ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নতুন আতঙ্ক ভিপিএনে নিষেধাজ্ঞা, কেন মোদি সরকারের এ নিয়ন্ত্রণ
ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর পুনের একটি আইটি ফার্মে কাজ করেন বাসিত বান্দায় (ছদ্মনাম)। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের সংবেদনশীল স্বাস্থ্যসেবা–সংক্রান্ত তথ্য দেখাশোনা করেন। সেগুলো যেন ফাঁস না হয় বা সাইবার আক্রমণের শিকার না হয়, সেটা নিশ্চিত করা তাঁর দায়িত্ব।
২৭ বছর বয়সী এই কাশ্মীরি তরুণ গত বছরের শেষ পর্যন্ত ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে তাঁর কাজ করতে পারতেন। ভিপিএন ব্যবহারকারীকে তাঁর ইন্টারনেট প্রটোকল (আইপি) অ্যাড্রেস লুকিয়ে রাখতে সাহায্য করে এবং ইন্টারনেট ট্রাফিককে রিমোট সার্ভারের মাধ্যমে পরিচালিত করে। ফলে টেলিফোন ডেটা বা ইন্টারনেট পরিষেবা দাতারা (আইএসপি) সেটা শনাক্ত করতে পারে না।
তবে গত ২৯ ডিসেম্বর পরিস্থিতি বদলে যায়। মোদি সরকার ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে দুই মাসের জন্য ভিপিএন ব্যবহারের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কারণ হিসেবে ‘জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি’ এবং ‘অশান্তি উসকে দিতে’ এই পরিষেবার অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়।
সরকার দাবি করেছে, কাশ্মীরে ‘বেআইনি ও দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে’ ভিপিএন ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে উসকানিমূলক ও ভুল তথ্য প্রচার এবং জনশৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য কাজ অন্তর্ভুক্ত।
কাশ্মীরের প্রতিটি জেলার প্রধান প্রশাসকের জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, ‘লক্ষ করা গেছে যে ভিপিএন এনক্রিপ্ট করা তথ্য আদান-প্রদান করতে সাহায্য করে, আইপি অ্যাড্রেস গোপন রাখে, ফায়ারওয়াল ও ওয়েবসাইটের বিধিনিষেধ এড়িয়ে চলে এবং সংবেদনশীল তথ্যকে সাইবার হুমকির মুখে ফেলতে পারে।’
বাসিত এখন আশঙ্কা করছেন, তিনি চাকরি হারাবেন অথবা নিজের বাড়ি পুলওয়ামা জেলা থেকে দুই হাজার কিলোমিটার দূরে পুনেতে গিয়ে থাকতে বাধ্য হবেন। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, দুর্ভাগ্যবশত, সাম্প্রতিক সরকারি আদেশটি এমন পেশাদারদের কথা বিবেচনা না করেই দেওয়া হয়েছে, যাঁদের জীবিকা ও দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ ভিপিএন সংযোগের ওপর নির্ভরশীল।
বাসিত আরও যোগ করেন, যেকোনো আইটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিপিএন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বাধ্যতামূলক। এমনকি অফিসের ই–মেলের মতো অ্যাপগুলোও ভিপিএন ছাড়া ব্যবহার করা যায় না। এটি বাইরের জগতের কাছে তথ্য উন্মুক্ত না করে শুধু অনুমোদিত সিস্টেম ব্যবহার করার সুযোগ দেয়।
সরকারি আদেশের পর নিরাপত্তা কড়াকড়ি শুরু হওয়ায় বাসিতের ভয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের শেয়ার করা ভিডিওতে দেখা গেছে, দাঙ্গা দমনের পোশাকে পুলিশ সদস্যরা পথচারী বা গাড়িচালককে থামিয়ে তাঁদের মুঠোফোন চাইছেন। ফোন লক করা থাকলে তাঁদের তা আনলক করতে বলা হচ্ছে এবং পুলিশ কর্মকর্তারা ফোনের ভেতর সব পরীক্ষা করে দেখছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ২৯ ডিসেম্বর থেকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় তারা এ অঞ্চলে ১০০-এর বেশি মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ‘লঙ্ঘনকারীদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। যাঁদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, তাঁদের পরিচয় ও অতীত ইতিহাস যাচাই করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের এ জন্য তল্লাশি করা হচ্ছে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাঁদের কোনো ‘সন্ত্রাসীর’ (কাশ্মীরি বিদ্রোহীদের সে দেশের সরকার সন্ত্রাসী বলে ডাকে) সঙ্গে যোগাযোগ নেই।
২ জানুয়ারি পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সঠিক ব্যবহারকারীদের ডিভাইস বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ভিপিএন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।’
ভারতের ৮০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ ভিপিএন ব্যবহার করেন। আমস্টারডামভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ‘সার্ফশার্ক’-এর মতে, ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ভিপিএন ব্যবহারকারী রয়েছেন। এর বাজারমূল্য ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।
ঘন ঘন ইন্টারনেট–বিভ্রাট
ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ কোনো নতুন বিষয় নয়। ২০১২ সাল থেকে ভারত সরকার সারা দেশে ৯০১ বার ইন্টারনেট বন্ধ করেছে, যার মধ্যে কাশ্মীরেই প্রায় ৫০ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে। তবে গত কয়েক বছরে এই ব্ল্যাকআউটের তীব্রতা কিছুটা কমেছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর হিমালয় অঞ্চলের কাশ্মীর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। পারমাণবিক শক্তিধর এই দুই প্রতিবেশী দেশই পুরো কাশ্মীর নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। এ ভূখণ্ড নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। কাশ্মীরের ছোট একটি অংশ চীনের নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে।
১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে নয়াদিল্লির শাসনের বিরুদ্ধে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়, যার লক্ষ্য ছিল কাশ্মীরের স্বাধীনতা অথবা পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হওয়া। এর প্রতিক্রিয়ায় ভারত সেখানে প্রায় ১০ লাখ সৈন্য মোতায়েন করে। ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের জন্য সেনাদের বিশেষ ক্ষমতা দেয় দিল্লি সরকার। এ পর্যন্ত সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক।
২০১৯ সালে বিজেপিদলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার মাধ্যমে কাশ্মীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে। এই আইনের মাধ্যমে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা হয়, যে আইনের বলে বাইরের লোকদের সেখানে সরকারি চাকরি বা জমি কেনার অনুমতি ছিল না। মোদি সরকার এই আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটিকে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ—এই দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত করে সরাসরি দিল্লির শাসনের অধীন নিয়ে আসে।
কাশ্মীরিদের মতে, এই অস্থির অঞ্চলে নাগরিক স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধের তালিকায় ভিপিএন নিষেধাজ্ঞা হচ্ছে নতুন এক সংযোজন।
৩২ বছর বয়সী এক কাশ্মীরি সাংবাদিক আল-জাজিরাকে বলেন, তিনি কাজের জন্য প্রায়ই ভিপিএন ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন তিনি এটি করতে ভয় পাচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সাংবাদিক বলেন, ‘সংঘাতময় অঞ্চলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য ভিপিএন ব্যবহার করা সাধারণ বিষয়, বিশেষ করে যখন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। এখন সেই সুরক্ষার স্তরটি চলে গেল।’
শ্রীনগরের ২৪ বছর বয়সী ব্যবসায়ী মীর উমাইর বলেন, ভিপিএন নিষিদ্ধ হওয়ায় তিনি ‘বাইয়্যিনাহ টিভি’ দেখতে পারছেন না। এটি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত একজন ইসলামি বক্তার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। উমাইর বলেন, ‘তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক কিছু নেই, শুধু ধর্ম নিয়ে কথা বলেন। গত বছর ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার সময় তাঁর চ্যানেলটি নিষিদ্ধ করা হয়। আমি ভিপিএন দিয়ে এটি দেখতাম।’
আহমদ নামের স্থানীয় এক আইনজীবী (ভয়ে পুরো নাম বলতে চাননি) আল-জাজিরাকে বলেন, এই ভিপিএন নিষেধাজ্ঞা বেআইনি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘এই আদেশের বৈধতা সন্দেহজনক। কারণ, এটি ভারতের আইটি নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। ওই নীতিমালায় ঢালাওভাবে ভিপিএন নিষিদ্ধ করার কথা বলা নেই।’
‘অসাংবিধানিক নজরদারি ব্যবস্থা’
গত সপ্তাহে জেনেভাভিত্তিক প্রোটন-ভিপিএন কোম্পানির প্রধান ডেভিড পিটারসন ভারতের ব্যবহারকারীদের তোপের মুখে পড়েন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ভিপিএন ব্যবহারের একটি বিশেষ ফিচারের কথা লিখেছিলেন, যা সরকারি নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সাহায্য করে।
পিটারসন লিখেছিলেন, ঐতিহাসিকভাবে জম্মু ও কাশ্মীরে এ সময়ে ২৬ জানুয়ারি (প্রজাতন্ত্র দিবস) এবং গাওকাদাল ও হান্দোয়ারা হত্যাকাণ্ডের বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ দমনের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়।
যখন একজন ভারতীয় ব্যবহারকারী পিটারসনকে কাশ্মীরে ‘সন্ত্রাসবাদ’ উসকে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন, তখন তিনি উদাহরণ হিসেবে ইরান, চীন, রাশিয়া ও মিয়ানমারের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার সময় সাংবাদিকেরা ছদ্মবেশী অ্যাপ ব্যবহার করেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে গণমাধ্যম পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ (আরএসএফ) ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরকে ‘তথ্যের কৃষ্ণগহ্বর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখান থেকে নির্ভরযোগ্য সংবাদ খুব কমই বেরিয়ে আসে।
ডিজিটাল অধিকারকর্মী ও গবেষক শ্রীনিবাস কোডালি আল-জাজিরাকে বলেন, ফোনে শুধু ভিপিএন থাকা কোনো অপরাধ নয়। তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন পেশার মানুষ বৈধ কারণে ভিপিএন ব্যবহার করেন। এই ঢালাও নিষেধাজ্ঞা অপ্রয়োজনীয়। মানুষকে থামিয়ে জোর করে ফোন আনলক করা মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। কাশ্মীরের ক্ষেত্রে আমরা বারবার দেখছি, রাষ্ট্র অসাংবিধানিক নজরদারি চালাচ্ছে।’
ফুরকান (ছদ্মনাম) নামের আরেকজন সাংবাদিক বেঙ্গালুরুভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হয়ে রিমোটলি (দূর থেকে) কাজ করেন। তিনি বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার ভিডিও এডিট করেন এবং তাঁর কাজের জন্য ইন্টারনেটে অনেক তথ্যের প্রয়োজন হয়।
ফুরকান বলেন, ইন্টারনেটে তথ্য নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। বিশেষ করে সমালোচকদের এক্স অ্যাকাউন্ট যেভাবে বন্ধ করা হয়, তা দেখলেই বোঝা যায়। কে কী লিখছেন, তা জানতে একজন সাংবাদিককে ভিপিএন ব্যবহার করতেই হয়।
ফুরকান জোর দিয়ে বলেন, একজন সাংবাদিক হিসেবে বিশেষ করে সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে কাজ করার সময় গোপনীয়তা বজায় রাখার অধিকার তাঁর আছে।
কাশ্মীরি এই সাংবাদিক বলেন, ‘এখন এই নিষেধাজ্ঞা আমাদের চিন্তার ওপর তলোয়ারের মতো ঝুলে থাকবে। কখনো কখনো আমাকে কোম্পানির ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করতে হয়, যা ভিপিএন ছাড়া নিরাপদ নয়। কিন্তু আমাদের মতো অভিশপ্ত অঞ্চলে এখন এই সাধারণ কাজকেও অপরাধ হিসেবে দেখা হবে।’
ফুরকান বলেন, ‘এই ভিপিএন নিষেধাজ্ঞা কাশ্মীরিদের ওপর “মানসিক চাপ” বাড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমাদের চিন্তার জন্য আমাদের বিচার করা হচ্ছে। একজন কাশ্মীরি ভিপিএন ব্যবহারের মতো সাধারণ কাজ করতে গিয়েও অনেক বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন।’