প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ২৫০ কোটি রুপি, দুর্নীতির পরও হ্যাটট্রিকের আশা মোদির

ক্ষমতার দশম বছরে বক্তব্য দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
ছবি: বিজেপির টুইটার থেকে

জয়ের হ্যাটট্রিক করবেন এবং আগামী বছর স্বাধীনতা দিবসে আরও একবার লাল কেল্লা থেকে জাতীয় পতাকা তুলবেন বলে জানিয়ে দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু সেই বজ্রনির্ঘোষ ম্লান ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রইল তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের দৃষ্টান্ত জনসমক্ষে চলে আসায়।

ক্ষমতার দশম বছরে নরেন্দ্র মোদির সরকারকে এই প্রথম এত গুরুতর আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে দেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)। তাদের পেশ করা মোট আটটি রিপোর্ট ভারতীয় রাজনীতিকে সরগরম করে তুলেছে।

মনমোহন সিংয়ের রাজত্বকালে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগেও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল সরকারের দুর্নীতি। টু-জি স্পেকট্রাম বিলি, কয়লাখনির ব্লক বণ্টন এবং কমনওয়েলথ গেমস ঘিরে সিএজির তোলা দুর্নীতির অভিযোগের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছিল কংগ্রেস সরকার। ১০ বছর পর ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে মোদি সরকারকেও সেই সিএজির প্রতিবেদন মোকাবিলা করতে হবে কি না, এই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

যদিও লাল কেল্লা থেকে দেওয়া ভাষণে আজ মঙ্গলবার সকালে মোদি বলেন, ‘মনে হচ্ছে যেসব প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন আমার হাত দিয়ে হয়েছে, সেসবের উদ্বোধনও আমিই করব।’ জনগণের আশীর্বাদ সঙ্গে থাকলে তাঁরাই যে আবার ক্ষমতাসীন হবেন, সে কথাও তিনি জানিয়েছেন।

মণিপুর নিয়ে ‘মৌন মোদির’ মুখ খোলানোর দাবিতে সংসদ যখন অচল, সেই সময় সিএজি একের পর এক প্রতিবেদন সংসদে পেশ করেছে। মোট জমা পড়া আটটি প্রতিবেদনের মধ্যে চারটির কেন্দ্রে রয়েছে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন বিজেপির সাবেক সভাপতি নিতিন গড়কড়ি। গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর সাধের ‘আয়ুষ্মান ভারত: প্রধানমন্ত্রী জনআরোগ্য যোজনা’ প্রকল্পের বিরুদ্ধেও। গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের পেনশন প্রকল্প ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেডও (হ্যাল) অভিযোগের আওতায় চলে এসেছে। ফলে বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই।

সিএজি রিপোর্টে দুর্নীতি ও অনিয়মের সবচেয়ে বড় অভিযোগ ‘ভারতমাতা প্রকল্প’ ও ‘দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে’ নির্মাণ ঘিরে। ভারতমাতা প্রকল্প হলো দেশের বিভিন্ন জেলা সদরকে জাতীয় সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করা, যাতে গতি বাড়ে। সারা দেশে এ জন্য মোট ৩৪ হাজার কিলোমিটার ৪ লেনের সড়ক তৈরি করার কথা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এ জন্য বরাদ্দ করেছিল মোট ৫ লাখ ৩৫ হাজার কোটি রুপি। কিন্তু অডিটে দেখা গেছে, বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মোট ২৬ হাজার কিলোমিটার রাস্তা তৈরির এবং সে জন্য খরচ করা হচ্ছে ৮ লাখ ৪৬ হাজার কোটি রুপি। সিএজির প্রশ্ন, ৮ হাজার কিলোমিটার কম রাস্তা তৈরি হচ্ছে অথচ খরচ করা হচ্ছে ৩ লাখ ১১ হাজার কোটি রুপি বেশি! কেন? এর সদুত্তর সরকার এখনো দেয়নি। সিএজি রিপোর্ট দেখাচ্ছে, বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও অনিয়ম হয়েছে।

দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ের দুর্নীতির অভিযোগ আরও মারাত্মক। দিল্লির দ্বারকা এলাকা থেকে হরিয়ানার গুরুগ্রামের খেড়কি দৌলা টোল প্লাজা পর্যন্ত ২৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার রাস্তা তৈরির জন্য খরচ ধার্য হয়েছিল প্রতি কিলোমিটার ১৮ কোটি রুপি। অনুমোদিত এই খরচ উপেক্ষা করে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাতে প্রতি কিলোমিটার রাস্তা তৈরিতে খরচ পড়ছে ২৫০ কোটি রুপি!

