ভারতে জন্মহার প্রথমবারের মতো কমছে, কিন্তু কারণ কী

ভারতের বিহার রাজ্যের কিষানগঞ্জ জেলার একটি হাসপাতালে এক নবজাতকের সেবা করছেন নার্সছবি: রয়টার্স

ভারতে প্রথমবারের মতো প্রজননহার বা শিশু জন্মদানের হার একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেছে। জনসংখ্যা কমে যাওয়া ঠেকাতে যে হার থাকা প্রয়োজন, ভারতের বর্তমান হার তার চেয়েও কম। এ পরিস্থিতি ভবিষ্যতে শ্রমিকের সংকট এবং সমাজে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কয়েক দশক ধরে ভারতে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি দেখা গেছে। সরকারি পরিসংখ্যান ও দেশের বৃহত্তম জনতাত্ত্বিক জরিপ ‘স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম’ (এসআরএস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে ভারতে জন্মহার কমছে। তবে এত দিন এই জন্মহার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল।

ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেন্সাস কমিশনারের কার্যালয় গত মাসে সর্বশেষ এসআরএস (স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে বর্তমানে নারীপ্রতি গড় প্রজননহার (টিএফআর) কমে ১ দশমিক ৯-এ দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘ মেয়াদে দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে এই হার অন্তত ২ দশমিক ১ থাকা প্রয়োজন। সাধারণত একজন নারী তাঁর জীবনে গড়ে কতজন সন্তানের জন্ম দেবেন বলে আশা করা হয়, তাকেই ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’ বা টিএফআর বলা হয়। ২০০০ সালের দিকেও ভারতে এই হার ছিল নারীপ্রতি গড়ে ৩ দশমিক ৩।

প্রজননহার কমার কারণ কী

ভারত সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা সত্তরের দশকের শুরু থেকে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে অতিরিক্ত জনসংখ্যা কমাতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। তখন ভারত তুলনামূলকভাবে দরিদ্র রাষ্ট্র ছিল। তাঁদের যুক্তি ছিল, সম্পদের তুলনায় মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।

এ সময় সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে জনগণের ওপর নানা উদ্যোগ চাপিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে মানুষকে জোর করে বন্ধ্যাকরণের একটি বিতর্কিত প্রচেষ্টাও ছিল। এসব সত্ত্বেও ২০১৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’ সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।

জনসংখ্যা নিয়ে ভারত যে এক অজানা সংকটের দিকে এগোচ্ছে, তার প্রথম লক্ষণ দেখা গিয়েছিল ২০২২ সালে। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, সব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই ভারতের প্রজননহার (টিএফআর) দ্রুত কমছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রজননহার কমতে থাকায় ভারত এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের পুরোপুরি সুফল না-ও পেতে পারে।

এর ঠিক এক বছর পরই চীনকে টপকে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হয়ে ওঠে ভারত। তখন ১৫০ কোটি জনসংখ্যার বিশাল খবরের ভিড়ে প্রজননহার কমার বিষয়টি অনেকটা আড়ালে চলে গিয়েছিল। তবে সর্বশেষ জরিপ বলছে, জনসংখ্যা কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা নীতিনির্ধারকেরা করেছিলেন, পরিস্থিতি তার চেয়েও দ্রুত পাল্টে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার প্রসার ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা প্রজননহার কমার অন্যতম প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্তান লালনপালনের বাড়তি খরচ।

উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ দীপা সিনহা বলেন, সমাজে যখন নারীদের শিক্ষা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ওপর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায় এবং পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, তখন সাধারণত প্রজননহার কমে আসে। তিনি আরও বলেন, অর্থনীতি যখন ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে, তখন সন্তান লালনপালনও ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।

শিশুমৃত্যুর হার কমে আসায় বেশি সন্তান নেওয়ার আগ্রহও কমে যাচ্ছে। সর্বশেষ এসআরএস প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে শিশুমৃত্যুর হারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

ভারতের কলকাতার একটি জনাকীর্ণ বাজারে কেনাকাটা করছেন মানুষ। বিশ্বের শীর্ষ জনবহুল এই দেশে এখন প্রজননহার আগের চেয়ে কমছে
ছবি: রয়টার্স

২০১৯ সালে প্রতি ১ হাজার জীবিত শিশুর বিপরীতে মৃত্যুর হার ছিল ৩০, যা ২০২৪ সালে কমে ২৪–এ দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রজননহারের যে পার্থক্য দেখা যায়, তার সঙ্গে এসব কারণও প্রায় পুরোপুরি মিলে যায়।

ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্যগুলোতে—যেমন উত্তর ভারতের বিহারে শিক্ষার হার সবচেয়ে কম এবং শিশুমৃত্যুর হার বেশি। ফলে সেখানে দেশের সর্বোচ্চ প্রজননহার (২.৯) দেখা গেছে। এরপরই রয়েছে উত্তর প্রদেশ (২.৬)।

অন্যদিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষার হার বেশি এবং শিশুমৃত্যুর হার কম। সেখানে প্রজননহার সবচেয়ে কম, নারীপ্রতি গড়ে ১.২ জন। তামিলনাড়ু ও কেরালার মতো দক্ষিণের রাজ্যগুলো, যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা ভারতের মধ্যে সবচেয়ে ভালো, সেখানে এই হার ১.৩ শতাংশ।

