আনন্দবাজার পত্রিকাকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বস্তি দিল কলকাতা হাইকোর্ট

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রবেশপথে একটি থাম গেরুয়া রং করে দিচ্ছে হিন্দুত্ববাদীরা। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ছবি: সংগৃহীত

আগামী ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বাংলা সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারবে না পুলিশ। সাংবাদিকদের রক্ষাকবচের আবেদনসংক্রান্ত মামলার শুনানিতে গতকাল শুক্রবার এমন নির্দেশ দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য।

আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, আগামী ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ধরনের কঠোর বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ নিতে পারবে না। আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক ঈশানী দত্ত রায়, প্রধান প্রতিবেদক সোমা মুখোপাধ্যায় এবং পুরো সম্পাদকীয় টিমের বিরুদ্ধে গত ২৮ আগস্ট বউবাজার থানায় একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ফৌজদারি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছিল। সঞ্জয় শাস্ত্রী মহারাজ নামের এক গৈরিকধারী সাধুর করা ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ উদ্যোগী হয়। উক্ত অভিযোগে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা হয়, যার মধ্যে ছিল ধর্ম বা গোষ্ঠীর ভিত্তিতে শত্রুতা ছড়ানো, বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা এবং প্ররোচনার মাধ্যমে শান্তির আবহ বিঘ্নিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ।

গত ২১ আগস্ট যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর সহিংসতার খবর পরিবেশন করতে গিয়ে ‘গেরুয়া গুন্ডামি’ এবং ‘প্রতীক ভেঙে গেরুয়া গুন্ডামি’ শীর্ষক শিরোনাম ব্যবহারের জেরে আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একাধিক পুলিশি এফআইআর দায়ের করা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য সাংবাদিক ও সম্পাদকীয় টিমের রক্ষাকবচের আবেদনসংক্রান্ত এই মামলাটির শুনানি গ্রহণ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে অবস্থিত শিল্পী নন্দলাল বসুর নকশা করা ঐতিহাসিক স্মারক ভেঙে ফেলার ঘটনা এবং সংঘর্ষের খবর জানাতে গিয়েই মূলত এই বিতর্কিত শব্দবন্ধ ব্যবহার করে পত্রিকাটি। এ ঘটনার পর শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষ থেকেও কড়া প্রতিক্রিয়া ও আপত্তি জানানো হয়েছিল। পুলিশের মামলার মুখে পড়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিকেরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন এবং ফৌজদারি প্রক্রিয়া ও সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এড়াতে জরুরি ভিত্তিতে আইনি সুরক্ষার আবেদন করেন।

মামলার প্রারম্ভিক শুনানির সময় প্রবীণ আইনজীবী এস এন মুখোপাধ্যায় যুক্তি উপস্থাপন করেন, সাংবাদিকেরা স্রেফ পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন, অথচ তাঁদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানি দেওয়ার মতো মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগ এনে হয়রানি করা হচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে জরুরি শুনানির আর্জি না মিললেও পরবর্তীকালে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে মামলাটির গতি লাভ করে। শুনানিতে রাজ্য সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত আইনজীবী জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতকে আশ্বাস দেন যে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের নোটিশ মেনে আইনজীবীরা তদন্তে সহযোগিতা করলে পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো বলপ্রয়োগকারী পদক্ষেপ নেবে না।

এদিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এই আঘাতের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। ফেডারেশন অব প্রেসক্লাব এক বিবৃতিতে জানায়, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এভাবে এফআইআর দায়ের করা প্রতিহিংসামূলক মনোভাবেরই প্রকাশ, যা কোনো সুস্থ প্রশাসনের লক্ষণ হতে পারে না। তারা অবিলম্বে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা সব মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

সাংবাদিক ও আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই আগামী ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশি বলপ্রয়োগে নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন আদালত। মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী ১ ডিসেম্বর নির্ধারিত হয়েছে। আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত আইনি হয়রানি থেকে সাময়িক স্বস্তি পেলেন শীর্ষ দৈনিকের সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকেরা।