দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে সহিংসতা, ১৫০০ আটক

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের আগের দিন নির্বাচন কমিশনের কর্মীরা কেন্দ্রে ইভিএম ও ভিভিপিএটি নিয়ে যাচ্ছেন। ২৮ এপ্রিল ২০২৬, কলকাতাছবি: এএনআই

পশ্চিমবঙ্গ বিজয়ের পর বিজেপি মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কলকাতা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যাওয়ার আগে বলেছেন, কলকাতার বিশেষণ ‘সিটি অব জয়’ থেকে বদলে তাঁরা ‘সিটি অব ফিউচার’ করে দেবেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পাল্টা জবাব অন্যভাবে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। নেতারা দলীয় কর্মী–সমর্থকদের বলেছেন, এখন থেকেই সবুজ আবির কিনে রাখুন। ৪ মে ঘাটতি পড়তে পারে।

পরস্পরবিরোধী এই প্রত্যাশার মধ্যে আগামীকাল বুধবার সকাল থেকে শুরু হতে চলেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোট গ্রহণ। সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত ভোট হবে দক্ষিণবঙ্গের ৭ জেলার মোট ১৪২টি আসনে।

প্রথম দফার ১৫২ আসনের ভোট মোটামুটি নির্বিঘ্নে হলেও দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে কিছু কিছু আসনে সহিংসতা ছড়িয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির সমর্থকেরা সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। পরিস্থিতির সামাল দিতে মোতায়েন করা হয়েছে বাড়তি কেন্দ্রীয় বাহিনী। উত্তর প্রদেশের বহু চর্চিত এক পুলিশ কর্মকর্তা, ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ বলে পরিচিত অজয় পাল শর্মাকে রাজ্যে নিয়ে আসা হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের বাড়ি গিয়ে অজয় পাল তাঁকে শাসিয়েও এসেছেন। সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সঙ্গে বিতর্কও। এই পরিস্থিতিতে প্রথম দফার ভোটে দায়িত্ব পালন করা ২৬ জন পুলিশ কর্তাকে নির্বাচন কমিশন দ্বিতীয় দফাতেও নিযুক্ত করেছে।

তা সত্ত্বেও উত্তর চব্বিশ পরগনার ভাটপাড়া, হালিশহর, জগদ্দল, হাড়োয়া; হাওড়া; দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভাঙর ও বীরভূম জেলার লাভপুর ও মুরারইয়ে বিক্ষিপ্ত সশস্ত্র সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে পুলিশ ইতিমধ্যেই প্রায় ১ হাজার ৫০০ ব্যক্তিকে আটক করেছে।

নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে রোড শো করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২৭ এপ্রিল ২০২৬, কলকাতা
এএনআই

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন, ভোটের পর তৃণমূল কংগ্রেসের গুন্ডাদের উল্টো করে ঝুলিয়ে সোজা করবেন।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে উত্তর চব্বিশ পরগনার ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলকে। সেখানে অতিরিক্ত চার শীর্ষ পুলিশ কর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডায়মন্ডহারবারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অন্য তিন কর্মকর্তাকে।

হাওড়া, কৃষ্ণনগর, বারাসাত, বসিরহাট, বারুইপুর ও সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুজন করে শীর্ষ পুলিশ কর্তাকে। এই দফায় দক্ষিণবঙ্গের ৭ জেলায় মোতায়েন করা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী।

দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে নির্বাচন কমিশন আজ মঙ্গলবার অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। বাদ পড়া যে ২৭ লাখ ভোটার ট্রাইব্যুনালের বিচারের অপেক্ষায়, তাঁদের মধ্যে এবার ভোট দেওয়ার ছাড়পত্র পেলেন মাত্র ১ হাজার ৪৬৮ জন। এখান থেকে প্রথম দফায় ভোট দিতে পেরেছিলেন মাত্র ১৩৯ জন।

এর অর্থ, নির্বাচন কমিশন এসআইআরের কাজ সময়মতো শেষ করতে না পারায় ২৭ লাখ মানুষ এই ভোটে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারলেন না। এই গাফিলতির দায় কমিশন নেয়নি।

প্রথম দফার এলাকাগুলো যেমন ছিল বিজেপির শক্ত ঘাঁটি, দ্বিতীয় দফার ৭ জেলা তেমন তৃণমূল কংগ্রেসের গড়। যেমন কলকাতা। শহর কলকাতার ১১ আসনের একটিও গতবার বিজেপি জিততে পারেনি। সব আসন জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। হাওড়াতেও একই ছবি। ১৬ আসনের প্রতিটিই তৃণমূলের। পূর্ব বর্ধমানেরও ১৬ আসনের প্রতিটি তৃণমূলের জেতা। হুগলির ১৮ আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৪টি।

তবে নদিয়া জেলায় বিজেপি ১৭ আসনের মধ্যে ৯টি আসন জিতেছিল। প্রথম দফায় ভালো ফলের আশা করলেও দ্বিতীয় দফায় বিজেপি কতটা টক্কর দেবে, তার ওপর নির্ভর করবে সরকার গড়ার প্রশ্ন। গতবার এই ১৪২ আসনের মধ্যে তারা জিতেছিল মাত্র ১৪টি। সব দফা মিলিয়ে ৭৭টি। এখান থেকে সংখ্যাটা ১৫০–এ নিয়ে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। সে জন্য যে সুনামির প্রয়োজন খালি চোখে তার পূর্বাভাস কোথাও নেই।

বিজেপির পক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রোড শো–তে সড়কের দুই পাশে নেতা–কর্মী–সমর্থকেরা। ২৭ এপ্রিল ২০২৬, উত্তর চব্বিশ পরগনা
এএনআই

দ্বিতীয় দফায় তৃণমূল এবারও চেয়ে আছে উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ওপর। উত্তর চব্বিশ পরগনায় ৩৩ ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ৩১, মোট ৬৪ আসনের মধ্যে তৃণমূল গতবার একাই জিতেছিল ৫৮টি। এই দুই জেলায় দাঁত ফোটাতে না পারলে সরকার গড়ার আশা বিজেপিকে ছেড়ে দিতে হবে।

উত্তর চব্বিশ পরগনা মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় বিজেপির পদ্মফুল এবারও হয়তো ফুটবে। বারাকপুর শিল্পাঞ্চলেও তারা তৃণমূলের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা তাদের হতাশ করেছে। এখানে তৃণমূলের প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিমদের নতুন দল আইএসএফ।

ভোটপর্ব চলাকালে নারী সংরক্ষণসংক্রান্ত সংবিধান সংশোধন বিল পাস করাতে ব্যর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেটা আদর্শ আচরণবিধি ভঙ্গের শামিল বলে বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের কাছে আপত্তি জানিয়েছিল। কোনো লাভ হয়নি। কমিশন সেই অভিযোগ আমলে নেয়নি।

এবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিরুদ্ধে বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্য করার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হলো কলকাতা হাইকোর্টে। শাহর বিরুদ্ধে এফআইআর করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়ে অভিযোগকারী আইনজীবী শুভাশিস দাশগুপ্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। ৩০ এপ্রিল শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।