সোনিয়ার নাগরিকত্ব মামলা আবার শুরুর নির্দেশ, শাসক দলের হাতে ‘নতুন অস্ত্র’
নাগরিক না হয়েও সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় নাম তোলা নিয়ে করা মামলা আবার শুরু করার নির্দেশ দিল দিল্লির বিশেষ আদালত।
গতকাল সোমবার দিল্লির দ্বারকার বিশেষ আদালতের বিচারক বিশাল গোগনে এ নির্দেশ দেন। তাঁর এজলাসে ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ওই মামলার শুনানি নতুন করে শুরু হবে।
দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালতে সেন্ট্রাল দিল্লি বার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি বিকাশ ত্রিপাঠির হয়ে মামলাটি করেছিলেন আইনজীবী পবন নারাং। তাঁর অভিযোগ ছিল, ‘জালিয়াতি’ করে সরকারি সংস্থাকে ‘প্রতারণা’ করেছেন সোনিয়া।
২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বরের সেই মামলায় অভিযোগকারীর আবেদন খারিজ করে দিয়েছিলেন রাউস অ্যাভিনিউ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক চৌরাসিয়া। তাঁর যুক্তি ছিল, অভিযোগকারী উপযুক্ত প্রমাণ দিতে পারেননি।
রাউস অ্যাভিনিউ নিম্ন আদালতের সেই রায় গতকাল খারিজ করে দেন দ্বারকার বিশেষ আদালতের বিচারক বিশাল গোগনে। তিনি বলেন, নিম্ন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ দেওয়ার সময় যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করেননি। ম্যাজিস্ট্রেটের উচিত ছিল পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য শোনা ও সংশ্লিষ্ট থানা থেকে তদন্তের অগ্রগতির প্রতিবেদন চাওয়া। কিন্তু তা করা হয়নি। অভিযোগ পাওয়ার পর ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশকে এফআইআর দায়ের করার নির্দেশও দেননি। অন্য কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায় কি না, সেই বিবেচনাও করেননি।
বিচারক গোগনে বলেন, অভিযোগে তথ্যের ঘাটতি থাকার দাবি ঠিক ছিল না। বিচারকের রায়ে সুস্পষ্ট আইনি ত্রুটি ছিল। কাজেই তাঁর এজলাসে ওই মামলার শুনানি নতুনভাবে শুরু হবে।
গত বছরের শুরুতে সোনিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার অভিযোগ প্রথম এনেছিলেন বিজেপির আইটি সেলের তৎকালীন প্রধান অমিত মালবিয়া। তিনি অভিযোগ করেছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বলেছিলেন, খাতা-কলমে নাগরিক হওয়ার আগেই সোনিয়ার নাম ভোটার তালিকায় তোলা হয়েছিল। নিজের দাবির পক্ষে ‘প্রয়োজনীয় নথিও’ তিনি দাখিল করেছিলেন।
অমিত মালবিয়ার অভিযোগ ছিল, ৪৫ বছর আগে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগসাজশ করে ওই ‘জালিয়াতি’ করা হয়েছিল। যদিও তখন সোনিয়া ভারতের নাগরিকত্বই পাননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা সেই অভিযোগের সমর্থনে ‘নথি’ হিসেবে অমিত মালবিয়া ১৯৮০ সালের দিল্লির ভোটার তালিকার এক ছবিও পেশ করেছিলেন। সেই ছবি দেখিয়ে বিজেপি নেতা দাবি করেছিলেন, ১৯৮০ সালে লোকসভা ভোটের আগে নয়াদিল্লি কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় সোনিয়া গান্ধীর নাম উঠেছিল। সোনিয়া সে সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনেই থাকতেন।
বিজেপির অভিযোগ, ১৯৮০ সালে তোলা সোনিয়ার নাম ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ভোটার তালিকায় ছিল। যদিও সোনিয়া ভারতের নাগরিক হন ১৯৮৩ সালে। সে কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছিল।
সোনিয়া গান্ধী ১৯৬৮ সালে ইতালি থেকে ভারতে এসেছিলেন রাজীব গান্ধীকে বিয়ে করবেন বলে। দিল্লি এসে তিনি উঠেছিলেন গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ মিত্র বিশিষ্ট কবি হরিবংশরায় বচ্চনের সরকারি বাসভবনে। রাজীব ছিলেন হরিবংশরায়ের ছেলে চলচ্চিত্র অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের বাল্যবন্ধু।
দ্বারকার বিশেষ আদালতের এ রায় সোনিয়া গান্ধী ও কংগ্রেসের জন্য নতুন বিড়ম্বনা। এ বছরের নভেম্বর মাসের ১০ তারিখে সোনিয়ার আত্মজীবনী ‘বিলংগিং: অ্যা জার্নি অব লাভ’ প্রকাশিত হবে। ভারতে সেটি প্রকাশের কথা ছিল পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার। কিন্তু তথ্যগত আপত্তির কারণে পেঙ্গুইন পেছিয়ে যায়। অনেকে এর পেছনে রাজনৈতিক অভিসন্ধি দেখলেও পেঙ্গুইন তা অস্বীকার করে। পরে হারপার কলিন্স প্রকাশন সংস্থা জানায়, ভারতে তারা সোনিয়ার আত্মকথা প্রকাশ করবে।
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন নিয়ে ভারতজুড়ে বিপুল হইচই চলছে। দিল্লির ভোটার তালিকায় অসংগতির কারণে নোটিশ গেছে বহু পরিচিত মানুষের কাছে। ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
কংগ্রেসসহ বিরোধীদের অভিযোগ, সংশোধনের নামে বিজেপি-ইসি যুগলবন্দী প্রকৃত নাগরিকদের নাম কেটে নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করছে শাসকদলের জয় নিশ্চিত করতে। এ পরিস্থিতিতে সোনিয়া-মামলা নতুন করে শুরুর নির্দেশ শাসক দলের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দেবে। তারা বলতে পারবে, কংগ্রেস তাদের সময় অন্যায়ভাবে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করেছিল। নাগরিকত্ব লাভের আগেই ভোটার তালিকায় নাম তুলে দিয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিদেশি পুত্রবধূর।