মোদি সরকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে অরুণাচলে আদিবাসীদের ক্ষোভ বাড়ছে, কেন এই প্রকল্প করতে চায় ভারত

জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ঘিরে অরুণাচল প্রদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং উপত্যকা। মাসখানেক আগে সেখানকার উগেং-কমকার এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। সেখানে ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ার কথা। সেটির নাম সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প।

প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আগের ধাপের প্রতিবেদন তৈরির জন্য উগেং-কমকার এলাকায় জরিপ ও খননকাজ চালানোর কথা। আর এ জন্যই সেখানে এত নিরাপত্তাকর্মীর আনাগোনা। এত নিরাপত্তা, এত প্রস্তুতির পরও প্রকল্পটি নিয়ে স্থানীয় মানুষের আপত্তি রয়ে গেছে। চলছে বিক্ষোভ, আন্দোলন।

১৪ অক্টোবর চারজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অরুণাচলে ২০১৪ সালে পাস হওয়া বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

গ্রেপ্তার চারজনের মুক্তির দাবিতে আপার সিয়াংয়ের গেকু এলাকায় রাজপথে নেমেছেন স্থানীয় মানুষ। প্রকল্পটি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা বর্জনের আহ্বান জানিয়েছে সিয়াং আদিবাসী কৃষক ফোরামের (এসআইএফএফ) যুব শাখা।

হিমালয় পর্বতমালা থেকে নেমে এসেছে খরস্রোতা সিয়াং নদী। হিমালয়ের কৈলাস শৃঙ্গের কাছে মানস সরোবরের জিমা ইয়ংজং হিমবাহে এর উৎপত্তি। তিব্বত অংশ নদীটির নাম ইয়ারলুং সাংপো। অরুণাচল প্রদেশ দিয়ে ভারতে ঢুকে নাম হয়েছে সিয়াং। আর সবশেষে বাংলাদেশে এটি ব্রহ্মপুত্র নদ নামে প্রবাহিত হয়েছে।

স্থানীয় আদি সম্প্রদায়ের লোকজন প্রকল্পটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তাঁদের বসতভিটা হারাতে হবে। জীবিকার পথ সংকুচিত হয়ে আসবে। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া জমিও নিয়ে নেবে সরকার। এর মধ্যেই সেখানে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের ঘটনা তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খানডু গত সেপ্টেম্বরে ওই এলাকা সফর করেন। তখনো বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা স্থানীয় এক বিধায়কের বাড়িতে হামলা চালান। পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এরপর ৪ অক্টোবর নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা।

চীনা সীমান্তঘেঁষা অরুণাচল প্রদেশের সমস্যাটি যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নজরে এসেছে, তার ইঙ্গিত মেলে ৮ অক্টোবর। ওই দিন অরুণাচল প্রদেশের বাসিন্দা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরণ রিজেজু আদি সম্প্রদায়ের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে রিজেজু বলেন, ‘একসঙ্গে বসে আলোচনা করলে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের কথা বলতে হবে। সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

অরুণাচলে এমন অচলাবস্থার ইতিহাস বেশ পুরোনো।

অবস্থান বদল

হিমালয় পর্বতমালা থেকে নেমে এসেছে খরস্রোতা সিয়াং নদী। হিমালয়ের কৈলাস শৃঙ্গের কাছে মানস সরোবরের জিমা ইয়ংজং হিমবাহে এর উৎপত্তি। তিব্বত অংশে নদীটির নাম ইয়ারলুং সাংপো। অরুণাচল প্রদেশ দিয়ে ভারতে ঢুকে নাম হয়েছে সিয়াং। আর সবশেষে আসামের সমতলভূমি হয়ে বাংলাদেশে এটি ব্রহ্মপুত্র নামে প্রবাহিত হয়েছে।

নদীটি ঘিরে রাজনৈতিক অবস্থানের পথচলা বারবার বিভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। সময়টা ২০১০ সালের আগস্ট। অরুণাচলে তখন কংগ্রেস শাসন ক্ষমতায়। অরুণাচল প্রদেশের রাজধানী ইটানগরে একটি বাসায় ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। বাসাটি সিয়াং পিপলস ফোরামের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও বাঁধবিরোধী আন্দোলনের সোচ্চার নেতা ওজিং তাসিংয়ের। এরপর তাসিং দিল্লি গিয়ে তৎকালীন ইউপিএ সরকারের পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশের সঙ্গে দেখা করেন। সিয়াং অববাহিকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাতিলের দাবি জানান তিনি।