প্রধানমন্ত্রীর সাধের চিকিৎসাবিমা প্রকল্প ‘আয়ুষ্মান ভারত: প্রধানমন্ত্রী জনআরোগ্য যোজনা’। সিএজি রিপোর্ট অনুযায়ী ওই প্রকল্পে একটি মুঠোফোন নম্বরে সাড়ে সাত লাখ মানুষের নাম পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, মৃত মানুষের নামেও স্বাস্থ্যবিমায় চিকিৎসার টাকা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া দেখা গেছে, জাতীয় সড়কে নিয়ম না মেনে যাত্রীদের কাছ থেকে ১৫৪ কোটি রুপি টোল আদায় করা হয়েছে। অযোধ্যা উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারদের ২০ কোটি রুপির সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের পেনশন প্রকল্পের ২ কোটি ৮৩ লাখ রুপি অন্য প্রকল্পের প্রচারে খরচ করা হয়েছে। ‘হ্যাল’–এ যুদ্ধ বিমানের ইঞ্জিন নকশা ও উৎপাদন অব্যবস্থার জন্য ১৫৯ কোটি রুপি লোকসান হয়েছে।

তীব্র সমালোচনার মুখে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে একটা সাফাই গত সোমবার দিয়েছে। তারা বলেছে, বাড়তি খরচ হয়েছে উড়ালপথ তৈরির জন্য। সেই কারণেই প্রতি কিলোমিটার রাস্তার খরচ ১৮ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ২০৬ কোটি। ২৫০ কোটি নয়। প্রকল্পটি বিশেষ ধরনের। তাই খরচও বেশি হচ্ছে।

বিরোধীরা অবশ্য কোনো সাফাই মানতে নারাজ। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, বিজেপির দুর্নীতি ও লুট দেশকে নরকের পথে ঠেলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে এই সব প্রকল্পের অগ্রগতি নিরীক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন আর্থিক বিষয়ক কমিটিই ভারত মালা প্রকল্পের যাবতীয় অর্থ বরাদ্দ করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের দায় তাঁরই। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেছেন, গত ৭৫ বছরে এমন দুর্নীতি হয়নি। কংগ্রেস মুখপাত্র জয়রাম রমেশ বলেছেন, সিএজির রিপোর্টের পর এবার জবাবদিহি করতে হবে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই।

সিএজি পদে ২০২০ সালের ৮ আগস্ট থেকে বহাল রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত স্নেহভাজন ও বিশ্বস্ত গুজরাট ক্যাডারের আমলা গিরিশ চন্দ্র মুর্মু। দেশের প্রধান হিসাবরক্ষক হওয়ার আগে মোদি সরকার তাঁকে জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম উপরাজ্যপাল পদে নিয়োগ করেছিলেন। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল ও রাজ্যভাগের পর প্রথম ধাক্কাটা তিনিই সামলেছিলেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে মুর্মু বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদি তাঁকে দিল্লি নিয়ে আসেন।

সিএজি ভারতের সংবিধান স্বীকৃত বিধিবদ্ধ সংস্থা। সেই সংস্থার প্রতিবেদন কোনো সরকারই ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ কিংবা ‘বিরোধী চক্রান্ত’ বলে উড়িয়ে দিতে পারে না। ক্ষমতার দশম বছরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তাই এর মোকাবিলা করতেই হবে। নির্বাচনের আগে কীভাবে সরকার তা করে, সেটা আগ্রহ সৃষ্টি করেছে।

২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে কংগ্রেস রাফাল যুদ্ধবিমান চুক্তি নিয়ে দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ এনেছিল। রাহুল গান্ধী স্লোগান তুলেছিলেন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’। অভিযোগ ছিল, কংগ্রেস আমলের চুক্তি ভেঙে প্রধানমন্ত্রী মোদি নতুন যে চুক্তিতে ফ্রান্স থেকে রাফাল কিনছেন, তাতে বিমানপ্রতি বাড়তি খরচ পড়ছে। বেশি টাকায় কম রাফাল কেনা হচ্ছে। এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছিল। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থ দেখিয়ে সরকার যাবতীয় তথ্য সিল করা খামে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের কাছে জমা দিয়েছিল। সেই তথ্য দেখে ‘সন্তুষ্ট’ প্রধান বিচারপতি জানিয়েছিলেন, চুক্তিতে কোনো অনিয়ম নেই। অবসর গ্রহণের পর রঞ্জন গগৈ রাজ্যসভায় রাষ্ট্রপতির মনোনীত সদস্য হন।