প্রজননহার কমলে ফল কী হতে পারে

২০০৫ সালে ভারতের জনসংখ্যা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশের পর্যায়ে প্রবেশ করে। এটি এমন একটি পর্যায়, যখন একটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর (১৫-৬৪ বছর) সংখ্যা শিশু ও বৃদ্ধদের তুলনায় বেশি হয়। ইউএনএফপিএ-র তথ্য অনুযায়ী, ভারতের এই লভ্যাংশের পর্যায় ২০৫৫ সাল পর্যন্ত বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

১৯৬০-এর দশকে জাপান, সিঙ্গাপুর ও হংকং এই পর্যায়ে প্রবেশ করে দ্রুত উন্নত অর্থনীতিতে রূপ নেয়। চীন এই ধাপে পা রাখে আশির দশকে। অর্থনৈতিক সংস্কারের হাত ধরে দেশটি আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। ভারতেও ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে দেশটিতে এখনো লাখ লাখ মানুষ বেকার। চীনের মতো ভারতও উন্নত দেশ হওয়া থেকে এখনো অনেক দূরে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রজননহার কমতে থাকায় ভারত এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের পুরোপুরি সুফল না-ও পেতে পারে। কারণ, শ্রমশক্তি সংকুচিত হচ্ছে এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

দীপা সিনহা বলেন, শিশুর জন্ম কম হলে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ভারতে এমন অনেক বয়স্ক মানুষ থাকবেন, যাঁরা শ্রমশক্তিতে সেভাবে অংশ নিতে পারবেন না। এটি দেশের কর্মশক্তির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

জনসংখ্যার তথ্যের পেছনে রাজনীতি কী

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রজননহারের বিশাল পার্থক্যের অর্থ হলো উত্তরের রাজ্যগুলোতে জনসংখ্যা ইতিমধ্যেই বেশি এবং আগামী বছরগুলোতে ভারতের মোট জনসংখ্যার বড় অংশই সেখানকার বাসিন্দা হবে।

দীপা সিনহার মতে, দক্ষিণের রাজ্যগুলো ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছে, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের কম তহবিল দিয়ে ‘শাস্তি’ দিচ্ছে, বিশেষ করে মোদি সরকারের আমলে এই প্রবণতা বেড়েছে।

এই বছরের শেষ দিকে ভারত সরকার পার্লামেন্টে ‘ডিলিমিটেশন’ বা সীমানা নির্ধারণী নীতিমালা পেশ করবে। নতুন আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি রাজ্যের জন্য সংসদীয় আসনসংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করা হবে। দীপা সিনহা মনে করেন, সীমানা নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) কার্যকর হলে পার্লামেন্টে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর আসনসংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে এই প্রচার চালাচ্ছে, হিন্দুদের তুলনায় মুসলিমদের সন্তানসংখ্যা বেশি। তবে সরকারি তথ্য বলছে, মুসলিমদের প্রজননহার অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর তুলনায় দ্রুত কমছে। ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলিমদের প্রজননহার ৪ দশমিক ৪১ থেকে কমে ২ দশমিক ৩৬ হয়েছে। হিন্দুদের ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৩ থেকে কমে ১ দশমিক ৯৪ হয়েছে।

ভারতের কলকাতার আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার একটি ‘অ্যারিয়াল ভিউ’ বা আকাশ থেকে তোলা চিত্র। দেড় শ কোটি মানুষের দেশ ভারতে এখন কমছে প্রজননহার, যার বড় প্রভাব পড়তে পারে জনবহুল এই শহরগুলোতে
ছবি: রয়টার্স

প্রজননহার হ্রাস ঠেকাতে ভারত কী ব্যবস্থা নিচ্ছে

ভারত সরকার প্রজননহার হ্রাসের সমস্যা মোকাবিলায় এখনো দেশব্যাপী কোনো নীতি ঘোষণা করেনি। তবে কয়েকটি রাজ্যে দেখা গেছে, সরকার মানুষকে বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করছে।

গত মাসে অন্ধ্রপ্রদেশ ঘোষণা করেছে, তৃতীয় সন্তান হলে পরিবারকে ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তানের জন্য ৪০ হাজার রুপি দেওয়া হবে। এ ছাড়া গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো বিভিন্ন রাজ্যে প্রথমবারের মতো মা–বাবা হতে চাওয়া দম্পতিদের জন্য সরকারি অর্থায়নে আইভিএফ কেন্দ্র চালু করেছে।

দীপা সিনহা মনে করেন, ভারত সরকারের উচিত, মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা এবং তাদের সহযোগিতা করা। তিনি বলেন, জনতাত্ত্বিক কাঠামো ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে ভারতের একটি জননীতি তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

দীপা সিনহা বলেন, ‘যদি আমাদের দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ে, তাহলে তাঁদের সাহায্য করার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। বৃদ্ধ বয়সে তারা যাতে ভালো চিকিৎসা, পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষা পান, তেমন একটি নীতিমালা এখন প্রয়োজন।’

এশিয়ার আর কোন কোন দেশে প্রজননহার কমছে

চীন, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার অন্য দেশগুলোও প্রজননহার হ্রাসের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, চীনের প্রজননহার ১.০, যা জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার মাত্রার (২.১) অনেক নিচে।

তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের প্রজননহার ০ দশমিক ৮৬–এর আশপাশে এবং এটি আরও কমতে পারে। জাতিসংঘ বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রজননহার নারীপ্রতি প্রায় ০ দশমিক ৭৫ জন, যা সারা বিশ্বে সর্বনিম্ন।