যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কিনবে ভারত, একতরফা চুক্তি কেন বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বৈঠকের পর করমর্দন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ২৪ মে ২০২৬, নয়াদিল্লিছবি: রয়টার্স

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ভারত সফর শেষে মন্তব্য করেছিলেন, ‘নয়াদিল্লি আগামী পাঁচ বছরে জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং কৃষির ওপর জোর দিয়ে ৫০ হাজার কোটি ডলার’ মূল্যের আমেরিকান পণ্য কিনতে ‘প্রতিশ্রুতি’ দিয়েছে।

রুবিওর এই মন্তব্য কেবল নয়াদিল্লির রাজনৈতিক মহলেই নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যম এবং বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, ভারত কেন এমন একটি একতরফা চুক্তিতে রাজি হলো এবং এর বিনিময়ে ভারতের আসলে কতটা লাভ হবে।

‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই মুহূর্তে ভারত কেন এমন একটি প্রতিশ্রুতি দেবে, তা বেশ রহস্যজনক।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশ যখন এই চুক্তিতে পৌঁছেছিল, তার পর থেকে পরিস্থিতির মূল ভিত্তিগুলো অনেকটাই বদলে গেছে। এমন একটি চুক্তিতে সই করা ভারতের জন্য ‘বোকামি’ হবে, যা দেওয়ার চেয়ে কেড়ে নেয় অনেক বেশি।

কী পরিবর্তন এসেছে

এই ৫০ হাজার কোটি ডলারের অঙ্কটি প্রথম সামনে আসে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে, যখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি ঘোষণা করেছিল। সেই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করেন, যা ভারতে বেশ স্বস্তি এনে দিয়েছিল।

তবে হোয়াইট হাউস সে সময় জানিয়েছিল, শুল্ক কমানোর বিনিময়ে নয়াদিল্লি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, কয়লা এবং অন্যান্য পণ্যের বার্ষিক আমদানি দ্বিগুণের বেশি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের চুক্তির বিজ্ঞপ্তিতে এই পয়েন্টকে শেষের আগের পয়েন্ট হিসেবে প্রায় লুকিয়ে রেখেছিল। যুক্তরাষ্ট্র কেনার তালিকায় উড়োজাহাজ ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ যুক্ত করেছিল। যখন এই ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়, তখন বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেছিলেন, ভারতীয় অর্থনীতির দ্রুত বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করলে এই সংখ্যা খুবই সাধারণ বা রক্ষণশীল।

গোয়েল বলেন, আগামী পাঁচ বছরে কেবল বিমান খাতের চাহিদাই ১০ কোটি হাজার ডলারের বাণিজ্যের কারণ হবে। এর থেকে বোঝা যায়, কম শুল্কের বিনিময়ে এটি যৌক্তিক এক চুক্তি ছিল।

তবে সেই মাসের শেষের দিকে পরিস্থিতি বদলে যায়। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, ট্রাম্পের ঢালাও পারস্পরিক এবং ফেন্টানিল-সম্পর্কিত শুল্ক আরোপ অবৈধ। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ১২২ ধারা ব্যবহার করে তাদের সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর ঢালাওভাবে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে এটি বেশ অদ্ভুত, ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০ হাজার কোটি ডলারের আমেরিকান পণ্য কেনার পরিকল্পনা কেবল চালিয়েই যাচ্ছে না, বরং রুবিওর এই দাবিকে চ্যালেঞ্জও করছে না। তাদের চুপ থাকার ফলে এটি এখন একটি ‘প্রতিশ্রুতিতে’ পরিণত হয়েছে।

প্রতিবেদনে পীযূষ গোয়েলের আগের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন তোলা হয়, ভারতীয় অর্থনীতি উড়োজাহাজ ও উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের মতো বড় বড় জিনিস কেনার ক্ষমতা রাখুক বা না রাখুক, কেন দেশটি সেরা চুক্তি পেতে অন্যান্য সরবরাহকারীর পথ খোলা রাখবে না?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে তেলের ক্রমবর্ধমান দাম এবং ভারতীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ার ফলে ভারত তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে এসব উদ্বেগ আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদেরা প্রশ্ন তুলেছেন, কোম্পানিগুলোকে মার্কিন সরবরাহকারীদের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতি ছাড়া বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা আদৌ সম্ভব কি না।

এমকে গ্লোবালের অর্থনীতিবিদ মাধবী অরোরা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘এই হিসাব মিলছে না।’ তিনি এই লক্ষ্যমাত্রাকে ‘বাস্তবধর্মী হওয়ার চেয়ে অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা’ বলে উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্র হলো ভারতের শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্য, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নয়াদিল্লির মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সে দেশে পাঠানো হয়েছিল।

রপ্তানি শুল্ক আরোপের আগের স্তরের কাছাকাছি থাকলে এবং আমদানি মারাত্মকভাবে বেড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের যে বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত (লাভ) রয়েছে, তা কমে যেতে পারে। এতে ভারতের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের মোট পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২৮ হাজার ৩০৫ কোটি ডলার।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ ধর এর আগে রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘প্রতিবছর ১০ হাজার কোটি ডলার আমদানি করতে হলে এটি ভারতের বাণিজ্যের ভারসাম্যকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেবে।’ তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান শর্তগুলো মূলত ভারতের প্রধান বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখছে মাত্র, রপ্তানি বৃদ্ধিতে কোনো সাহায্য করছে না।

ভারতের এই পদক্ষেপের পেছনে কারণ কী

ভারত-মার্কিন সম্পর্কের অত্যন্ত সংবেদনশীল এক সময়ে রুবিওর এই ভারত সফর হলো। এখন অনেক ভারতীয় চীন ও পাকিস্তানের প্রতি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো নিয়ে চিন্তিত।

তা ছাড়া ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে ভারত বেশ রক্ষণশীল অবস্থানে রয়েছে। ধারণা করা হয়েছিল, নয়াদিল্লিই প্রথম এই সুবিধা পাবে। কিন্তু পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের পণ্যের ওপরই সবচেয়ে বেশি শুল্ক চাপানো হয়।

‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট যারাই ক্ষমতায় ছিল, তারা ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এই সময়ের মধ্যে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদও রয়েছে।

কিন্তু ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং গত বছর ভারত-পাকিস্তান শান্তিচুক্তিতে নিজের কৃতিত্ব দাবির পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে।

নিউইয়র্ক টাইমস উল্লেখ করেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করতে অস্বীকৃতি জানানোর পরেই ট্রাম্প ভারতের ওপর এই শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেন।

তবে নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে রুবিও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের গতি একটুও কমেনি... এই সম্পর্ক আগের মতোই শক্তিশালী রয়েছে।

ভারতের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রুবিও ভারতকে এটি ব্যক্তিগতভাবে না নেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘বড় ধরনের এক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে এবং এর সমাধান করা দরকার। এটি ভারতকে লক্ষ্য করে করা হয়নি।’

রুবিওর পাশে দাঁড়িয়ে ভারতের অর্থমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (তৎকালীন দায়িত্ব অনুযায়ী) বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন তাদের পররাষ্ট্রনীতি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আমেরিকা প্রথম) হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্টভাষী।

জয়শঙ্কর আরও যোগ করেন, ‘আমাদেরও একটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে, আর তা হলো “ইন্ডিয়া ফার্স্ট” (আগে ভারত)।’