আইন নয়, গরু জবাইয়ের ‘অপরাধের’ রায় দিতে গিয়ে বিতর্কিত মনুস্মৃতির উল্লেখ করলেন বিচারক

আদালতপ্রতীকী ছবি

অপরাধ ‘গরু হত্যা’। সেই অপরাধের সাজা শোনাতে গিয়ে হিন্দু ধর্ম ও গরুর ধর্মীয় তাৎপর্য তুলে ধরতে হিন্দু ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদির রাজ্য ভারতের গুজরাটের এক বিচারক। অপরাধীদের যাবজ্জীবনের সাজা শুনিয়ে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ‘মনুস্মৃতি’–এর উদ্ধৃতি দিয়ে বিচারক বলেছেন, গরু শুধু এক প্রাণী নয়, তা জাগতিক সমৃদ্ধি ও ধার্মিকতার স্তম্ভ। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে ‘গো–মাতাকে’ রক্ষা করা হিন্দু ধর্মের পবিত্র কর্তব্য মনে করা হয়েছে।

গুজরাটের গান্ধীনগর জেলার কালোল দায়রা আদালতের অতিরিক্ত সেশন জজ ব্রিজেশকুমারী রামেশ্বর সিং রাজপুত তিনজনের যাবজ্জীবন সাজার রায় দিতে গিয়ে বলেন, হিন্দু শাস্ত্র ও বেদের মতে গরু বিশ্বমাতা। গরুর শরীর হিন্দু ধর্মের ৩৩ কোটি দেব–দেবীর আবাসস্থল। তার চারটি পা চার বেদের প্রতীক।

রায় দেওয়ার সময় বেদ, মনুস্মৃতি ও অন্যান্য হিন্দু শাস্ত্রের উল্লেখ করে বিচারক বলেন, তপস্যার শক্তিতে যখন অমৃতের ফোঁটা পৃথিবীতে পড়েছিল, দেব গাভি কামধেনু তখন আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনিই পৃথিবীর সব গো–প্রজাতির আদি উৎস।

গুজরাটের উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভি এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এই রায় রাজ্যের কোণে কোণে এই বার্তাই ছড়িয়ে দেবে যে, ‘গরু হত্যা’ যাঁরা করেন, তাঁরা ছাড় পাবেন না। আইন তাঁদের উপযুক্ত সাজা দেবে।

আদালত যে তিনজনকে সাজা দিয়েছেন তাঁদের সবাই মুসলিম। ওয়াসিম কুরেশি, মোহাম্মদ রফিক কুরেশি ও আশফাক ওরফে সালমানদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগের পাশাপাশি ৩ লাখ রুপি জরিমানাও দিতে হবে।

অভিযোগ, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট গান্ধীনগর জেলার জামলা গ্রামের এক বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালায়। সেখান থেকে ২৭৭ কিলোগ্রাম গরুর মাংস উদ্ধার করা হয়। গরুর মাংসের পাশাপাশি সেখান থেকে গরু জবাইয়ের ছুরি ও মাংস পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত একটি গাড়িসহ মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, রুগ্‌ণ ও দুধ দেওয়া বন্ধ করা গরু কিনে জবাই করে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মাংস সরবরাহ করতেন। ৫৪ জন সাক্ষী ও ১৮টি নথির প্রমাণ সাপেক্ষে বিচারক তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সাজার রায় দেন।

মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে নরেন্দ্র মোদি ২০১১ সালে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে গুজরাটে গরু জবাই, গরুর মাংস পরিবহন ও কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। ১৯৫৪ সালের গুজরাট প্রাণী সংরক্ষণ আইন ২০১৭ সালে সংশোধন করে গরু জবাইয়ের দায়ে দোষী ব্যক্তির সাজা বাড়িয়ে যাবজ্জীবন করা হয়।

সংশোধিত আইনে বলা হয়, গরুর মাংস পরিবহন, সংরক্ষণ বা বিক্রি ধরা পড়লে ১০ বছরের সাজা ভোগ করতে হবে। গুজরাটই দেশের প্রথম রাজ্য, যেখানে ‘গরু হত্যার’ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান চালু হয়।

ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে গরু জবাই সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিষিদ্ধ। তবে গুজরাটই একমাত্র রাজ্য, যেখানে গরু জবাইয়ের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। অন্যত্র এই অপরাধের সাজা ৩ থেকে ১০ বছরের কারাবাস ও জরিমানা।

বিচারক বি আর রাজপুত তাঁর রায়ে বলেন, গরু শুধু এক পশু নয়। মনুস্মৃতি অনুযায়ী গরু হিন্দু ধর্মের স্তম্ভ। তিনি বলেন, ঋগ্বেদে গরুকে ‘অ–ধন্য’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ অ–বধ্য। যাকে ‘হত্যা’ করা যায় না। তিনি বলেন, এমন অপরাধীদের যদি আইন অনুযায়ী শাস্তি না হয়, তাহলে ‘গো–মাতা’ পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হবেন। তাঁর রায়ের প্রথম কয়েক পৃষ্ঠাজুড়ে রয়েছে শুধু হিন্দু ধর্মে গরুর তাৎপর্যের ব্যাখ্যা।

রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে হিন্দু ধর্মের ব্যাখ্যা কতটা যুক্তিযুক্ত, সেই প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, ভারতীয় সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ। আদালতের কাজ আইন অনুযায়ী বিচার করা, আইনের প্রয়োগ করা। ধর্মীয় ব্যাখা ও প্রবচন দেওয়া বিচারকের কাজ নয়।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী কিছুদিন আগেই মনুস্মৃতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। ভারতীয় নারীদের মনুস্মৃতি উপেক্ষা করে বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছিলেন, মনুস্মৃতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কথা বলেছে, যে ব্যবস্থায় নারীদের দমিত রাখা হয়।

রাহুল বলেছিলেন, সেই ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করা উচিত। নারীদের উচিত পুরুষতান্ত্রিকতার শৃঙ্খল মোচন করে বেরিয়ে আসা। যে মনুস্মৃতিকে রাহুলসহ কংগ্রেস নেতারা সামাজিক বৈষম্যের আধার বলে অভিহিত করেছেন, বিচারকের রায়ে সেই গ্রন্থের মাহাত্ম্য বর্ণনা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনাও শুরু হয়েছে।

উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা উল্লসিত। গুজরাটের উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভিবিরোধী সমালোচনাকে আমল না দিয়ে বলেছেন, ‘গো–মাতার’ রক্ষা প্রতিটি হিন্দুর ইতিকর্তব্য হওয়া উচিত। ‘গো–মাতার’ পালন ও তাকে রক্ষা করা গুজরাট সরকারের অবিচল অঙ্গীকার। এই মামলায় সঠিক তথ্য প্রমাণ ও উপযুক্ত তদন্ত করায় তিনি গান্ধীনগর পুলিশ ও সরকারি আইনজীবীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।