কথিত নথিপত্রহীন বাংলাদেশি বলে সীমান্তে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টায় ভারত, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হাকিমপুর সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া অনথিভুক্ত বাংলাদেশি অভিবাসীরাছবি: আল–জাজিরা থেকে স্ক্রিটশট

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় প্রতিবেশী বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী হাকিমপুর গ্রামের একটি তল্লাশিচৌকির কাছে তীব্র রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন রাইসুল ইসলাম।

রাইসুলের স্ত্রী রেবেকা খাতুন (৩৬) এবং তাঁদের দুই ছেলে রিয়াদ (১৪) ও জুবায়ের (১৬) কাছেই কাঁচা ইট ও সিমেন্ট দিয়ে তৈরি একটি অসমাপ্ত ভবনে বসে আছে। প্রচণ্ড গরম আর আর্দ্রতা, সেই সঙ্গে খাওয়ার পানির অভাব—সব মিলিয়ে ঠাসাঠাসি অপেক্ষার এই কক্ষটি যেন একটি চুল্লিতে পরিণত হয়েছে।

ভবনটিতে গাদাগাদি করে থাকা এই মানুষেরা বাংলাদেশ থেকে আসা কথিত মুসলিম অভিবাসী, যাঁদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ভারত সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের শুরু করা শনাক্তকরণ, বাদ দেওয়া ও নির্বাসন (ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট) নীতির অংশ হিসেবে তাঁদের সীমান্তবর্তী এই গ্রামে নিয়ে আসা হয়েছে। কট্টরপন্থী বিজেপি মাত্র মাসখানেক আগে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত রয়েছে, যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম সীমান্ত। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও রয়েছে। এর মধ্যে দুই পারের লাখ লাখ মুসলিম ও হিন্দুর মাতৃভাষা এক। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ভারতের অন্যান্য রাজ্যের দরিদ্র শ্রমিকদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অভিবাসনের ইতিহাস শত বছরের পুরোনো।

কিন্তু প্রায় ১০ কোটি মানুষের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর, উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলটির সরকার তথাকথিত অনথিভুক্ত মুসলিম অভিবাসীদের খুঁজে বের করতে একটি কঠোর অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে। সেই সঙ্গে এসব কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের আটকে রাখা এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটককেন্দ্র নির্মাণেরও ঘোষণা দিয়েছে রাজ্য বিজেপি সরকার।

আমরা শুধু আমাদের সন্তানদের একটি ভালো জীবন দেওয়ার জন্য ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু একশ্রেণির মানুষের অবিরাম হয়রানি ও অপমান আমাদের এমন এক দেশের তিক্ত স্মৃতি নিয়ে ফিরতে বাধ্য করেছে, যে দেশ সবার জন্য অহিংসা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়।
রাইসুল ইসলাম, আল–জাজিরাকে পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত তল্লাশিচৌকিতে

এই অভিযান কেবল কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গের ভারতীয় মুসলিমদের একটি অংশের মধ্যেও আশঙ্কা তৈরি করেছে। তাঁদের শঙ্কা, তাঁরাও এমন একটি অভিযানের শিকার হতে পারেন। তাঁদের মতে, তাঁরা নিজেদের আইনি অবস্থার পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এ ধরনের অভিযানের শিকার হতে পারেন।

২০২৫ সালের গ্রীষ্মে প্রতিবেশী রাজ্য আসামে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রায় ১২ জন ভারতীয় মুসলিমকে কথিত অনথিভুক্ত অভিবাসী বলে অভিযুক্ত করে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশ তাঁদের ফেরত পাঠায়। ফলে তাঁরা সাময়িকভাবে নো ম্যান্স ল্যান্ডে আটকা পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু কী কারণে তাঁদের এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটার কোনো ব্যাখ্যা বা বিচার তাঁরা কখনো পাননি।

এখন, এক বছর পর, পশ্চিমবঙ্গেও ঠিক একই ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে।

ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের হাকিমপুর সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রের দৃশ্য
ছবি: আল–জাজিরা থেকে স্ক্রিটশট

উন্নত জীবিকার সন্ধানে

হাকিমপুর সীমান্ত তল্লাশিচৌকিতে জড়ো হওয়া অনেকের মতো ৩৮ বছর বয়সী রাইসুল ইসলামও উন্নত জীবিকার আশায় ভারতে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার বাসিন্দা তিনি।

আল–জাজিরাকে রাইসুল বলেন, ‘দুই বছর আগে স্ত্রীর চর্মরোগের চিকিৎসার জন্য আমরা ভারতে এসেছিলাম। পরে দেখি, বাংলাদেশে যা আয় হতো তার চেয়ে এখানে বেশি মজুরি পাওয়া যায়। তাই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।’

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ভারতের অন্যান্য রাজ্যের দরিদ্র শ্রমিকদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অভিবাসনের ইতিহাস শত বছরের পুরোনো।

রাইসুলের ভাষ্য, তিনি ও তাঁর পরিবারকে সীমান্ত পার করে দিতে এক দালালকে প্রায় ২৫০ ডলার (বর্তমান হিসাবে প্রায় ৩০ হাজার ৭০০ টাকা) দিতে হয়েছিল, যা তাঁর জন্য অনেক বেশি টাকা। তাঁরা কলকাতায় গিয়ে শহরের উপকণ্ঠে একটি ঘর ভাড়া নেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনই রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং দিনে দুজনে মিলিয়ে প্রায় ১০ ডলার (প্রায় ১ হাজার ২৩০ টাকা) আয় করতেন।

তবে গত মাসের শেষ দিকে পরিস্থিতি বদলে যায়। পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত উগ্রপন্থী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবৈধভাবে বসবাসরত কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। গত এক দশকে তাঁর দল বিজেপি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এ ধরনের অভিযান চালিয়েছে।

তবে শুভেন্দুর ঘোষণায় একটি শর্ত ছিল। তিনি জানান, এই অভিযান কেবল মুসলিম বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে। বিতর্কিত সাংবিধানিক এক সংশোধনের আওতায় হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী অভিবাসীরা এর বাইরে থাকবেন।

উগ্র হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু আরও বলেন, আটক ব্যক্তিদের বহিষ্কারের আগে আদালতে নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিলেন, বিদেশি নাগরিকদের ভারতীয় সংবিধানের অধীনে কোনো অধিকার নেই বললেই চলে। ফলে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই নীতিতে বহিষ্কারের মুখে পড়া ব্যক্তিদের প্রমাণ করতে হচ্ছে, কেন তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে না।

পাঁচ বছর কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাড়িওয়ালা ঘর ছাড়তে বলেন। স্থানীয়দের হামলার আশঙ্কায় আমরা ফেরার সিদ্ধান্ত নিই।
মিরাজুল গাজী, আল–জাজিরাকে পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত তল্লাশিচৌকিতে

এর পর থেকে গত দুই সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে হাজারো মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের কাউকে আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে, আবার কাউকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে পুশ ইন বা ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

রাইসুল ইসলাম বলেন, প্রশাসন তাঁর খোঁজ পাওয়ার আগেই তিনি নিজে থেকে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসী হিসেবে স্থানীয় মানুষ ও পুলিশের হয়রানির আশঙ্কায় আমরা স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেছি।’

হাকিমপুর সীমান্তে উপস্থিত আরও অনেক অভিবাসী একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট ও জীবিকার অভাব তাঁদের দালালের সাহায্যে সীমান্ত পেরোতে বাধ্য করেছিল। অনেকের কাছে বৈধ কাগজপত্র ছিল না।

পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুরে পরিবারের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন রাইসুল ইসলাম (বাঁয়ে)
ছবি: আল–জাজিরা থেকে স্ক্রিটশট

