আরএসএস–বিজেপির সমর্থক মা–বাবার বিরুদ্ধেও লড়ছেন জেন–জি সন্তানেরা, ছাড়ছেন বাড়িও

যন্তর মন্তর থেকে পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রা চলাকালে বিক্ষোভকারীদের দিকে পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের শেল হাত দিয়ে ধরে অন্যদিকে ছুড়ে মারছেন এক জেন–জি বিক্ষোভকারী। নয়াদিল্লি, ভারত, ২০ জুলাই ২০২৬ছবি: রয়টার্স

কুনাল চৌধুরী গত ১৪ জুলাই ভারতের পাঞ্জাবের লুধিয়ানা শহর ছেড়ে রাজধানী নয়াদিল্লিতে জেন–জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে যোগ দিতে রওনা হন। তখন তিনি জানতেন, একবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে তাঁর সামনে অদূর ভবিষ্যতে বাড়ি ফেরার সুযোগ খুবই কম।

পাঞ্জাবের আরেক শহর জালন্ধরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ালেখা করেন কুনাল। ভারতে মেডিক্যালের ভর্তি পরীক্ষা নিট–ইউজি ২০২৬–এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী নয়াদিল্লিতে যে বিক্ষোভ করেছিলেন, তাতে অংশ নিয়েছিলেন কুনাল। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ওই ঘটনাকে ঘিরে ২০ জনের বেশি পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন এবং সারা দেশে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে ভারতে বড় বড় যেসব বিক্ষোভ হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল জেন–জিদের ওই বিক্ষোভ। তরুণদের ওই বিক্ষোভের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগে বাধ্য হন। পাশাপাশি সরকার ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছে।

এসব ঘটনা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের অজেয় ভাবমূর্তিতে ফাটল ধরিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শেষ করে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর থেকে বাড়ি ফিরে যান। যদিও ভারতের কয়েকটি এলাকায় একই ধরনের বিক্ষোভ এখনো চলছে।

নয়াদিল্লির বিক্ষোভে যোগ দিতে কুনাল চৌধুরীর যাত্রা অন্য অনেকের তুলনায় ভিন্ন ধরনের ছিল।

আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) হলো বিজেপির চরম ডানপন্থী আদর্শিক পথপ্রদর্শক। ১৯২৫ সালে ইউরোপের ফ্যাসিবাদী দলগুলোর আদলে প্রতিষ্ঠিত এই গোপন আধা সামরিক সংগঠনটি ডজনখানেক হিন্দু সংগঠনের নেতৃত্ব দেয়, যেগুলো একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। আর তাদের সেই লক্ষ্য হলো, সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।

অনলাইনভিত্তিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে যন্তর মন্তরে টানা ৩৬ দিনব্যাপী শিক্ষার্থী ও তরুণদের আন্দোলন চলে।

২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের ঘোষণা দিলে সেদিনই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে যন্তর মন্তর ছেড়ে চলে যান। কিন্তু কুনাল সেখানেই থেকে যান। তাঁর ভাষায় এই আন্দোলন তাঁর জীবন আমূল বদলে দিয়েছে।

বিক্ষোভ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক দিন আগে কুনাল অন্য বিক্ষোভকারী ও সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের সঙ্গে নিজের ১৯তম জন্মদিন উদ্‌যাপন করেছিলেন।

কুনাল আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমার বাবা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্য। আমিও দিল্লিতে আসার জন্য বাড়ি ছাড়ার আগপর্যন্ত আরএসএসের সদস্য ছিলাম। বিক্ষোভের সময়সূচির সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আমি আমার শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষাগুলো দিতে পারিনি।’

কুনাল আরও বলেন, ‘কিন্তু যা হয়েছে, হয়েছে। চারপাশের পৃথিবীকে ভেঙে পড়তে দেখে চুপচাপ বসে থাকা এবং তা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।’

আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) হলো বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী আদর্শিক পথপ্রদর্শক। ১৯২৫ সালে ইউরোপের ফ্যাসিবাদী দলগুলোর আদলে প্রতিষ্ঠিত এই গোপন আধা সামরিক সংগঠনটি ডজনখানেক হিন্দু সংগঠনের নেতৃত্ব দেয়, যেগুলো একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। আর তাদের সেই লক্ষ্য হলো, সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।

আমার বাবা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্য। আমিও দিল্লিতে আসার জন্য বাড়ি ছাড়ার আগপর্যন্ত আরএসএসের সদস্য ছিলাম। বিক্ষোভের সময়সূচির সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আমি আমার শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষাগুলো দিতে পারিনি।
—কুনাল চৌধুরী, ভারতীয় শিক্ষার্থী

এর সবচেয়ে পরিচিত কর্মকাণ্ড হলো সাপ্তাহিক পাড়াভিত্তিক সভা, যাকে ‘শাখা’ বলা হয়। সেখানে সাধারণত সাদা শার্ট ও খাকি শর্টস পরা পুরুষেরা সামরিক কায়দার প্রশিক্ষণ ও আদর্শগত দীক্ষা নেন।

আরএসএসের সদর দপ্তর মহারাষ্ট্র রাজ্যের নাগপুর শহরে। ১৯৪৮ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান নেতা মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার ঘটনায় এর এক সদস্যের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর সরকার সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করেছিল।

পরের বছর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরপর ১৯৫১ সালে সংগঠনটি তাদের রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনসংঘ গঠন করে, যা পরে ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টিতে (বিজেপি) রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে আরএসএসের আজীবন সদস্যদের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির অধিকাংশ শীর্ষ নেতাসহ দেশ–বিদেশে ছড়িয়ে থাকা লাখো সদস্য রয়েছেন।

অঞ্জলি বলেন, আগে তিনি মোদির সমর্থক ছিলেন
ছবি: অঞ্জলির সৌজন্যে/আল–জাজিরা

‘তারা শুধু মুসলমানদের ঘৃণা করতে শেখায়’

কুনালের বাবা জীবন চৌধুরী একজন ব্যবসায়ী। কুনাল তাঁর পরিবারের এমন কোনো সদস্যকে দেখেননি, যিনি আরএসএস করেন না। তিনিও তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও একই পথ অনুসরণ করেন। যদিও মন থেকে তিনি কখনো সত্যিকার অর্থে এর মধ্যে ছিলেন না বলে দাবি করেন।

আরএসএসের কার্যক্রম নিয়ে কুনাল বলেন, ‘তারা এমন কোনো কিছু শেখায় না, যেটা আপনার কাজে লাগতে পারে। তারা শুধু শেখায়, কীভাবে মুসলিম ও দলিতদের ঘৃণা করতে হয়।’

প্রিয়া সিংয়ের বাবা বিজেপির একজন কট্টর সমর্থক। প্রিয়া যখন যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর বাবা তাঁকে মারধর করার হুমকি দেন।

দলিতরা ভারতের সবচেয়ে প্রান্তিক ও বঞ্চিত জাতিগত (কাস্ট) গোষ্ঠীগুলোর একটি। একসময় তাদের ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তবে ভারতীয় সংবিধান এই প্রথাকে আইনিভাবে বিলুপ্ত করেছে। তা সত্ত্বেও সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চবর্ণের মানুষেরা যুগের পর যুগ এই জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। এখনো তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, এমনকি সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।

কুনাল বলেন, সিজেপির নেতৃত্বাধীন আন্দোলন নিয়ে তাঁর পরিবারের সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গা ছিল—সেখানে মানুষের জাতপাত, ধর্ম বা সামাজিক অবস্থান নিয়ে মাথা ঘামানো হয়নি। সবাই সেখানে একসঙ্গে জড়ো হতো, পাশাপাশি বসত এবং একসঙ্গে খাবার খেত।

কুনাল বলেন, ‘তাদের (কুনালের পরিবারের) মস্তিষ্কে এ ধরনের কিছু ধারণ করাই সম্ভব নয়।’

