিং শুনানির সময় বলেন, এই আদালতেরই বিশেষ বেঞ্চে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ–সংক্রান্ত মামলাটি রয়েছে। ইসির কাজকর্মে গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ বিপন্ন বোধ করছে। নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারছে না। তাই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কিছু অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। সে অনুযায়ী সিইসিকে সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ দেওয়া হোক। নইলে দেশে আগুন জ্বলে যাবে।
আদালত–সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যম ‘লাইভ ল’ জানাচ্ছে, প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এই সময় বলেন, ‘আমরা আশা করি ইসি প্রচলিত আইন মেনেই কাজ করবে। যদি তা না হয়ে থাকে, তাহলে আমরা সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করব।’
বিচারপতি বাগচী বলেন, অপর পক্ষের বক্তব্য না শুনে আদালত একতরফভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। নথিপত্রে যদি দেখা যায়, ‘কোনো সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিতে নেওয়া হয়নি, একতরফাভাবে গৃহীত, তা হলে আমরা তা খারিজ করে দেব। ইসির সব সিদ্ধান্তই যে একতরফা তা আমরা ধরে নিতে পারি না। তাই আমরা ওদের মতামত জানতে চেয়েছি। আমরা চাই ওরা স্বচ্ছভাবে স্পষ্ট করে সব জানাক।’
আইনজীবী বিকাশ সিং এই সময় বলেন, ইসির বিবৃতিতেই বোঝা যাচ্ছে খবরের কাগজের প্রতিবেদন সত্য। প্রধান বিচারপতি এর উত্তরে বলেন, ‘খবরের কাগজের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আদালত রায় দিতে পারেন না। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ১০০ শতাংশ ঠিক হতে পারে, আংশিক ঠিক হতে পারে, আবার ভুলও হতে পারে। আমরা অবশ্যই অন্য পক্ষের জবাব চাইব।’
সোমবারের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ফর্ম ৬–এ কোনো রকম পরিবর্তনের অনুমোদন সুপ্রিম কোর্ট ইসিকে দেননি। তিনি জানান, ফর্ম ৬–এ কে বা কারা কিসের ভিত্তিতে বদল ঘটিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হবে। ইসিকে এই বিষয়েও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের উত্তর পেলে তাঁরা দেখবেন কে ওই সংশোধন করেছেন।
ফর্ম–৬ এর মধ্য দিয়ে নতুন ভোটারদের নাম তোলা হয়। এই ফর্মে অদলবদল করার কোনো ক্ষমতা বা অধিকার ইসির নেই।
অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার অন্য দুই কমিশনারকে অন্ধকারে রেখে একতরফাভাবে ওই ফর্মে বদল ঘটিয়েছেন। অনলাইনে নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তির সময় জানতে চাওয়া হচ্ছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আবেদনকারী বাবা–মা, দাদা–দাদি কিংবা নানা–নানির নাম ছিল কি না।
সম্প্রতি ইসি এক নির্দেশে জানিয়েছে, যেসব রাজ্যে এসআইআর হয়ে গেছে, সেখানে পুরোনো ফর্ম–৬ মারফত নতুন ভোটাররা নথিভুক্ত হতে পারবেন। আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী ফর্ম–৬ সম্পর্কে শুনানির সময় বলেন, এই ফর্মে কোনো রকম সংশোধন করার ক্ষমতা ইসির নেই। অথচ ঠিক সেটাই করা হয়েছে।
বিরোধীদলীয় ‘ইন্ডিয়া’ জোট, ককরোচ জনতা পার্টি ও জেন–জি প্রজন্মের তরুণদের অভিযোগ, নতুন প্রজন্মের ভোটারদের নাম যাতে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বেশি করে না ওঠে, সেই লক্ষ্যেই জ্ঞানেশ কুমার ফর্ম ৬–এ পরিবর্তন ঘটিয়েছেন।
এর আগে নির্বাচন কমিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, বহু সদস্যবিশিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানে ভিন্নমত থাকা গণতান্ত্রিকতারই প্রমাণ। কমিশনের গৃহীত সব সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা পূর্ণভাবে আছে। যা কিছু করা হয়েছে, আইন মেনে করা হয়েছে। এখন দেখার, সেই দাবি আদালতে জমা দেওয়া তথ্যে প্রমাণিত হয় কি না।