৪২ বছর বয়সী মিরাজুল গাজী আল–জাজিরার কাছে দাবি করেন, পাঁচ বছর আগে স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন (৩৬) ও ছেলে নাঈমকে (১৮) নিয়ে তিনি ভালো কাজের খোঁজে ভারতে যান। কলকাতায় স্বামী-স্ত্রী নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এবং দিনে প্রায় ১২ ডলার (প্রায় ১ হাজার ৪৭০ টাকা) আয় করতেন। কিন্তু সরকারি ধরপাকড়ের কারণে তাঁদের দেশে ফিরতে হচ্ছে।

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাকিমপুরসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্তচৌকিতে মে মাসের শেষ দিক থেকে নিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভিড় জমাতে দেখা যাচ্ছে।

মিরাজুলের দাবি, ‘পাঁচ বছর কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাড়িওয়ালা ঘর ছাড়তে বলেন। স্থানীয়দের হামলার আশঙ্কায় আমরা ফেরার সিদ্ধান্ত নিই।’

কলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাকিমপুরসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্তচৌকিতে মে মাসের শেষ দিক থেকে নিয়মিত কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের ভিড় জমাতে দেখা যাচ্ছে।

হাকিমপুরে দায়িত্ব পালনকারী একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল–জাজিরার কাছে দাবি করেন, প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ জন অনথিভুক্ত অভিবাসী ও শরণার্থী সেখানে আসছেন। নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁদের বায়োমেট্রিক তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে অভিবাসীদের একটি ডিজিটাল তালিকা তৈরি করা যায়।

প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ জন অনথিভুক্ত অভিবাসী ও শরণার্থী সীমান্তের আটককেন্দ্রে আনা হচ্ছে।
আল–জাজিরাকে হাকিমপুরে দায়িত্ব পালনকারী একজন পুলিশ কর্মকর্তা

গত রোববার (৭ জুন) কলকাতায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে এরই মধ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, রাজ্যের সব জেলায় অস্থায়ী আটককেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।

শুভেন্দুর ভাষ্য, ‘এসব কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৮০০ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও ৮৩৬ জন বর্তমানে আটককেন্দ্রে রয়েছেন। তাঁদেরও দ্রুত ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

ঢাকা–দিল্লি কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে

বাংলাদেশে তরুণদের নেতৃত্বে গণ–অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। বাংলাদেশের এ অভ্যুত্থানের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী সম্পর্ক বড় ধাক্কা খায়।

মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য দিল্লির কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানায় ঢাকা। দিল্লি এখনো এসব অনুরোধ বিবেচনায় নেয়নি। এই সবকিছু দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে হাসিনাবিরোধী জোটের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। তারা দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।

তবে পশ্চিমবঙ্গে চলমান কথিত অবৈধ অভিবাসীবিরোধী অভিযান নতুন কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করেছে। ঢাকা বলছে, অনথিভুক্ত অভিবাসীদের জাতীয়তা যাচাইয়ে বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।

হাকিমপুরে মিরাজুল গাজী (ডানে) তাঁর স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন ও ছেলে নাঈমের সঙ্গে
ছবি: আল–জাজিরা থেকে স্ক্রিটশট

গত সোমবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, এ বিষয়ে তাঁরা এখন পর্যন্ত দিল্লিকে ‘১২ থেকে ১৩টি চিঠি’ পাঠিয়েছেন।

শামা ওবায়েদ সতর্ক করে বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি নির্ধারিত ব্যবস্থা রয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে সেটিই অনুসরণ করতে হবে।’ তাঁর মতে, এই অভিযান দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, ৪ জুনের পর থেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের অন্তত ১৮টি ‘পুশ ইন’ চেষ্টা তারা ঠেকিয়ে দিয়েছে। এসব পুশ ইনে প্রায় ১৮০ জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল।

