যদিও সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরমানি সর্বোচ্চ আদালতকে বলেন, কোনো বিশেষ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে না গিয়ে বেঞ্চের উচিত সার্বিক বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া। কমিশনের সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মানা হয়েছে কি না, কিংবা সাংবিধানিক রীতি লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা দেখা। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সুপারিশের ভিত্তিতে এই নিয়োগ দেন দেশের রাষ্ট্রপতি। সেখানে কোনো বিচ্যুতি হয়েছে কি না, সুপ্রিম কোর্টের বিচার্য হওয়া উচিত সেটিই।  

বিচারপতি কে এম জোসেফ, বিচারপতি অজয় রাস্তোগি, বিচারপতি অনিরুদ্ধ রায়, বিচারপতি হৃষিকেশ রায় ও বিচারপতি সি টি রবিকুমারকে নিয়ে গঠিত এই সাংবিধানিক বেঞ্চ শুনানি চলাকালে মন্তব্য করেন, যে প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনে নিযুক্তি হয়, তাতে দেশের প্রধান বিচারপতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে কিছুটা স্বচ্ছতা থাকবে। রক্ষাকবচও থাকবে। আর যা–ই হোক, ‘জি হুজুরদের’ নিযুক্তি বন্ধ হতে পারে। গত মঙ্গলবার অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে বিচারপতি কে এম জোসেফ এ কথাও বলেন, ‘পৃথিবীর বহু দেশের আদালতের উদাহরণ আমাদের কাছে রয়েছে। সে সবের মধ্যে না গিয়ে আমরা যদি প্রতিবেশীদের দিকে তাকাই, তা হলেও দেখব বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তানেও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কড়া রক্ষাকবচ রয়েছে।’

নির্বাচন কমিশনে নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে সাংবিধানিক বেঞ্চ যে ধরনের মন্তব্য করেছেন, সাম্প্রতিক কালে মোদি সরকারকে তা শুনতে হয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেলকে বেঞ্চের প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টক্কর দেওয়ার জোর কমিশনের কি আছে? এই সন্দেহের কারণেরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও কমিশনের সদস্যদের নিযুক্তির মেয়াদ ছয় বছর। তবে বয়স ৬৫ হয়ে গেলে অবসর বাধ্যতামূলক। দেখা যাচ্ছে, ২০০৬-০৭ সাল থেকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এই পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এক বছর, দেড় বছর, দুই বছরের বেশি কেউ এই পদে বহাল থাকেন না। এর ফলে নিরপেক্ষতা তো দূরের কথা, সদস্যরা কর্তৃত্বের সঙ্গে কাজই করতে পারেন না। সরকারের উদ্দেশে বেঞ্চ বলেন, ‘কর্তাদের জন্ম তারিখ সরকারের জানা। সেই মতো তারা বাছাই করছে। এই অঙ্কটুকু আমরাও কষতে জানি।’

শুনানি চলাকালে বিচারপতিরা প্রয়াত সাবেক মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সেশন ১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সময়ে তিনি নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃত নিরপেক্ষ করে তুলতে পেরেছিলেন। কমিশনের যাবতীয় সংস্কারপর্ব তাঁর আমলেই। সাংবিধানিক বেঞ্চ বলেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার অনেকেই হয়েছেন। কিন্তু টি এন সেশন একজনই হন।

সিইসির ক্ষমতা অপরিসীম। কিন্তু তা পালন করতে গেলে যোগ্য কমিশনার বাছাই করা জরুরি। সাংবিধানিক বেঞ্চের মন্তব্য, ‘যে দল বা যাঁরাই কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকেন, প্রত্যেকেই এই পদে ইয়েস ম্যান বা জি হুজুরদের নিয়োগ করতে চায়।’ এ কারণেই নিয়োগ পদ্ধতিতে দেশের প্রধান বিচারপতি অংশ নিতে পারেন কি না, বেঞ্চ তা বিচার করে দেখতে চাইছে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট, নির্বাচন কমিশন যে আদৌ নিরপেক্ষ নয় সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত।

এ প্রসঙ্গেই উঠে আসে কমিশনের সদস্য হিসেবে অরুণ গোয়েলের নিয়োগের বিষয়টি। কেন্দ্রীয় ভারী শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন তিনি। এ বছরের ৩১ ডিসেম্বর তাঁর অবসর গ্রহণ করার কথা ছিল। কিন্তু ১৮ নভেম্বর (শুক্রবার) তিনি স্বেচ্ছা অবসর নেন। সেই দিনই চারজনের নামের এক তালিকা থেকে আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজু অরুণকে বেছে নেন। ১৯ নভেম্বর মন্ত্রিসভার অনুমোদনসহ ফাইল চলে যায় রাষ্ট্রপতির কাছে। ফাইল সইও হয়ে যায়। ২১ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অরুণ গোয়েল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার কথা।

অরুণ গোয়েলের নিয়োগের ‘সুপার ফাস্ট’ গতি নিয়ে বৃহস্পতিবার প্রশ্ন তোলেন  সুপ্রিম কোর্ট। বেঞ্চ বলেন, ‘আমরা সংঘাত চাই না। শুধু জানতে চাই, এই অস্বাভাবিক দ্রুত সিদ্ধান্ত রূপায়ণের কারণ কী? ১৫ মে থেকে পদটি খালি। এ সময়ে সরকার কী করেছে? কীইবা হলো যে চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এত কিছু ঘটে গেল? এত কম সময়ের মধ্যে কী ধরনের মূল্যায়ন করা হয়েছে?’ বেঞ্চ বলেন, ‘যে চারজনের নাম এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাছাই করা হলো, তাঁরা সবাই যদি সরকারের ইয়েস ম্যান বা জি হুজুর হয়ে থাকেন, তা হলে কর্তা বাছাই ও নিয়োগপদ্ধতি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’
নির্বাচন কমিশন নিয়ে এই মামলার ইতি কীভাবে ঘটবে সেই জল্পনার মধে৵ সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিলেন, ভারতের নির্বাচন কমিশনের সদস্য মনোনয়ন ও নিয়োগ পদ্ধতি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। কমিশন আদৌ নিরপেক্ষও নয়।