গালওয়ান নিয়েই কি ভয়, কেন সাবেক সেনাপ্রধানের বই প্রকাশের অনুমতি দিচ্ছে না মোদি সরকার
ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নরবনের লেখা অপ্রকাশিত বই কী করে বিরোধীদের হাতে এল, তা নিয়ে দিল্লি পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। গত সোমবার ওই বই নিয়ে দিল্লি পুলিশ এফআইআর রুজু করেছে।
পুলিশ খতিয়ে দেখছে, যে বই এখনো প্রকাশিতই হয়নি, সেই বইয়ের কপি কী করে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীর হাতে এল। কীভাবে তিনি সেই বইয়ের অংশ লোকসভায় পড়তে চাইলেন।
ওই বই নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করেছে। লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীকে বিষয়টি নিয়ে বলতে বারবার বাধা দেওয়া হয়েছে। বিরোধী সদস্যদের বহিষ্কার পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে বিরোধী সদস্যরা অনাস্থা প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। প্রস্তাবে সই করেছেন ১১৮ জন বিরোধী সংসদ সদস্য। মঙ্গলবার প্রস্তাবটি পেশের নোটিশ জমা দেন কংগ্রেসের সদস্য গৌরব গগৈ ও কে সুরেশ।
দিল্লি পুলিশ এফআইআর রুজু করার দিনেই ওই বইয়ের প্রকাশক পেঙ্গুইন র্যানডম হাউস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাবেক সেনাপ্রধানের লেখা ওই আত্মজীবনী, যার নাম ‘ফোর স্টারস অব ডেস্টিনি’, এখনো পর্যন্ত পুস্তক আকারে অথবা ডিজিটালি প্রকাশিত হয়নি। ছাপার আকারে অথবা ডিজিটালি ওই বই বিক্রি বা বিতরণও করা হয়নি।
৪৪৮ পৃষ্ঠার ওই বইয়ের একটি পিডিএফ ফরম্যাট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। প্রকাশক জানিয়েছে, তারা কিছু প্রকাশ করেনি।
অথচ মঙ্গলবার সংসদ ভবন চত্বরে রাহুল গান্ধী সাবেক সেনাপ্রধানের এক পুরোনো টুইট দেখিয়ে বলেন, ২০২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর নরবনে নিজেই জানান, তাঁর বইটি বেরিয়ে গেছে। বইটি অ্যামাজনে পাওয়া যাচ্ছে। সেই লিংক দিয়ে নরবনে লিখেছেন, ‘আনন্দের সঙ্গে পড়ুন। জয় হিন্দ।’
রাহুল বলেন, বইটির প্রকাশক পেঙ্গুইন র্যানডম হাউস যা বলছে, তার সঙ্গে সাবেক সেনাপ্রধান মনোজ মুকুলের টুইটের মিল নেই। দুজনের একজন সত্য বলছেন। আমি নরবনেকে বিশ্বাস করছি।
প্রকাশকের বিবৃতির পর এখন মনে করা হচ্ছে, দিল্লি পুলিশের তদন্তকারী কর্তারা এবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর দরজায় কড়া নাড়বেন। তাঁরা জানতে চাইবেন, যে বই প্রকাশিতই হয়নি, তার কপি রাহুল কী করে পেলেন। কী করেই–বা তার পিডিএফ ফরম্যাট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে এল।
পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে ২০২০ সালের জুনে যখন ভারত ও চীনের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, জেনারেল নরবনে তখন ছিলেন সেনাপ্রধান। ২০২২ সালে তিনি অবসর নেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি ওই বই লেখেন, যা প্রকাশের অনুমতি ভারত সরকার এখনো পর্যন্ত দেয়নি।
দেড় বছর ধরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কেন বইটিকে ছাড়পত্র দেয়নি, কী কী কারণে, তা নিয়ে সরকার কোনো মন্তব্যও করেনি।
ওই বইয়ের কিছু অংশবিশেষ সম্প্রতি ভারত থেকে প্রকাশিত ইংরেজি ‘ক্যারাভান’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে লেখা, ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে মজুত চীনা সেনারা যখন ট্যাংক নিয়ে কৈলাস রেঞ্জের দিকে এগোচ্ছিলেন, সেনাপ্রধান তখন তা জানতে পেরে রাজনৈতিক নেতাদের জানান ও তাঁর কী করণীয় জানতে চান।
মনোজ মুকুল ফোন করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকেও। কিন্তু কেউই তাঁকে কী করতে হবে জানাননি। অনেক পর রাজনাথ সিং বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে।
রাজনাথ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, সেনাপ্রধান যা উপযুক্ত মনে করবেন, সেটাই করুন। বইটির যে অংশ ওই সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়, তাতে লেখা হয়েছে, ওই নির্দেশ শুনে সেনাপ্রধান অসহায় বোধ করেছিলেন।
ক্যারাভানে প্রকাশিত অংশে মনোজ মুকুলের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানালেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এটা সামরিক সিদ্ধান্ত, যা উচিত মনে হয়, তাই করুন। আমার ঘাড়ে কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ল। পুরো দায়ভার বর্তাল আমারই ওপর। আমি গভীর শ্বাস নিলাম। চুপচাপ বসে রইলাম কয়েক মুহূর্ত। দেয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দ ছাড়া সব শান্ত ছিল।’
লোকসভায় রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বিতর্কে অংশ নিয়ে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী ওই সাময়িকীতে প্রকাশিত তথ্য থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার পাশাপাশি বলেছিলেন, যে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নেওয়ার কথা, তা তিনি সেনাপ্রধানের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন।
রাহুলের অভিযোগ, এটাই বিজেপির দেশপ্রেমের নমুনা। দেশের নিরাপত্তা এই সরকার নিশ্চিত করতে পারে না।
রাহুলকে ওই বিষয়ে কিছুই বলার অনুমতিই দেওয়া হয়নি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, সংসদীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুরা সম্মিলিতভাবে তীব্র আপত্তি জানান। তাঁদের দাবি, যে বই প্রকাশিতই হয়নি, তা থেকে কেউ কীভাবে উদ্ধৃতি দিতে পারেন?
স্পিকার ওম বিড়লা সেই যুক্তি গ্রহণ করে বলেন, শুধু অপ্রকাশিত বই নয়, প্রকাশিত গ্রন্থ থেকেও সব উদ্ধৃতি সব সময় দেওয়া যায় না। বিশেষ করে তা যখন দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
রাহুলের যুক্তি ছিল, তিনি মনগড়া কিছু বলছেন না, যা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছেন, তা একটি সাময়িকী, যা ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। মঙ্গলবার তিনি প্রমাণের চেষ্টা করলেন, সরকার দাবি জানালেও বইটি বাজারে ছিল। মনোজ মুকুল নিজেই তা স্বীকার করেছেন।
বিতর্কের অবসান আজও হয়নি। বরং জটিলতর হয়েছে। লোকসভার বিরোধী নেতাকে বলতে না দেওয়ায় দিনের পর দিন মুলতবি হয়ে যাচ্ছে অধিবেশন। স্পিকার ইতিমধ্যেই আটজন বিরোধী সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জ্ঞাপন প্রস্তাব পাস করা হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জবাবি ভাষণ ছাড়াই। সংসদীয় ভারতের ইতিহাসে যা কোনো দিন ঘটেনি। জবাবি ভাষণ দিতে প্রধানমন্ত্রী লোকসভায় হাজিরও হননি।
কেন মোদি উপস্থিত হননি, সেই ব্যাখ্যায় স্পিকার ওম বিড়লা জানিয়েছেন, তাঁর কাছে খবর ছিল, প্রধানমন্ত্রী আক্রান্ত হতে পারেন। কেননা, প্রধানমন্ত্রীর আসনের সামনে দাঁড়িয়ে বিরোধী নারী সদস্যরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। ফলে তিনিই (স্পিকার) প্রধানমন্ত্রীকে সভাকক্ষে আসতে বারণ করেছিলেন।
এবার বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাব সরকার পক্ষ ও বিরোধীদের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত করে তুলল। প্রস্তাব গৃহীত হলে তা খারিজ হওয়ার সম্ভাবনা এক শ শতাংশ। কারণ, লোকসভায় বিরোধীদের সেই শক্তি নেই। দিল্লি পুলিশ তদন্তের নামে কী করে, সেই দিকেই এখন সবার নজর।