সীমান্তে পুশ ইন নিয়ে উত্তেজনা চলার মধ্যে গত সোমবার দিল্লিতে বিজিবি ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়, যা গত বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। আলোচনায় বিজিবির পক্ষ থেকে ‘পুশ ইন’ বা বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এর আগে ঢাকার ‘অবৈধ পুশ ইন’ অভিযোগের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেন, অবৈধ বিদেশিদের ক্ষেত্রে ভারতীয় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে তথ্য যাচাইয়ের জন্য জানানো হয়েছে।

জয়সওয়াল দাবি করেন, এ ধরনের অনেক অনুরোধ এখনো ঢাকা থেকে যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে নয়াদিল্লি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ২ হাজার ৮০০–এর বেশি সন্দেহভাজন বাংলাদেশির তথ্য ঢাকায় পাঠিয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভারতের এই পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা করছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

আল–জাজিরাকে পিয়ারসন বলেন, বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার থাকা উচিত, যাতে কোনো ভারতীয় নাগরিক ভুলভাবে বহিষ্কৃত না হন। তিনি এই প্রক্রিয়াকে ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেন।

ধর্মীয় উত্তেজনা বাড়াচ্ছে বিতাড়ন

নথিপত্রহীন কথিত বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর অভিযান পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই রাজ্যে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। রাজ্যটিতে জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম।

দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক নির্বাচনী সভায় তাঁদের ‘উইপোকা’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

বিজেপিশাসিত সীমান্ত রাজ্য আসামেও একই ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে। সেখানে লক্ষাধিক বাঙালি-মুসলিম বসবাস করেন এবং তাঁরা প্রায়ই হয়রানির অভিযোগ করেন।

ভারতে হাজারো তিব্বতি বৌদ্ধ শরণার্থী ও শ্রীলঙ্কার তামিল শরণার্থী থাকলেও বিজেপি ধারাবাহিকভাবে মুসলিম অভিবাসীদের, বিশেষ করে কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নিশানা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহিংস অভিযানে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যাদের বড় অংশ কক্সবাজারে বসবাস করছে। কিছু রোহিঙ্গা ভারতে, বিশেষ করে দিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে আশ্রয় নিয়েছে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় একটি আটককেন্দ্র
ছবি: আল–জাজিরা থেকে স্ক্রিটশট

সমালোচকদের মতে, বিজেপি সরকারের অভিবাসীবিরোধী নীতি ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ, যার লক্ষ্য দেশটিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে হিন্দু জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।

মানবাধিকারকর্মী তিস্তা শীতলবাদ বলেন, কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত নীতি অনুযায়ী কাজ করছে এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নিজেরাই নির্ধারিত নিয়ম মানছে না।

শীতলবাদ আল–জাজিরাকে বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে, পুলিশ নির্বিচারে মানুষকে ধরে আটককেন্দ্রে পাঠাচ্ছে এবং তাঁদের যেন পণ্য হিসেবে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছে। আমরা আশঙ্কা করছি, অনেককে অবৈধভাবে আটক রাখা হচ্ছে।’ তিনি আটক ও বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের পূর্ণ তথ্য প্রকাশের দাবি জানান।

হাকিমপুর সীমান্তে সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে রাইসুল ইসলাম তাঁর দুই ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

রাইসুল দাবি করেন, ‘আমরা শুধু আমাদের সন্তানদের একটি ভালো জীবন দেওয়ার জন্য ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু একশ্রেণির মানুষের অবিরাম হয়রানি ও অপমান আমাদের এমন এক দেশের তিক্ত স্মৃতি নিয়ে ফিরতে বাধ্য করেছে, যে দেশ সবার জন্য অহিংসা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়।’

এর কিছুক্ষণ পরই ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এসে রাইসুলের পরিবারের সদস্যদের একটি গাড়িতে তুলে ১৮ কিলোমিটার দূরের একটি আটককেন্দ্রে নিয়ে যায়।