‘কলেজিয়াম’ হলো বিচারপতি নিয়োগে বিচারপতিদের জোট। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগের দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টেরই। এখানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগে প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর সঙ্গে চার জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মিলে সিদ্ধান্ত নেন। আর হাইকোর্টে বিচারপতি নিয়োগ করার ক্ষেত্রে ওই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং তাঁর সঙ্গে দুই জ্যেষ্ঠ বিচারপতি নাম নির্ধারণ করে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠাবেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কলেজিয়াম সেটা যাচাই–বাছাই করে সুপারিশ করবেন।

কলেজিয়াম পদ্ধতিতে সুপ্রিম কোর্ট এলাহাবাদ, মাদ্রাজ ও কলকাতা হাইকোর্টে নিযুক্তির জন্য ১৭ আইনজীবী ও ৩ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার নাম চূড়ান্ত করে কেন্দ্রের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছিল। কেন্দ্র আপত্তি জানিয়ে তালিকাটি ফেরত পাঠায়।

পুনরায় বিবেচনার পর সর্বোচ্চ আদালত সেই পুরোনো তালিকাই নতুন করে কেন্দ্রের অনুমোদনের জন্য পাঠিয়ে দেন। সেই সঙ্গে কোন কোন নামে সরকারের আপত্তি, কী কারণে এবং কেন তা গ্রহণীয় নয়, সেই যুক্তি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে গত বৃহস্পতিবার তুলে দেওয়া হয়। অতীতে কখনো এমন হয়নি।

দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের জন্য নাম পাঠানো হয়েছিল সৌরভ কৃপালের। তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তির কারণ হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকার রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিক্যাল উইংয়ের (র) রিপোর্টের উল্লেখ করেছিল। যাতে বলা হয়েছিল, সৌরভ কৃপাল সমকামী। তা ছাড়া তাঁর সঙ্গী বিদেশি নাগরিক (সুইজারল্যান্ড)। এই আপত্তি খারিজ করে প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি এস কে কল ও বিচারপতি কে এম জোসেফের ‘কলেজিয়াম’ সরকারকে জানান, সমকামিতা সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ে বলা হয়েছে যৌনতার ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষ নিজস্বতা ও সম্মান রক্ষার অধিকারী। সমকামিতার জন্য তাঁর নিযুক্তি অগ্রাহ্য করার অর্থ সংবিধানের নীতির বিরোধিতা করা।

এরই পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে এ কথাও জানিয়ে দেন, সৌরভ কৃপালের সঙ্গী বিদেশি, এই আপত্তিও অসাড়। কারণ, সাংবিধানিক পদাধিকারীদের বিদেশি স্ত্রী থাকার একাধিক উদাহরণ এ দেশে রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট এই আপত্তি খারিজ করার ক্ষেত্রে দুটি উদাহরণ পেশ করেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণন (তাঁর স্ত্রী সাবেক বার্মা, অধুনা মিয়ানমারের নাগরিক ছিলেন) ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের (স্ত্রী জাপানের নাগরিক ছিলেন) উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, সৌরভ কৃপালের সঙ্গী বিদেশি হওয়ার যুক্তিও খাটে না। বরং তাঁর যোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা ও সংহতিবোধ প্রশ্নাতীত। তাঁর নিযুক্তি দিল্লি হাইকোর্টকে সমৃদ্ধ করবে। কলেজিয়াম অবশ্য এ কথাও জানিয়েছেন, সমকামী হওয়ার দরুণ তাঁর প্রার্থীপদ কেন্দ্র খারিজ করেছে এ কথা তিনি প্রকাশ্যে না বললেই পারতেন।