এর পরপর কেন্দ্রীয় ইউপিএ সরকার গুয়াহাটিতে একটি গণশুনানির আয়োজন করে। জয়রাম রমেশ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে পরিবেশমন্ত্রী স্বীকার করে নেন, প্রকল্পগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে তাঁর যুক্তি সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে জয়রাম রমেশ আরও লেখেন, ‘অরুণাচল প্রদেশের কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতায় অরুণাচল প্রদেশকে দাবার ঘুঁটি বানানো উচিত হবে না।’

ওই সময়টায় অরুণাচল প্রদেশে আরও কয়েকটি এলাকায় বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন ক্রমেই জোরদার হয়ে ওঠে। তখন আন্দোলনের পক্ষে কথা বলেন বিজেপির সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) মুখপত্র পাঞ্চজন্যের সাবেক সম্পাদক তরুণ বিজয়।

২০১২ সালের মে মাসে রাজ্যসভায় দেওয়া এক বক্তব্যে তরুণ বিজয় বলেন, ‘সরকারের মন্ত্রীরা আমাকে বলেন, “তরুণজি, এ নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। হয়তো চীনের লোকজন তাঁদের উসকানি দিচ্ছে।” এমন কথা বলা কি দায়িত্বশীলতার পরিচয়? সত্যিই যদি চীনের লোকজন আন্দোলনে উসকানি দিয়ে থাকে, তাহলে ওই মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পাঠানো সরকারের দায়িত্ব।’

আসামের গুয়াহাটি থেকে পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন আদি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাবেক একজন সদস্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। তা হলো জাতীয় নিরাপত্তার মূল্য কাদের দিতে হবে? উন্নয়নের সিদ্ধান্ত কে নেবে? নদীজনদের জীবনাচার ধ্বংস না করেও কি নদীকে কাজে লাগানো সম্ভব?

এরপর ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনী প্রচারে পাসিঘাটে গিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি তখনো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হননি। বক্তব্যে মোদি বড় আকারের বাঁধ নির্মাণের ঝুঁকি ও বিরোধিতার বিষয়টি কার্যত স্বীকার করে নেন। তিনি পরিবেশ রক্ষার জন্য ছোট আকারের প্রকল্পের মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর জোর দেন।

আরও পড়ুন

আবারও অবস্থান বদল

চলতি বছরের জুলাইয়ে অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি বসিরাম সিরাম একটি স্মারকলিপি দেন। স্মারকলিপিতে তিনি বলেন, ‘উজানে চীন পানি প্রত্যাহার করছে—এমন উদ্বেগের কারণে স্থানীয় আদিবাসীদের অবাধ ও আগে থেকে নির্দিষ্ট হয়ে থাকা অধিকার উপেক্ষা করা উচিত হবে না।’

সেপ্টেম্বরে ভারতীয় যুব কংগ্রেসের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক তারহ জনি এ বিষয়ে বিজেপি সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অরুণাচল প্রদেশ ও কেন্দ্র—দুই জায়গাতেই এখন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার। আদিবাসীদের ন্যায্য দাবি নিয়ে এ সরকারের অবস্থান একনায়কের মতো। তিনি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সঙ্গে স্বচ্ছতা বজায় রেখে অর্থবহ আলোচনার দাবি জানান।

এখন সিয়াং আপার প্রকল্পের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খানডু। গত ২১ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, প্রকল্পটির বিরুদ্ধে যেসব সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারী অবস্থান নিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি মুখ্য সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রকল্পটি নিয়ে ঠিক উল্টো অবস্থানে চলে গেছেন ওজিং তাসিং। একসময় প্রকল্পের বিরোধিতাকারীদের প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। অথচ কট্টর এই আন্দোলনকারী এখন মুখ্যমন্ত্রী পেমা খানডুর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তাসিং এখন অরুণাচল প্রদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ও পঞ্চায়েতিরাজ মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন।

একসময় পাহাড়ি নদীতে বাঁধ নির্মাণের বিরোধিতার রাজনীতি করতেন ওজিং তাসিং। এখন তিনিই বলেছেন, ‘আমরা যদি নিজেদের বাঁধ নির্মাণ না করি, আর চীন যদি তাদের বাঁধকে আমাদের বিরুদ্ধে “পানিবোমা” হিসেবে ব্যবহার করে; আমাদের ওপর তার প্রভাব কেমন হবে?’

রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি কৌশলগত যুক্তি। বলা হয়ে থাকে, চীন ইয়ারলুং সাংপো নদীতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। কাজেই ভারতেরও ভাটির দিকে নিজস্ব পানিসম্পদ কাজে লাগানো প্রয়োজন। সিয়াং নদী চীনা নিয়ন্ত্রিত তিব্বতে ইয়ারলুং সাংপো নামে পরিচিত।

চীনের প্রকল্পে উদ্বেগ

ভারতের এমন পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৮২ সালে ভারত যখন সিয়াং ও সুবনসিরি নদীর পানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করে, তখন চীনের বিষয়টি এতটা গুরুত্ব পায়নি।

পরে ইয়ারলুং সাংপো নদী নিয়ে চীনের পরিকল্পনা সামনে আসে। ২০০২ সালে ভারত ও চীন একটি সমঝোতায় পৌঁয়ায়। সমঝোতার আওতায় বন্যার মৌসুমে নদীর পানিপ্রবাহের তথ্য দিল্লিকে দেওয়ার কথা বেইজিংয়ের।

২০০৩ সালে এসে ভারত ৫০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি জাতীয় কর্মসূচি চালু করে। এর মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল অরুণাচল প্রদেশে। এ উদ্যোগের পর ইটানগরে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একের পর এক চুক্তি সই হয়।

এরপর ২০১১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে পার্লামেন্টে জানানো হয়, চীন উজানে সিয়াং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কাজে লাগিয়ে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করছে। এ পরিস্থিতিতে আসাম ও অরুণাচলে ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়।

২০১৩ সালে ইয়ারলুং সাংপো নদীতে চীনের আরও কয়েকটি প্রকল্পের পরিকল্পনার বিষয়ে উদ্বেগ জানায় নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে ভাটির দেশ হিসেবে নদীর পানিসম্পদে ভারতের স্বার্থের কথাও স্পষ্ট করে জানানো হয়।

সময়টা ২০১৭ সাল। কেন্দ্র ও অরুণাচল—দুই জায়গাতেই বিজেপির সরকার। তখন কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘নীতি আয়োগে’ সিয়াং আপার স্টেজ-১ ও স্টেজ-২ নামে প্রস্তাবিত দুটি প্রকল্পের পরিবর্তে একটি বড় জলাধার নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে সেটিও বদলে যায়। ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সমন্বিত প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এখন এ প্রকল্প নিয়ে বিক্ষোভ চলছে।

আরও পড়ুন

ভারতের পাশাপাশি চীনও তার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইয়ারলুং সাংপো নদীর ভাটির দিকে ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় বেইজিং।

পাঁচটি ধাপে সাজানো জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভারতের সীমান্তের কাছে নদীর খরস্রোতা অংশকে কাজে লাগানো এ প্রকল্পের লক্ষ্য। সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে নদীটিতে প্রায় ২ হাজার মিটার উঁচু খাড়া ঢাল রয়েছে। সেটাই কাজে লাগাতে চায় চীন।

চীন যদি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে, তাহলে ভাটিতে এর প্রভাব কেমন পড়বে, পানিপ্রবাহ কেমন থাকবে—সেটা নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ বেড়েছে। বিরূপ পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেওয়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এসব শঙ্কার জেরে সিয়াং নদীতে পানি সংরক্ষণের জন্য বড় জলাধার নির্মাণের পক্ষে ভারতের যুক্তি আরও জোরালো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

ভারতের এমন যুক্তির বিষয়ে সবাই একমত নন। দক্ষিণ এশিয়ার বাঁধ, নদী ও মানুষবিষয়ক নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক হিমাংশু ঠাক্কর বলেন, আন্তর্জাতিক আইনে তথাকথিত ‘প্রথম ব্যবহারকারীর অধিকার’ প্রতিষ্ঠার বাস্তবসম্মত কোনো সুযোগ নেই।

