বাসা থেকে একে একে লাফিয়ে তিন বোনের আত্মহত্যা, কী কারণ বলছে পুলিশ
ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের গাজিয়াবাদে গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাতে তিন বোন তাদের নবম তলার বাসার থেকে নিচে লাফ দিয়েছে। এতে তিন বোনেরই মৃত্যু হয়েছে। লাফ দেওয়ার আগে তারা হাতে লেখা একটি নোট রেখে গেছে, যেখানে লেখা ছিল, ‘সরি পাপা’ (দুঃখিত বাবা)।
এই তিন বোনের নাম পাখি (১২), প্রাচী (১৪) ও বিশিকা (১৬)। অনলাইনে কোরীয় গেমে আসক্ত ছিল এই তিন বোন। মা–বাবা তাদের মুঠোফোন দেওয়া কমিয়ে দিলে গেম খেলা বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে তারা আত্মহত্যা করেছে বলা ধারণা করা হচ্ছে। গাজিয়াবাদের অবস্থান দিল্লির উপকণ্ঠে।
গভীর রাতে এই তিন বোন তাদের বাসার বারান্দায় গিয়ে দরজা আটকে দেয় এবং জানালা দিয়ে একে একে লাফিয়ে নিচে পড়ে। তাদের চিৎকার এবং মাটিতে আছড়ে পড়ার শব্দ এতটাই জোরালো ছিল যে তাদের মা–বাবা, প্রতিবেশী ও গাজিয়াবাদের ‘ভারত সিটি’ আবাসন কমপ্লেক্সের নিরাপত্তারক্ষীদের ঘুম ভেঙে যায়।
মা–বাবা যখন বারান্দার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার অতুল কুমার সিং বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিশ্চিত হই, চেতন কুমারের তিন মেয়ে ভবন থেকে লাফিয়ে মারা গেছে।’
আজ বুধবার সকালে দেখা গেছে, তিন মেয়ের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে, তাদের মা শোকে চিৎকার করে কাঁদছেন। সেখানে প্রতিবেশীদের ভিড় জমে গেছে।
তিন বোন একটি ‘কোরিয়ান লাভ গেম’-এ এতটাই আসক্ত ছিল যে তারা ওই গেম ছাড়া অন্য কিছু খুব কমই করত। জানা গেছে, দুই বছর আগে তারা স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল।
আট পৃষ্ঠার সুইসাইড নোট
তদন্ত কর্মকর্তারা এখন তাদের সুইসাইড নোট এবং সেখানে উল্লেখ করা একটি ডায়েরির ওপর নজর দিচ্ছেন। নোটে লেখা ছিল, ‘এই ডায়েরিতে যা কিছু লেখা আছে, সব পড়ে নিয়ো, কারণ এসবই সত্যি। এখনই পড়ো। আমি সত্যিই দুঃখিত। সরি পাপা।’
নোটটির সঙ্গে হাতে আঁকা একটি কান্নার ইমোজি ছিল। পকেট ডায়েরির আট পাতায় লেখা ওই নোটে তাদের গেমিং এবং মোবাইল ব্যবহারের খুঁটিনাটি বিবরণ লেখা ছিল।
তিন বোনের বাবা চেতন কুমার কোরীয় সংস্কৃতির প্রতি মেয়েদের চরম আসক্তির কথা বর্ণনা করেছেন। মা–বাবার মতে, তারা নিজেদের কোরীয় নামও রেখেছিল। মেজ বোন প্রাচী সব বিষয়ে তাদের নেতৃত্ব দিত।
ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রাণঘাতী গেমেও সে–ই নেতৃত্ব দিচ্ছিল। সম্প্রতি তাদের মা–বাবা তাদের মুঠোফোন ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছিলেন।
চেতন কুমার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘তারা বলেছিল, “পাপা সরি, কোরিয়া আমাদের জীবন, কোরিয়া আমাদের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। তুমি যা–ই বলো, আমরা এটা ছাড়তে পারব না।”’
মেয়েদের হারিয়ে ভেঙে পড়া এই বাবা আরও বলেন, ‘এমনটা যেন কোনো মা-বাবা বা সন্তানের সঙ্গে না ঘটে। বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানদের গেম খেলতে না দেওয়া। আমি গেমটির বিষয়ে জানতাম না, জানলে কখনোই তাদের খেলতে দিতাম না।’
তিন মেয়ের শোবার ঘরের দেয়ালে কিছু লেখা পাওয়া গেছে। যেমন ‘আমি খুব একা’ এবং ‘আমার হৃদয় ভেঙে গেছে’ (ইংরেজিতে ভুল বানানে লেখা)।
সিনিয়র পুলিশ অফিসার নিমিশ প্যাটেল বলেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো গেমের নাম পাওয়া যায়নি। তবে এটা স্পষ্ট, মেয়েরা কোরীয় সংস্কৃতিতে বেশ প্রভাবিত হয়েছিল। তাদের সুইসাইড নোটেও সেটার উল্লেখ আছে।
কয়েক দিন ধরে তিন বোনকে মুঠোফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি। সম্ভবত বিষয়টি তাদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
এই তিন বোন গোসল করা থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়া—সবই একসঙ্গে করত।
জানা গেছে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় তাদের এই গেমিং আসক্তি শুরু হয়। এর পর থেকে তারা স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা স্কুলে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।
পুলিশের তথ্যমতে, চেতন কুমার দুই বোনকে বিয়ে করেছেন। দুই স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি একসঙ্গে থাকেন। তাঁর সব সন্তানই মেয়ে। লাফ দিয়ে মারা যাওয়া মেয়েদের মধ্যে দুজন এক স্ত্রীর এবং তৃতীয়জন তাদের সৎবোন।