আরএসএসের প্রধান মোহন ভাগবত সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সমকামিতা নিয়ে বলেছেন, তাঁরাও মানুষ। তাঁদেরও পছন্দমতো ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য জীবনযাপনের অধিকার আছে। অন্যদের মতো তাঁদেরও রয়েছে বেঁচে থাকার অধিকার। এ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি না করাই শ্রেয়। মানবিক দৃষ্টিতে বিষয়টির বিচার করা উচিত।
মাদ্রাজ হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে কেন্দ্র জন সত্যেন এবং বম্বে হাইকোর্টের জন্য সোমাশেখর সুন্দরেশনের নাম খারিজ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশ করার জন্য। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লেখা এক নিবন্ধের সমালোচনা করেছিলেন সত্যেন। তা ছাড়া মেডিকেলে ভর্তি হওয়ায় আগ্রহী অনিতা নামের এক ছাত্রীর আত্মহত্যা প্রসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক লেখায় তিনি ‘ভারত, এ তোমার লজ্জা, দেখো , ভাবো, বিচার করো’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। সোমাশেখর সুন্দরেশন সমালোচনা করেছিলেন নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছেন, সরকারি নীতি, উদ্যোগ ও ভাবনার প্রকাশ্য সমালোচনা কখনো বিচারপতি হিসেবে কারও নিযুক্তির অন্তরায় হতে পারে না। সোমাশেখর সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি বাণিজ্যিক আইনে পারদর্শী। বম্বে হাইকোর্টে তাঁর নিযুক্তি তাই গুরুত্বপূর্ণ।

কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে কেন্দ্রের আপত্তি খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট আবার নাম পাঠিয়েছেন আইনজীবী অমিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ও শাক্য সেনের। অমিতেশের বাবা ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। শাক্য সেনের বাবা শ্যামল সেন ছিলেন সাবেক বিচারপতি ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক রাজ্যপাল। উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় গোধরার ট্রেন অগ্নিকাণ্ডের তদন্তে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খারিজ করে দিয়ে বলেছিলেন, আগুন লেগেছিল অন্য ত্রুটিতে, ষড়যন্ত্র করে লাগানো হয়নি।

প্রচলিত ‘কলেজিয়াম’ পদ্ধতিতে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় আপত্তি পুনরায় বিবেচনার পর দ্বিতীয়বার একই নাম ফেরত পাঠালে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে তা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সুপ্রিম কোর্ট এবার এই নিয়মের উল্লেখ করে তালিকা পাঠিয়েছেন। এখন দেখার, সরকার কী করে। সরকার অনির্দিষ্টকাল সিদ্ধান্ত না নিয়ে বসে থাকতে পারে যেহেতু তা গ্রহণ বা বর্জন কোনো কিছুই নির্দিষ্ট করে না। যেমন সৌরভ কৃপালের নিযুক্তির প্রশ্নটি অমীমাংসিত রয়েছে গত পাঁচ বছর।

নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর কলেজিয়াম পদ্ধতি বদলের জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। ২০১৪ সালে সরকার ‘ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাপয়েনটমেন্টস কমিশন অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টে বিচারপতি নিয়োগের নতুন বিধি নিয়ে আসে, যেখানে সরকার ও বিশিষ্ট নাগরিকদের ভূমিকা রাখা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট তা ২০১৫ সালে ‘অসাংবিধানিক’ বলে খারিজ করে দেন। সেই সঙ্গে ১৯৭৩ সালের রায়ের উল্লেখ করে বলেছিলেন, সংবিধান সংশোধনের অধিকার কেন্দ্রীয় সরকারের রয়েছে কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোয় বদল আনা যাবে না। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট ও কেন্দ্রের সংঘাতে অন্য মাত্রা জারি করেন উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়। তিনি বলেন, সংসদই সবার ওপরে। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সুপ্রিম কোর্টকে তাঁর অধিকারের সীমা লঙ্ঘন না করার পরামর্শও কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী ব্যক্তিরা দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী চিঠি লিখে প্রধান বিচারপতিকে বলেছেন, হাইকোর্টে বিচারপতি নিযুক্তির ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের অভিমত নেওয়া হোক।

কেন্দ্রীয় সরকারের আপত্তি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে তুলে দেওয়ার পর এই দ্বন্দ্ব অন্য মাত্রা পেল। কীভাবে এই বিরোধের মীমাংসা হবে, তা আগ্রহ বাড়াচ্ছে।