ইসির প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা আর বিতর্কের মধ্যে কর্ণাটকে চলছে ভোট

কর্ণাটকে আজ বুধবার সকালে বিধানসভার ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে
ছবি: এএনআই

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের বিধানসভার ভোট গ্রহণ শুরু হলো দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ আচরণের অভিযোগ মাথায় নিয়ে। এই নির্বাচনের প্রচারকালে কেন্দ্রীয় শাসক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উসকানির যত অভিযোগ বিরোধী শিবির এনেছে, তার একটি ক্ষেত্রেও মুখ্য নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

শুধু তা–ই নয়, প্রচার পর্ব শেষ হওয়ার পর ‘বিধি ভেঙে’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল মঙ্গলবার কর্ণাটকবাসীর কাছে ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করে খোলাখুলি আবেদন রাখেন। কংগ্রেস তাঁর বিরুদ্ধে নির্বাচনী বিধিভঙ্গের অভিযোগও দাখিল করেছে। কিন্তু কমিশন নীরব।

এ অবস্থায় আজ বুধবার সকাল থেকে রাজ্যের ২২৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে ঢিমেতালে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। কংগ্রেস ও বিজেপি—দুই দলের নেতারাই ভোটের পর ‘বিপুল জয়ের’ দাবি করছেন। ভোট পর্ব শেষ হলে সন্ধ্যায় শুরু হবে বুথফেরত সমীক্ষার সম্ভাব্য রায় নিয়ে আলোচনা।

অন্যান্যবারের মতো এবারও বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটের প্রচারে সরাসরি ধর্মকে হাতিয়ার করার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগমুক্ত থাকতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ দলের শীর্ষ নেতারা। অমিত শাহ প্রকাশ্যে বলেছেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে রাজ্যে আবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হবে।

প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী ভাষণ শেষ করেছেন ‘জয় বজরঙ্গবলি’ স্লোগান দিয়ে। তাঁদের বিরুদ্ধে ভোটের আচরণবিধি ভাঙার অভিযোগ আনা হলেও নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। জবাবদিহির নোটিশ পর্যন্ত পাঠায়নি। যদিও বিজেপির অভিযোগের ভিত্তিতে কমিশন কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে তাঁর ভাষণে ‘সার্বভৌম’ শব্দ ব্যবহারের জন্য নোটিশ পাঠিয়েছে।

কমিশনের বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতিত্বের’ এই গুরুতর অভিযোগ আগেও বারবার উঠেছে। বহুবার বহু ক্ষেত্রে ‘ঘৃণাভাষণ’ দেওয়ার সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কমিশন আমল দেয়নি। অতীতে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিশনের একজন ‘ঘৃণাভাষণ’–সংক্রান্ত তদন্তে ‘ভিন্নমত’ পোষণ করেছিলেন। তাঁর রায় ছিল প্রধানমন্ত্রী বিধি ভেঙেছেন। কিন্তু বাকি দুই সদস্য তা মানেননি। পরবর্তী সময়ে ওই সদস্য ও তাঁর পরিবারকে বিভিন্ন বিষয়ে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

বিজেপি এবার জিততে পারলে ১৯৮৫ সালের পর তারাই হবে দ্বিতীয় দল, যারা পরপর দুবার এই রাজ্যে ভোটে জিতে ক্ষমতাসীন হবে। সেই লক্ষ্যে মোদি-শাহ দিনরাত এক করে দিয়েছেন। গত ১০ দিন তাঁরা কর্ণাটকেই প্রচার চালিয়েছেন। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ‘৪০ শতাংশ ঘুষ’ গ্রহণের অভিযোগের কোনো জবাব না দিয়ে বিজেপি তার প্রচারে হাতিয়ার করেছে শুধু মোদির ভাবমূর্তি।

ভোট গ্রহণের আগের দিন রাজ্যবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ওই ‘খোলাচিঠি’, যাতে প্রকারান্তরে সমর্থন চেয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমার মনপ্রাণ জুড়ে রয়েছে আপনাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার পরশ। আমার কাছে তা ঐশ্বরিক। স্বাধীনতার এই অমৃতকালে দেশকে উন্নত করে তুলতে আমরা বদ্ধপরিকর। কর্ণাটক তার নেতৃত্ব দেবে। ভারত এখন বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতি। আমাদের লক্ষ্য তৃতীয় বৃহৎ হওয়া। তা সম্ভবপর কর্ণাটক যদি দ্রুত ১ ট্রিলিয়ন অর্থনীতিতে পৌঁছায়।’

বিজেপিকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড় করিয়েছে কংগ্রেস। রাজ্যে তারা গোষ্ঠী বিরোধিতা ভুলে একজোট হয়ে বিজেপির মোকাবিলা করছে। কর্ণাটকে কংগ্রেস বরাবর বিজেপির তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছে। কিন্তু শতাংশের হারে বেশি হলেও গতবার তারা আসন পায় কম। এবার অধিকাংশ জরিপেই কংগ্রেস এগিয়ে। আজ বুধবার ভোট দিয়ে দলের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া বলেছেন, ‘আমার ধারণা ছিল কংগ্রেস ১৩০ আসন পাবে। এখন মনে হচ্ছে সংখ্যাটা ১৫০ ছাড়িয়ে যাবে।’

রাহুল গান্ধী প্রচারে বারবার বলেছেন, জনতা যেন অন্তত ১৫০ আসন কংগ্রেসকে দেয়। তাহলে বিজেপি টাকা দিয়ে দল ভাঙাতে পারবে না।

বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে রাজ্যে তৃতীয় শক্তি ধর্মনিরপেক্ষ জনতা দল (জেডিএস)। দক্ষিণ কর্ণাটকে শক্তিশালী এই দল গতবার ৩৭ আসন পেয়ে সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা রেখেছিল। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন জেডিএস নেতা কুমারস্বামী। এবারও তিনি মনে করছেন, হয় ‘কিং’ হবেন, নয়তো ‘কিং মেকার’।

ফল যা–ই হোক, কর্ণাটক বিধানসভার ভোট বোঝাবে আগামী দিনে দেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কোন খাতে বইবে।