বিহারের মুখ্যমন্ত্রিত্ব অবশেষে পেয়ে যাচ্ছে বিজেপি, নীতীশ যাচ্ছেন রাজ্যসভায়

ছেলে নিশান্ত কুমারের সঙ্গে বাবা নীতীশ কুমারছবি: এএনআই

অবশেষে হয়তো পূর্ণ হতে চলেছে বিজেপির বাসনা। সম্ভবত তারা পেতে চলেছে বিহারের মুখ্যমন্ত্রিত্ব। দীর্ঘ ২০ বছর মুখ্যমন্ত্রী থাকার পর নীতীশ কুমার হতে চাইছেন রাজ্যসভার সদস্য। এই পালাবদলের মধ্যে রাজনীতিতে অভিষেক হতে চলেছে নীতীশের ছেলে নিশান্তেরও।

নীতীশ দিল্লি গেলে সম্ভবত নিশান্ত হবেন উপমুখ্যমন্ত্রী। নীতীশের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিজেপির উপমুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর। বিজেপির কেউ আজ পর্যন্ত বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হননি।

মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার খবর নীতীশ নিজেই জানান। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা নাগাদ ‘এক্স’ হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, ‘গত দুই দশক ধরে আপনারা আমায় সমর্থন করেছেন, আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছেন, আমিও নিষ্ঠার সঙ্গে আপনাদের সেবা করে গেছি। আপনাদের ভরসা ও সমর্থনের দরুনই বিহার আজ উন্নয়নের নতুন উদাহরণ স্থাপন করেছে।’

এরপর নীতীশ লেখেন, ‘রাজনৈতিক জীবন শুরুর সময় থেকেই সংসদ ও বিধানসভার উভয় কক্ষের সদস্য হতে পারার বাসনা পোষণ করে চলেছি। বিধানসভা ও বিধান পরিষদের সদস্য হয়েছি, লোকসভার সদস্যও হয়েছি। এবার রাজ্যসভায় আসতে চলেছি। আপনাদের সঙ্গে আমার রাজনৈতিক সম্পর্ক অটুট থাকবে। আমিও বিহারের উন্নয়নে সমর্পিত থাকব। নতুন সরকারের প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন জারি থাকবে।’

গতকাল বুধবার থেকেই পালাবদলের এই আভাস ছড়িয়ে পড়েছিল। আজ বৃহস্পতিবার নীতীশ নিজেই তা জানানোয় শুরু হয় বিক্ষোভ। জেডিইউ সমর্থকেরা রাজধানী পাটনাসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রিত্ব পেতে বিজেপি এভাবে নীতীশ কুমারকে রাজ্য থেকে সরিয়ে দেওয়ার ছক কষেছে, এই চক্রান্ত বানচাল করতে হবে। জেডিইউ কর্মী–সমর্থকেরা মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনেও বিক্ষোভ দেখান।

বিক্ষোভকারী জেডিইউ নেতারা গণমাধ্যমকে বলেন, মাত্র কয়েক মাস আগেই তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নীতীশকে আরেকবার মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য ভোট চেয়েছেন। রাজ্যের বিধান পরিষদের (উচ্চকক্ষ) জেডিইউ নেতা সঞ্জয় সিং বলেন, রাজ্যসভায় কাউকে পাঠাতে হলে নীতীশের পুত্র নিশান্ত কুমারকে পাঠানো হোক। নীতীশ কুমারকেই মুখ্যমন্ত্রী রাখতে হবে।

এ বিক্ষোভে বিজেপি একটু বিব্রত। তারা এ থেকে নিজেদের আলাদা রাখতে চাইছে। বিহারের মন্ত্রী বিজেপি নেতা রামকৃপাল যাদব গণমাধ্যমকে বলেন, এটা ওদের দলীয় সিদ্ধান্ত। নীতীশ কুমারেরই সিদ্ধান্ত। এনডিএ জোটবদ্ধ আছে।

নীতীশ কুমার প্রথমবার বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন ২০০০ সালের মার্চ মাসে। সাত দিনের মাথায় রাজ্যে জারি হয় রাষ্ট্রপতির শাসন। পাঁচ বছর পর ২০০৫ সালে আবার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের মে মাস পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থেকে রাজ্যভার তুলে দেন জিতেন রাম মাঞ্ঝির হাতে। আবার তাঁর কাছ থেকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে।

দীর্ঘ ২০ বছরে একের পর এক পাল্টেছেন রাজনৈতিক সঙ্গী। অবশেষে এবার তিনি সরে দাঁড়াতে চলেছেন। সেই সঙ্গে পূর্ণ হতে চলেছে বিজেপির অপূর্ণ বাসনা।

সমাজতান্ত্রিক নীতীশ ও লালু প্রসাদ যাদবের বিপরীতে রাজনীতি করে বিজেপি কখনো একার ক্ষমতায় বিহার দখল করতে পারেনি। রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে জেডিইউকে সঙ্গী করতে হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা হয়ে উঠেছে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল।

গত বিধানসভার ভোটে জেডিইউর চেয়ে বেশি আসন পেয়েও বিজেপি শারীরিকভাবে অশক্ত নীতীশকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে দ্বিধা করেনি। তখন থেকেই বিহারি রাজনীতিতে প্রশ্ন ছিল, নীতীশ আর কত দিন। অবশেষে সেই উত্তর পাওয়া গেল।
চলতি বছরের ১ মার্চ নীতীশ ৭৫ বছর পূর্ণ করলেন। বিজেপি তলেতলে সেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। রাজ্যসভায় সম্মানজনক পুনর্বাসনের মাধ্যমে নীতীশের হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণের এই সুযোগ বিজেপি কাজে লাগাতে চাইছে।

নীতীশও এ সুযোগে এগিয়ে দিয়েছেন একমাত্র সন্তান নিশান্ত কুমারকে। ৫০ বছর বয়সী নিশান্ত কোনো দিন রাজনীতিতে আগ্রহ দেখাননি। তিনি পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। এক মাস ধরে হঠাৎই রাজনৈতিক মহলে নিশান্তের নাম আলোচনার স্তরে উঠে আসে।

কয়েক দিন আগেও মনে করা হচ্ছিল, বিহার থেকে রাজ্যসভা নির্বাচনে যে চারটি আসন (মোট আসন ৫) এনডিএ জিতবে, তার একটিতে নিশান্তকে মনোনীত করা হবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার ‘এক্স’ মারফত নীতীশের বার্তা বুঝিয়ে দিল, পুত্র নন, মুখ্যমন্ত্রিত্বের গুরুদায়িত্ব ছেড়ে পিতাই হতে চলেছেন রাজ্যসভার সদস্য।

বিহারের রাজনীতিতে জোর জল্পনা, নিশান্তের অভিষেক ঘটতে চলেছে উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। এখন দেখার, দলীয় বিক্ষোভের সামাল নীতীশ কীভাবে দেন।