শীতের আগেই বায়ুদূষণ মোকাবিলায় দিল্লির বড় ঘোষণা, চালু হচ্ছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’
দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বিদায় নিচ্ছে। এর ফলে দিল্লি-এনসিআর (জাতীয় রাজধানী অঞ্চল) এলাকায় শীতকালীন দূষণ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই দূষণ মোকাবিলায় একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ‘কর্মপরিকল্পনা’ চূড়ান্ত করতে সোমবার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সভাপতিত্বে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা, দিল্লির পরিবেশমন্ত্রী মণিন্দর সিরসা এবং বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সোমবার ঘোষিত পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ১ নভেম্বর থেকে রাজধানীর বাইরে নিবন্ধিত যেসব গাড়ি বিএস-সিক্স নির্গমন মানদণ্ড পূরণ করবে না, সেগুলোর দিল্লিতে প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকবে। এ ছাড়া শীতকালীন দূষণের এই সময়ে সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোর ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাসা থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) করতে হবে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
গাড়ির দূষণ রোধে ‘পলিউশন আন্ডার কন্ট্রোল সার্টিফিকেট (পিইউসিসি) ছাড়া জ্বালানি নয়’ নামে একটি প্রচার অভিযান চালানো হবে। অর্থাৎ দূষণমুক্ত হওয়ার সনদ না থাকলে কোনো গাড়িতে জ্বালানি দেওয়া হবে না। স্বয়ংক্রিয়ভাবে নম্বরপ্লেট শনাক্ত করার সুবিধাযুক্ত সব কটি (৫০০টি) জ্বালানি স্টেশনে এই নিয়ম কার্যকর হবে। বিবরণ উপস্থাপনে (প্রেজেন্টেশন) বলা হয়, গত ১২ মাসে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার ৫৫টি বিএস-থ্রি এবং আয়ু শেষ হয়ে যাওয়া পুরোনো গাড়ি শনাক্ত করা হয়েছে।
এই বিধিনিষেধগুলো ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
অনুমোদিত পার্কিং জায়গাগুলোতে পার্কিং ফি দ্বিগুণ করা হবে। তবে দিল্লি মেট্রোরেল করপোরেশনের নিজস্ব মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় থাকা পার্কিংগুলোর ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। পাশাপাশি অফিসগুলোর সময়সূচিও আলাদা করা হবে। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বায়ুমান ব্যবস্থাপনা কমিশনের কর্মকর্তাদের উপস্থাপনায় বলা হয়, দিল্লির মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের অফিসগুলো সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে। আর দিল্লি সরকারের অফিসগুলো সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চলবে।
এই পরিকল্পনায় আগামী ১০ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত সব ধরনের নির্মাণ ও ভাঙার কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ধুলা তৈরি করে—এমন ভাঙার কাজ এবং বাইরের সাধারণ নির্মাণকাজ ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভূপেন্দ্র যাদব বলেন, ‘বায়ুর মান উন্নত করার মূল চাবিকাঠি হলো নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর (হটস্পট) জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, সমন্বিত প্রয়োগ, নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক পর্যালোচনা।’
বিগত তিন বছরে বার্ষিক গড়ে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার করা হয়েছিল। এর তুলনায় ২০২৬ সালে দিল্লি ৩ হাজার ৬৫ কিলোমিটার রাস্তা নতুন করে সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বরের ভেতর ১ হাজার ১৯৩ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। আর ১ হাজার ৮৭২ কিলোমিটার রাস্তার কাজ এখনো বাকি রয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে সিমেন্ট-কংক্রিটের কাজ এবং ১৫ নভেম্বরের মধ্যে বিটুমিনের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উপস্থাপনায় বলা হয়, দিল্লিতে প্রতিদিন প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। এর বিপরীতে প্রক্রিয়াজাত করা হয় মাত্র ৭ হাজার ৬৪২ টন। তবে আশা করা হচ্ছে, অক্টোবরের মধ্যে নতুন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা প্রতিদিন ৫ হাজার ৯০০ টনে পৌঁছাবে। যান্ত্রিক সড়ক পরিচ্ছন্নতা মেশিনের (ঝাড়ু দেওয়ার গাড়ি) সংখ্যা ২০২৫ সালের ৭৬ থেকে বাড়িয়ে ৯৮ করা হয়েছে।
অলাভজনক সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ডের’ ভারতবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা হিশাম মুন্ডোল দ্য হিন্দুকে বলেন, ‘সারা বছরই নির্মল বাতাস নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। পরিবহন, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ওপর ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিলেই এটি সম্ভব হবে। আর এই পরিকল্পনা শুধু দিল্লির জন্য নয়; বরং পুরো অঞ্চলের জন্যই করতে হবে।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) একটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারের মাধ্যমে শিল্পকারখানায় নিয়মকানুন প্রয়োগ আরও জোরদার করা হবে। বায়ুর মান সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য স্টেশনের সংখ্যা ৪৭ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করা হয়েছে এবং ৩৩৪টি প্রয়োগকারী দল গঠন করা হয়েছে। উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১১ হাজার ২৭১টি শিল্পকারখানায় জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে দূষণকারী ২ হাজার ২৮৩টি কারখানা বন্ধ বা সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনায় আরও কিছু উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে সাপ্তাহিক পরিদর্শন, নাগরিকদের মাধ্যমে স্থানীয় দূষণ সমস্যার অভিযোগ জানানো, নাগরিকদের পরামর্শ নেওয়ার জন্য একটি নতুন পোর্টাল চালু করা, প্রতিদিন সন্ধ্যায় বায়ুমান সূচকের (একিউআই) বুলেটিন প্রকাশ এবং এয়ারশেড (বায়ু অঞ্চলভিত্তিক) পদ্ধতিতে এনসিআরভুক্ত শহরগুলোর সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতি
সোমবার দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় (সিএমও) জানিয়েছে, যেসব গাড়ির নির্ধারিত আয়ু শেষ হয়ে গেছে, ফিলিং স্টেশনগুলো সেগুলোতে আর জ্বালানি দেবে না। পেট্রলচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে এই আয়ু ১৫ বছর এবং ডিজেলচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে ১০ বছর। তবে এই নিয়ম ঠিক কবে থেকে কার্যকর হবে, তা তারা নির্দিষ্ট করে জানায়নি।
সিএমও আরও জানায়, এর আগে গত জুনে দিল্লি সরকার শীতকালীন বায়ুমান ব্যবস্থাপনার একটি আগাম রূপরেখা প্রকাশ করেছিল। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে দূষণের মাত্রা বাড়লে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, তার উল্লেখ ছিল ওই রূপরেখায়।
ওই রূপরেখা অনুযায়ী, শীতের মাসগুলোতে দিল্লির সব পেট্রলপাম্পে কেবল সেসব গাড়িকেই জ্বালানি দেওয়া হবে, যেগুলোর বৈধ পিইউসিসি (দূষণমুক্ত সনদ) থাকবে।
এ ছাড়া ১ নভেম্বর থেকে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত যেসব বাণিজ্যিক গাড়ি বিএস-সিক্স নিয়ম মানবে না, সেগুলোকে শহরে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
তবে সিএনজিচালিত গাড়ি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, জরুরি পরিষেবার গাড়ি এবং সরকারি কাজে নিয়োজিত গাড়িগুলো এই বিধিনিষেধের আওতামুক্ত থাকবে বলেও সিএমও জানিয়েছিল।