কথিত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কুমির-সাপ ছাড়ার চিন্তা অমিত শাহর

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তফাইল ছবি

কাঁটাতারের বেড়া, ড্রোন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম মারফত নজরদারির পাশাপাশি ‘অনুপ্রবেশ’ রুখতে এবার সীমান্তবর্তী নদী ও জলাভূমিতে কুমির ও সাপ ছাড়ার ভাবনা এসেছে ভারত সরকারের মাথায়।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কর্তাদের বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নদী ও জলাভূমি অঞ্চলে যেখানে বেড়া দেওয়া যায়নি এবং যেসব এলাকায় অষ্টপ্রহর পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে কুমির ও সাপের মতো সরীসৃপ ছাড়া যায় কি না। মনে করা হচ্ছে, কুমির ও সাপের ভয়ে অনুপ্রবেশকারীরা সীমান্ত পারাপার করতে দশবার ভাববেন। সাপ ও কুমিরের ভয়ে অনুপ্রবেশ কমবে।

বিএসএফ সূত্রের মতে, শুধু অনুপ্রবেশই নয়, এই ব্যবস্থায় ওই সব এলাকা দিয়ে চোরাচালানও বন্ধ হতে পারে। কমতে পারে অপরাধমূলক অন্যান্য কাজও। বিষয়টি এখনো চিন্তাভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। কোনো রকম সরকারি আদেশ জারি করা হয়নি।

বিএসএফ সূত্রের বরাতে এই খবর ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেরিয়েছে। দ্য হিন্দু লিখেছে, ভাবনাটি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর মস্তিষ্কপ্রসূত। গত ২৬ মার্চ বিএসএফের সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে এক বার্তা পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, অমিত শাহর এই ভাবনা বাস্তবায়িত এবং কার্যকর সম্ভব কি না, তা যেন খতিয়ে দেখা হয়।

বলা হয়েছে, কোন কোন এলাকায় এটা করা সম্ভব, তা সরেজমিন দেখে চিহ্নিত করতেও বলা হয়েছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ
ফাইল ছবি: রয়টার্স

বিএসএফ সূত্রের খবর, বিষয়টি এখনো চিন্তাভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনাটি আদৌ বাস্তবায়ন করা সম্ভব কি না, তা দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তা রূপায়িত করা যাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিস্তৃতি ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এই সীমান্তের মধ্যে ১৭৫ কিলোমিটার অংশে নদী ও জলাভূমি রয়েছে। বিএসএফের দাবি, কড়া নজরদারি সত্ত্বেও ওই অঞ্চল দিয়ে অনুপ্রবেশ যেমন ঘটে, তেমনই চলে চোরাচালান।

এ ধরনের অবৈধ কাজকারবার ঠেকাতে তাই শীর্ষ মহলের ভাবনায় ঘোরাফেরা করছে সরীসৃপ ছাড়ার বিষয়টি। মনে করা হচ্ছে, বাঘের ভয়ে যেমন জঙ্গলে ঢোকা ঠেকানো যায়, তেমনই কুমির ও সাপের ভয়ে নদী ও জলাভূমি পারাপার কমানো যাবে।

বিএসএফের এক কর্তার বরাতে দ্য হিন্দু জানিয়েছে, এই ভাবনা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যেমন সরীসৃপ সংগ্রহ। কীভাবে কুমির ও সাপ সংগ্রহ করা হবে, সেটা যেমন বড় প্রশ্ন, তেমনই তার প্রভাব ওই সব অঞ্চলের মানুষের ওপর কতটা পড়বে, সেটাও বিবেচনার বিষয়।

কথিত বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশ’ ভারতের শাসক দল বিজেপির কাছে একটা বড় রাজনৈতিক হাতিয়ার। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রভাব বিস্তারে, বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা ধরে রাখা ও ক্ষমতা দখলের তাগিদে বিজেপি বারবার অনুপ্রবেশকে বড় সংকট হিসেবে তুলে ধরেছে। দুই রাজ্যেই এবারের ভোটে অনুপ্রবেশকারী বা ‘ঘুষপেটিয়া’ বড় ইস্যু।

শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা আসাম রাজ্য নয়—মেঘালয়, ত্রিপুরা, বিহার ও ঝাড়খন্ডেও বিজেপি ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের’ প্রসঙ্গ বড় করে তুলে ধরেছে। বিহার ও ঝাড়খন্ডের ভোটে তারা বলেছে, ঘুষপেটিয়ারা রাজ্যের অর্থনীতি চৌপাট করে দিচ্ছে। জনবিন্যাসে বদল ঘটিয়ে দিচ্ছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন দেশজুড়ে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের যে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, যার পোশাকি নাম ‘এসআইআর’, তার অন্যতম লক্ষ্যও ‘অনুপ্রবেশকারী’ চিহ্নিত করা। অথচ, বিহারে কত ‘ঘুষপেটিয়ার’ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, কত ‘রোহিঙ্গাকে’ চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই হিসাব নির্বাচন কমিশন আজও দেয়নি। পশ্চিমবঙ্গেও সেই খতিয়ান পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ।

কিন্তু তাতে কী। ‘অনুপ্রবেশ’ ঠেকাতে নিত্যনতুন উপায়ের মধ্যে অমিত শাহ নতুন ভাবনা আমদানি করেছেন। তাঁর কুমির ও সাপ ছাড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় কি না, সেটা যেমন এক আগ্রহ, তেমনই দেখার, তারপরও ‘অনুপ্রবেশ’ কমে কি না।