হিমাংশু ঠাক্কর আরও বলেন, ভারতের উচিত চীনের কাছে প্রকল্পের তথ্য চাওয়া। উজানে নির্মিত বাঁধগুলো কেমন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা জানতে যৌথভাবে প্রভাব মূল্যায়নের অধিকারও দাবি করা যেতে পারে।

নিজেদের মানুষের ওপর জোর করে বাঁধ চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ভারতের এ পথেই এগোনো উচিত, বলেন হিমাংশু ঠাক্কর।

আরও পড়ুন

আদিদের নজিরবিহীন বৈঠক

আদিবাসী আদিদের নিজস্ব একটি ঐতিহ্যবাহী কাউন্সিল আছে। নাম ‘কেবাং’। আদিদের গ্রামগুলোয় নিজেদের সমস্যাগুলো এ কাউন্সিলে আলোচনা করা হয়। গ্রামের মুরব্বিরা এই কাউন্সিলে নেতৃত্ব দেন। আর বৃহত্তর আদি জনগোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত হয় ‘বোগুম বোকাং কেবাং’ বা সর্বোচ্চ পরিষদ।

ভারতের অরুণাচল প্রদেশে সিয়াং নদী আসাম হয়ে বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র নদ নামে প্রবাহিত হয়েছে
ছবি: রয়টার্স

আদি সম্প্রদায়ে ‘বোগুম বোকাং কেবাং’–এর বৈঠক সচরাচর হয় না বললেই চলে। যাবতীয় সমস্যার সমাধান ‘কেবাং’–এ মিটিয়ে ফেলা হয়। তবে ২০২৫ সালের আগস্টে আদিরা ‘বোগুম বোকাং কেবাং’-এর বৈঠক ডেকেছিল। ২৫ বছর পর আপার সিয়াংয়ের গেকু এলাকায় এ পরিষদের বৈঠক হয়।

ভারত সরকারের প্রস্তাবিত বাঁধ নির্মাণ এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আগের ধাপের সমীক্ষার বিরোধিতা করতে নজির ভেঙে ‘বোগুম বোকাং কেবাং’-এর বৈঠক ডাকে আদি সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

সিয়াং আদিবাসী কৃষক ফোরামের (এসআইএফএফ) হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের জলাধারের কারণে স্থানীয় ২৭টি গ্রাম তলিয়ে যেতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আরও কয়েক ডজন গ্রাম। বাস্তুচ্যুত হতে পারে এক লাখ থেকে দেড় লাখ আদিবাসী।

এর অর্থ শুধু উর্বর ফসলি জমি, গ্রামের বসতি, ফলের বাগান আর জীবিকা হারানোর ভয় নয়। আদিদের কাছে এ ভূমির সাংস্কৃতিক আর ধর্মীয় গুরুত্বও অসীম। আদিদের বিশ্বাস, এ ভূমি তাঁদের আদি পূর্বপুরুষ আবো তানির। সিয়াং নদী আদিদের কাছে আনে সিয়াং (মা) হিসেবে পূজিত। নদীটি ঘিরে আদিদের সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন

কয়েকটি প্রশ্ন, উত্তর অজানা

অরুণাচল প্রদেশে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন একজন জ্বালানিবিশেষজ্ঞ। আদিদের ইতিহাস আর ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর ভালো জানাশোনা রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, পরিবেশ ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তি আছে ঠিকই; তবে বৃহত্তর বাঁধের বিষয়ে আদিদের বিরোধিতার কারণ আরও গভীরে। তারা নিজেদের জীবনাচার, সংস্কৃতি আর নিজেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার হারানোর ভয় পাচ্ছেন।

আসামের গুয়াহাটি থেকে পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন আদি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সাবেক একজন সদস্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। তা হলো জাতীয় নিরাপত্তার মূল্য কাদের দিতে হবে? উন্নয়নের সিদ্ধান্ত কে নেবে? নদীজনদের জীবনাচার ধ্বংস না করেও কি নদীকে কাজে লাগানো সম্ভব?

উত্তরগুলো এখনো অজানাই রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন