ত্রিপুরা পার্বত্য পরিষদের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় আদিবাসী দল টিপরা মোথার
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে বাঙালি অধ্যুষিত ত্রিপুরার পার্বত্য অঞ্চলের দল টিপরা মোথা স্বশাসিত পার্বত্য পরিষদের নির্বাচনে রাজ্যে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) পরাস্ত করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
ত্রিপুরা উপজাতি এলাকার স্বশাসিত জেলা পরিষদের (এডিসি) এই নির্বাচনকে ত্রিপুরার আদিবাসী অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচন বলা যেতে পারে। টিপরা মোথা ওই অঞ্চলের রাজপরিবারের বংশধর প্রদ্যোত দেববর্মার দল। ১২ এপ্রিল এডিসি অঞ্চলে এই নির্বাচন হয়েছিল।
শুক্রবার নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়েছে। রাজ্য নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সন্ধ্যা পর্যন্ত এডিসির ২৮ আসনের মধ্যে অন্তত ২০ আসন পেয়েছে প্রদ্যোত দেববর্মার নেতৃত্বাধীন টিপরা মোথা পার্টি।
ছয় বছর আগে ২০২০ সালে সাবেক রাজপরিবারের বংশধর প্রদ্যোত দেববর্মা ‘বৃহত্তর টিপরাল্যান্ড’-এর দাবিতে টিপরা মোথা গঠন করেছিলেন। এটি তাঁদের টানা দ্বিতীয় জয়, যা রাজ্যের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে দলটির আধিপত্যকে আরও একবার প্রমাণ করল।
রাজ্য নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা বিপুল বর্মণ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘোষিত ২৩টি আসনের (মোট ২৮ আসনের মধ্যে) মধ্যে টিপরা মোথা ২০টি এবং বিজেপি তিনটি আসন পেয়েছে। বাকি পাঁচটি আসনে ভোট গণনা চলছে।
অন্যদিকে, সিপিআই (এম) ও কংগ্রেস টানা দ্বিতীয়বারের মতো উপজাতি পরিষদে একটি আসনও পায়নি। এই কাউন্সিলটি রাজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ ভৌগোলিক এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশ লাগোয়া এই অঞ্চলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বসবাস, যাদের বড় অংশই তফসিলি উপজাতিভুক্ত।
প্রতিক্রিয়া ও নির্বাচনী পরিসংখ্যান
এই জয়ের পর প্রদ্যোত দেববর্মা সামাজিক মাধ্যমে বলেন, এই জয় ‘ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসার জয়’। তিনি বলেন, ‘আমি বিজয়ীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন দফা (সম্প্রদায়), রাজ্য এবং দেশের জন্য কাজ করেন। সাধারণ মানুষই অসাধারণ কাজ করে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের স্বার্থে আমি সবার কাছে আবেদন করছি যেন এই ছোট রাজ্যে কোনো হিংসা না হয়।’
বিজেপি ও টিপরা মোথা রাজ্য বিধানসভায় জোটসঙ্গী হলেও এই নির্বাচনে দল দুটি পৃথকভাবে লড়েছিল। টিপরা মোথার সঙ্গে বিজেপির লড়াই ছিল সরাসরি। কংগ্রেস বা সিপিআইএম তৃতীয় জোট হিসেবে ছিল একেবারেই কোণঠাসা। দুই পক্ষের লড়াইয়ে তারা কোনো আসনই পায়নি।
শুক্রবার পরাজয় স্বীকার করে বিজেপি নেতা ও মন্ত্রী রতনলাল নাথ বলেন, ‘ভোটাররা যদি আবেগের বশবর্তী হয়ে ভোট দেন, তবে জয়ের সুযোগ কম থাকে। মানুষ উন্নয়নের জন্য ভোট দিলে বিজেপিই হয়তো তাদের পছন্দের দল হতো।’ এডিসি নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৮৩ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা ২০২১ সালের (৮১ শতাংশ) তুলনায় অনেকটাই বেশি।
২০২১ সালে এডিসি নির্বাচনে টিপরা মোথা ১৮টি এবং বিজেপি ৯টি আসন পেয়েছিল। এবার টিপরা মোথার আসন যেমন বেশ কয়েকটি বেড়ে গেল, তেমনিই পার্বত্য আদিবাসী অঞ্চলে বিজেপির আসন ভালো রকম কমল।
