‘অবৈধ’ বাংলাদেশি-রোহিঙ্গাদের রাখতে পশ্চিমবঙ্গে আটককেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটককেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়–সংক্রান্ত দপ্তরের অধীনস্থ বিদেশি চিহ্নিতকরণ শাখা একটি নির্দেশিকা গত শনিবার জারি করেছে। এই নির্দেশিকার বিষয়, ‘আটক বিদেশি নাগরিক এবং নির্বাসন/স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা মুক্তিপ্রাপ্ত বিদেশি বন্দীদের জন্য হোল্ডিং সেন্টার (আটককেন্দ্র) স্থাপন।’
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (বিদেশি নাগরিক শাখা) ২০২৫ সালের মে মাসে একটি নির্দেশিকা দিয়েছিল। তার ভিত্তিতেই শনিবারের সার্কুলারটি দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে নির্দেশিকা দিয়েছিল, তার বিষয় ছিল, ‘অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিক এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া।’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৮ পাতার নির্দেশিকায় বলেছিল, বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা (মিয়ানমারের নাগরিক) যারা বেআইনিভাবে ভারতে বসবাস করছেন তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া জানাতেই ‘সংশোধিত নির্দেশিকাটি’ প্রকাশ করা হয়েছে। এই নির্দেশিকায় বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে, কীভাবে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠাতে হবে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকাটিকে ‘গোপনীয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সেই নির্দেশিকার ভিত্তিতেই শনিবারের সার্কুলার জারি করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্য সরকার এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) কী ভূমিকা হবে, তা–ও এই নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে তার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশিকার উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারকে গত বছরের মে মাসে পাঠানো হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সার্কুলারে বলা হয়েছে, ‘এই দেশে অবৈধভাবে বসবাসের জন্য আটককৃত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নির্বাসনের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, সেই সম্পর্কিত উপরোক্ত চিঠিটি এই সার্কুলারের সঙ্গে সংযুক্ত করা হলো।’ চিঠি বলতে এখানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকাকে বোঝানো হয়েছে।
রাজ্য সরকারের সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকা অনুযায়ী, আটককৃত বিদেশি নাগরিক এবং নির্বাসন (বা) স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকা মুক্তিপ্রাপ্ত বিদেশি বন্দীদের জন্য জেলায় হোল্ডিং সেন্টার (আটককেন্দ্র) স্থাপনের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ/উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকাটির অনুলিপি এর নিচে রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মহাপরিচালক, ইন্সপেক্টর জেনারেল, পুলিশ কমিশনার, সব পুলিশ কমিশনারেট, এফআরআরও বা বিদেশি নথিভুক্তীকরণ দপ্তর এবং সব জেলার পুলিশপ্রধানকে এই সার্কুলার পাঠানো হয়েছে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সচিব নির্দেশিকাটি জারি করেছেন বলে জানানো হয়েছে।
মানবাধিকারের প্রশ্ন
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, জেলায় জেলায় কৃষিপণ্য বিপণনের জন্য যে বড় কেন্দ্রগুলো রয়েছে, যেখানে অনেকটাই জমি খালি পড়ে থাকে, সেই কেন্দ্রগুলোকে এ ধরনের আটককেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবছে রাজ্য সরকার। আসামে বর্তমানে বিশাল আকারের এ ধরনের একটি কেন্দ্র রয়েছে। আসামে ছয়টি ডিটেনশন সেন্টার বা বন্দীশিবির এর আগে ছিল। সেই ছয়টি শিবির থেকে এখন একটি শিবিরে নিয়ে আসা হয়েছে এবং এটিকে ‘ট্রানজিট ক্যাম্প’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। কার্যত এটি বন্দীশিবিরই। পশ্চিমবঙ্গেও এখন এই প্রক্রিয়া শুরু হলো বলে মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবীরা মনে করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আইনজীবী বলেন, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে করা হচ্ছে। কাদের ধরা হচ্ছে, কোথায় রাখা হচ্ছে, কীভাবে এ ধরনের ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে, তা কিছুই এখনো জানা যায়নি। এটা চালু হলে আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গেও একেবারে দরিদ্র মানুষেরা চরম বিপদে পড়বেন।