উদাহরণ হিসেবে এই শিক্ষার্থী মুসলিম তরুণ মোহাম্মদ জুনাইদের কথা উল্লেখ করেন। তাঁকে অসংখ্য ভাইরাল ভিডিওতে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের বিনা মূল্যে খাবার ও পানি বিতরণ করতে দেখা গেছে। যন্তর মন্তর হলো ১৮০০ শতকের একটি মানমন্দির এবং জনসমাবেশের স্থান, যেখানে জেন–জি আন্দোলনকারীরা জড়ো হয়েছিলেন।

বিক্ষোভ চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুনালের একটি ভিডিওও ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন এবং উল্লেখ করেন, তিনি নিজেই একজন বিজেপি কর্মীর ছেলে ও সাবেক আরএসএস সদস্য।

কুনাল বলেন, ‘আমার মা–বাবা ভিডিওটি দেখার পর বাবা আমাকে বিজেপি ও আরএসএস সম্পর্কে কোনো খারাপ কথা না বলতে বলেন। কিন্তু আমি তো তাদের সম্পর্কে কোনো খারাপ কথা বলিনি। আমি সারা জীবন এ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই বড় হয়েছি।’

কুনাল প্রায়ই তাঁর মা–বাবার সঙ্গে কথা বলেন, কিন্তু তিনি আর বাড়ি ফিরে যেতে চান না।

এই শিক্ষার্থী বলেন,‘আমি পৃথিবীকে যেভাবে দেখি আর যাঁদের মধ্যে বড় হয়েছি, তাঁরা যেভাবে পৃথিবীকে দেখে—এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ব্যবধান এখন অনেক বেশি বেড়ে গেছে।’

কুনাল নিজের খরচ চালানোর জন্য একটি চাকরি খোঁজার পরিকল্পনা করছেন। এরপর আইন বিষয়ে ডিগ্রি সম্পন্ন করতে একটি দূরশিক্ষণ (ডিস্ট্যান্স লার্নিং) কোর্সে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।

আমি যখন বলেছিলাম যে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার, তখন বাবা বলেন, এতে কিছু যায়–আসে না। তিনি এমনও বলেছিলেন যে বিক্ষোভে গুরুতরভাবে আহত হওয়া নারীরা ওই পরিণতিরই যোগ্য। কারণ, তারা মা–বাবার কথা শোনেনি বা তাদের না জানিয়েই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।
—প্রিয়া সিং, ভারতীয় শিক্ষার্থী

এই তরুণ বলেন, তাঁর মা নীরবে তাঁর প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে আসছেন। তবে অদূর ভবিষ্যতে বাড়ি ফিরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই।

বর্তমানে কুনাল যন্তর মন্তরের কাছে একটি গুরুদুয়ারায় বসবাস করছেন। বিক্ষোভ চলাকালে শিখদের এই উপাসনালয় সব সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য তাদের দরজা খুলে দিয়েছিল।

কুনাল বলেন, ‘(বিক্ষোভ চলাকালে) এক দিনও আমাকে না খেয়ে থাকতে হয়নি। এখন বিক্ষোভ শেষ হয়ে যাওয়ায় আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। আমার মানিব্যাগ, যেখানে কিছু টাকা এবং আমার পরিচয়পত্র ছিল, চুরি হয়ে গেছে। তাই এখন কার্যত আমার কাছে আর কোনো টাকা নেই।’

নেহা বোরা
ছবি: নেহা বোরার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

‘বাড়ির বন্ধুদের ফোন ধরি না’

প্রিয়া সিংয়ের বাবা বিজেপির একজন কট্টর সমর্থক। প্রিয়া যখন যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁর বাবা তাঁকে মারধর করার হুমকি দেন।

২৪ বছর বয়সী প্রিয়া আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি সেখানে গেলে মুখ ঢেকে রাখতাম, যাতে ছবি বা ভিডিও দেখে বাবা বুঝতে না পারেন, আমি সেখানে ছিলাম। কারণ, আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমি মোদির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে যাচ্ছি।’

প্রিয়ার ৫৫ বছর বয়সী বাবা একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। মেয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বিজেপির প্রতি তাঁর ‘অন্ধ বিশ্বাস’ রয়েছে।