বিজেপি এবং টিপরা মোথার বিরোধ
টিপরা মোথার সঙ্গে ভারতের কেন্দ্র সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহার নেতৃত্বাধীন ত্রিপুরার বিজেপি সরকারের একটি চুক্তি হয়েছিল ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। এটিকে ‘টিপ্রাসা চুক্তি’ বলা হয়। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল, ত্রিপুরার মূল নিবাসী উপজাতি মানুষের পরিচয় রক্ষা করার পাশাপাশি ভাষা, ভূমি এবং রাজনৈতিক অধিকারসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা। এই চুক্তিতে তিন পক্ষ আদিবাসী সম্প্রদায়ের পরিচয় এবং উন্নয়নসংক্রান্ত সমস্যাগুলোর একটি স্থায়ী ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে একমত হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৫ সালের মাঝামাঝি টিপরা মোথার প্রধান প্রদ্যোত দেববর্মা জানান, এই চুক্তি বাস্তবায়িত করতে কোনো উৎসাহ রাজ্যের বিজেপি সরকার এক বছরের বেশি সময় দেখায়নি। ফলে এডিসি নির্বাচন তারা বিজেপির থেকে পৃথকভাবে লড়বেন বলে সেই সময় তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। যদিও ২০২২ সালের নির্বাচনের কিছুদিন পরে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন রাজ্য বিধানসভার মন্ত্রিসভায় যোগ দেয় প্রদ্যোত দেববর্মার দল। রাজ্য বিধানসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব এখনো রয়েছে। কিন্তু এডিসি নির্বাচন তারা পৃথকভাবে লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
গত বছরের মাঝামাঝি টিপরা মোথা পার্টির এক এমএলএ এবং মুখপাত্র রণজিৎ দেববর্মা বলেন, গত বছরের (২০২৪) মার্চ মাসে টিপরা মোথা পার্টি, রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রের মধ্যে ত্রিপুরার আদিবাসী সম্প্রদায়ের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে রাজ্য সরকার গড়িমসি করার কারণে আমরা উদ্বিগ্ন। টিপরা মোথা পার্টি আসামের বোড়ো সম্প্রদায়ের দল ‘ইউনাইটেড পিপলস পার্টি লিবারেল’-এর মতো পরিস্থিতির শিকার হতে চায় না। ইউনাইটেড পিপলস পার্টি বিজেপির সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল নির্বাচনে হেরে গেছে, কারণ বিজেপি তাদের প্রতিশ্রুতিমতো সুযোগ-সুবিধা বোড়োল্যান্ড কাউন্সিলকে দেয়নি।
অন্যদিকে, বিজেপির ঘনিষ্ঠ ত্রিপুরার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বক্তব্য, ‘টিপ্রাসা চুক্তি’ কোনো অবস্থাতেই রাজ্য বা কেন্দ্রের বিজেপি সরকার মানতে পারবে না। বিজেপি ঘনিষ্ঠ ত্রিপুরার এক অধ্যাপক এই প্রসঙ্গে অতীতে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, এই চুক্তি করা হলে তা বৃহত্তর ত্রিপুরার আন্দোলনের দিকে যাবে।
‘সেই আন্দোলন উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এর জেরে অন্য সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর সঙ্গে আদিবাসীদের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। আর ত্রিপুরার ভেতরে বাঙালিরাও এই চুক্তি বাস্তবায়নের বিরোধিতা করেন। কারণ, তাঁরা মনে করেন, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে রাজ্যে বাঙালিদের কাজের ক্ষেত্র ও ক্ষমতা সীমিত হবে। বিজেপি এই চুক্তি বাস্তবায়িত করলে নিশ্চিতভাবেই তারা রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি ভোট হারাবে,’ বলেন ওই অধ্যাপক।
এই কারণেই এবার পৃথকভাবে নির্বাচনে লড়ল এবং জিতল প্রদ্যোত দেববর্মার দল টিপরা মোথা।