মণিপুরে সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬০

ভারতের মণিপুরে সহিংসতায় গৃহহারা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সেনাসদস্যরা। গতকাল তোলা
ছবি: এএনআই

ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং গতকাল সোমবার বলেছেন, রাজ্যে সহিংসতায় মৃত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৬০ হয়েছে। তবে সহিংসতা বন্ধের দুই দিন পরও কেন মৃত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেই ব্যাখ্যা দেননি তিনি। ধারণা করা হচ্ছে, সহিংসতায় আহত কারও কারও এরই মধ্যে মৃত্যু হয়েছে অথবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এখন মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে।

এই প্রথম রাজ্য সরকারের তরফে মুখ্যমন্ত্রী নির্দিষ্টভাবে মৃত মানুষের সংখ্যা জানালেন। অবশ্য বিবিসি সরকারি সূত্রকে উদ্ধৃত করে মৃত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৬৫ হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, তিন দিনের সহিংসতায় ২৩১ জন আহত হয়েছেন। ধর্মীয় স্থানসহ প্রায় ১ হাজার ৭০০ ঘরবাড়ি পোড়ানো হয়েছে।

রাজ্যের মন্ত্রিসভা সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ৫ লাখ ভারতীয় রুপি, গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ২ লাখ টাকা এবং তুলনামূলক কম আহত ব্যক্তিদের ২৫ হাজার রুপি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বীরেন সিং গতকাল সোমবার রাতে সাংবাদিকদের আরও বলেন, যাঁরা সহিংসতায় প্ররোচনা দিয়েছেন এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যাঁরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করেননি, তাঁদের চিহ্নিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে ৩৫ হাজার ৬৫৫ ব্যক্তি সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৫৯৩ শিক্ষার্থী রয়েছেন। তাঁদের নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, প্রায় ১০ হাজার মানুষ মণিপুরের বিভিন্ন স্থানে এখনো আটকা পড়ে আছেন। তাঁদের নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আশ্রয়শিবিরে সর্বোত্তম সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

বীরেন সিং আরও বলেন, দুর্বৃত্ত ও আন্দোলনকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকে ১ হাজার ৪১টি অস্ত্র ও ৭ হাজার ৪৬০টি গোলাবারুদ ছিনিয়ে নিয়েছে। এ পর্যন্ত ২১৪টি অস্ত্র ও ৪ হাজার ২৭৩টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।

মণিপুরে সহিংসতা চলাকালে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে কর্ণাটকে সময় দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সরব মণিপুরের স্থানীয় গণমাধ্যম। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আর কে সিংয়ের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর একযোগে সব জায়গায় থাকার প্রয়োজন নেই।

মণিপুর হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের

গতকালই সুপ্রিম কোর্ট মৌখিকভাবে মন্তব্য করেছেন, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে তফসিলি উপজাতি তালিকার জন্য একটি সম্প্রদায়ের নাম সুপারিশ করতে পারে না। হাইকোর্টের সেই এখতিয়ার নেই।

গত ১৪ এপ্রিল মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেন, মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায় (৫৩%) ভারতে তফসিলি উপজাতি হিসেবে সংরক্ষণ পেতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখতে। এরপরই মণিপুরে অস্থিরতা এবং তারপরে সহিংসতা শুরু হয়।

গতকাল ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি পি এস নরসিমাহ এবং বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালার তিন সদস্যের বেঞ্চ মণিপুর রাজ্যে চলমান অস্থিরতার বিষয়ে শুনানির সময়ে হাইকোর্টের এখতিয়ার প্রসঙ্গে মন্তব্যটি করেন।

সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ দুটি পিটিশন বিবেচনা করছিল। একটি মণিপুর ট্রাইবাল ফোরামের করা, যেখানে সাম্প্রতিক সহিংসতা এবং আক্রান্তদের জন্য ত্রাণ বণ্টনের গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তদন্তও দাবি করা হয়েছে।

দ্বিতীয় আবেদনটি করেন মণিপুর বিধানসভার সদস্য ও পার্বত্য অঞ্চল কমিটির চেয়ারম্যান ডিংগাংলুং গ্যাংমেই। তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, কোনো সম্প্রদায়কে উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে রাজ্য সরকারকে হাইকোর্ট নির্দেশ দিতে পারে কি না। সেই প্রসঙ্গেই মৌখিকভাবে হাইকোর্টের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্ট।

হাইকোর্টের এই নির্দেশ আগামী দিনে পুরোপুরি খারিজ করতে পারেন সুপ্রিম কোর্ট। এর জেরে নতুন করে মণিপুরে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইরা সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত এক কথায় মেনে নেবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে মেইতেই সম্প্রদায়ের ওপর মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। কারণ, মণিপুর বিধানসভার অধিকাংশ সদস্যই মেইতেই সম্প্রদায়ের।