প্রিয়া বলেন, তিনি তাঁর বাবাকে বিক্ষোভস্থলের একটি ভিডিও দেখান। ভিডিওতে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে এক নারী বিক্ষোভকারীর ওপর যৌন নিপীড়ন চালাতে দেখা যায়। অথচ ভিডিওটি দেখে তাঁর বাবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষেই অবস্থান নেন।

প্রিয়ার বাবার যুক্তি, নারী বিক্ষোভকারীদের সামনের সারিতে থাকা উচিত হয়নি। কারণ, সরকার তাদের বিক্ষোভে যেতে নিষেধ করেছিল।

প্রিয়া বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। তখন বাবা বলেন, এতে কিছু যায়–আসে না।’

প্রিয়ার বাবা এমনও বলেছিলেন, বিক্ষোভে গুরুতরভাবে আহত হওয়া নারীরা ওই পরিণতিরই যোগ্য। কারণ, তারা মা–বাবার কথা শোনেনি বা তাদের না জানিয়েই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল।’

প্রিয়া বর্তমানে মুসলিমদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

এই তরুণী বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেন। ভর্তি হওয়ার সময়ও পরিবারকে কিছু বলেননি। পরে তাঁর বাবা বিষয়টি জানতে পেরে খুবই অস্বস্তিতে পড়েছিলেন।

প্রিয়া বলেন, ‘বাবা আমাকে বলেছিলেন, সেখানে লোকজন আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে এবং আমাকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু তখন তাঁর আর কিছু করার ছিল না। কারণ, আমি আগেই ভর্তি হয়ে গিয়েছিলাম। এখন বাড়ি গেলে আমি আমার বন্ধু বা ক্লাসের কোনো কথাই পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করি না। এমনকি বাড়িতে থাকলে বন্ধুদের ফোনও ধরি না।’

‘ওর কেন মার খেতে এত ভালো লাগে’

প্রিয়াদের বাড়ি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে থাকেন অঞ্জলি। ২৫ বছর বয়সী এই তরুণী দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী। তিনি নিজের পুরো নাম বলেননি।

ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্যের একটি বিহারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অঞ্জলি বলেন, তাঁর শৈশবের বেশির ভাগ সময় কেটেছে রাগী স্বভাবের বাবার বাজপাখির মতো কড়া নজরদারির মধ্যে।

অঞ্জলির ভাষ্য অনুযায়ী, বাবা তাঁর ও ছোট ভাইয়ের মধ্যে বৈষম্য করতেন। তিনি তাঁর মেয়ের যথাযথ শিক্ষা ও সামাজিক মেলামেশার প্রয়োজনকে অবহেলা করলেও ছেলের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো আচরণ করতেন।

অঞ্জলির মা–বাবা শুধু বিজেপির কট্টর সমর্থকই নন, তাঁরা আরএসএসের সদস্য। অন্যদিকে অঞ্জলি একজন ছাত্রনেত্রী। তিনি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ)–এর সঙ্গে যুক্ত। এটি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী) বা সিপিআই (এমএল)–এর ছাত্রসংগঠন।

আরও পড়ুন

অঞ্জলি বলেন, বামপন্থী রাজনীতিতে তাঁর সম্পৃক্ততা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। শুরুতে তিনি মোদির একজন সমর্থক ছিলেন। কিন্তু পরে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে এবং তিনি আগের রাজনৈতিক মতাদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত প্রান্তে চলে যান। এরপর তিনি এআইএসএতে যোগ দেন।

অঞ্জলির এই রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর মা–বাবাকে ‘লজ্জিত’ করে। তাঁকে ফেরাতে তাঁরা এমন কোনো কৌশল নেই, যা অবলম্বন করেননি। যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর তাঁর মা প্রায়ই ফোন করে তিনি কোথায় আছেন, তা জানতে চাইতেন।

অঞ্জলি হেসে বলেন, ‘আমি মিথ্যা বলতাম। আমি বলতাম, পড়াশোনা বা কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। তখন মা বলতেন, তিনি আমাকে এরই মধ্যে টেলিভিশনে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো রিলে দেখে ফেলেছেন।’

যন্তর মন্তর থেকে ২০ জুলাই পার্লামেন্ট অভিমুখে বিক্ষোভকারীদের মিছিলের দিন অঞ্জলির মা কাঁদতে কাঁদতে ফোন করে জানতে চান, পুলিশের লাঠিপেটায় তিনি আহত হয়েছেন কি না। অঞ্জলি আহত হয়েছিলেন।

আরও পড়ুন
তরুণেরা প্রকৃতপক্ষে এক উন্নত ভারতের স্বপ্ন দেখেন
ছবি: রয়টার্স

অঞ্জলির মা ফোনে তাঁর বাবার একটা কথা বলেছিলেন। অঞ্জলি সে কথা স্মরণ করে বলেন, ‘বাবা বলেছিলেন, “আমি তো ওকে আগেই বলেছিলাম, এই শাসনব্যবস্থা ওকে পিষে ফেলবে, কাউকেই রেহাই দেবে না। ওর কেন মার খেতে এত ভালো লাগে? আমরা কি ওকে শুধু মার খাওয়ার জন্যই বড় করেছি”?’

বাবা এমনও বলেছিলেন, তিনি জানেন, তিনি নিজেও এই শাসনব্যবস্থার একটি অংশ। এখানে ক্ষমতাবান ও বিপুল অর্থসম্পদের অধিকারী লোকজন রয়েছেন। আর কেউ যদি তাঁদের বদলানোর চেষ্টা করে, তাহলে তাকে পিষে ফেলা হবে, বলেন এই তরুণী। বাবা তাঁকে বাড়ি ফেরানোর অনেক চেষ্টা করেছিলেন বলেও জানান। তাঁদের বিশ্বাস, অঞ্জলি নিজের জীবন নষ্ট করছেন।

শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী যখন পদত্যাগ করেন, তখন অঞ্জলি ধারণা করেছিলেন, এ খবর শোনার পর তাঁর মা–বাবার কাছ থেকে আগের মতোই অবজ্ঞাসূচক প্রতিক্রিয়া আসবে।

কিন্তু অঞ্জলিকে বিস্মিত করে দিয়ে তাঁর মা এ খবরে খুশি হয়েছিলেন, এমনকি বিক্ষোভে মেয়ের অংশগ্রহণ নিয়ে কিছুটা গর্বিতও মনে হচ্ছিল তাঁকে। অঞ্জলির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মা একে ‘একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।

আরও পড়ুন

অঞ্জলি বলেন, ‘মা বলেছিলেন, এখানে পৌঁছাতে আমাদের হয়তো সময় লেগেছে, কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি, আমরা এটা করতে পারি।’

অঞ্জলির বাবা এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। একেবারেই নীরব ছিলেন। অঞ্জলি এখনো তাঁর বাবার সামনে না পড়ার চেষ্টা করেন।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো কীভাবে ভারতে পারিবারিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নেহা বোরা।

২৯ বছর বয়সী বোরা হলেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি।

আরও পড়ুন

নেহা নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) একজন পিএইচডি গবেষক। বিক্ষোভের সময় তিনি ২৩ দিন অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের একজন ছিলেন।

বিক্ষোভের পর থেকে নেহা বোরা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জেন–জি প্রজন্মের সবচেয়ে সোচ্চার সমালোচকদের একজন হিসেবে উঠে এসেছেন।

সাংবাদিক বারখা দত্তকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে নেহা বলেন, তাঁর বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা, মা গৃহিণী। তাঁরা বিজেপির সমর্থক। তাই তাঁর বামঘেঁষা রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে তাঁরা খুব একটা ভালোভাবে নেননি।

রাজনৈতিক আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নেহা অনশনে বসেছেন জানতে পেরে তাঁর মা উত্তর প্রদেশের বেরেলি শহরে অবস্থিত তাঁদের বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে যন্তর মন্তরে ছুটে আসেন। শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করার পর তিনি মেয়েকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন।