যোগী আদিত্য আর শঙ্করাচার্যের সংঘাতে বিজেপির দুশ্চিন্তা বেড়েছে

যোগী আদিত্যনাথছবি : এএফপি

ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে জ্যোতিষ পীঠের (জ্যোতির্মঠ) শঙ্করাচার্য স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দের সরস্বতীর সংঘাত বিজেপির চিন্তা বাড়িয়ে তুলেছে। বিবাদের মীমাংসা তো দূরের কথা, ক্রমেই তা তীব্রতর হয়ে উঠেছে। কীভাবে এর মীমাংসা সম্ভব, সেই ধারণা এখনো কারও নেই।

এ সমস্যা নিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও চিন্তিত। চিন্তিত আরএসএসও। কারণ, যোগীর জন্য কোণঠাসা ব্রাহ্মণ সমাজ এই সংঘাতে পুরোপুরি সঙ্গ দিচ্ছে শঙ্করাচার্যকে। আগামী বছর রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ব্রাহ্মণ–ক্ষত্রিয় বিবাদ না মিটলে বিজেপিকে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। এই অবস্থায় সমাজবাদী পার্টিও তৎপর। যোগীর সঙ্গে স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতীর বিবাদের শুরু এক মাস আগে। ১৮ জানুয়ারি মৌনি অমাবস্যা উপলক্ষে অনুগামীদের নিয়ে জ্যোতিষ পীঠের শঙ্করাচার্য প্রয়াগরাজের সঙ্গমে (গঙ্গা–যমুনা–সরস্বতীর মিলনস্থল) রথে চেপে পুণ্যস্নান করতে গেলে রাজ্যের পুলিশ বাহিনী তাঁদের বাধা দেয়। শঙ্করাচার্যকে বলা হয়, অন্যদের মতো তাঁকেও হেঁটে যেতে হবে। অপমানিত শঙ্করাচার্য সেই থেকে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের প্রশাসনের ‘ঔদ্ধত্যের’ বিরুদ্ধে সরব। তিনি নানাভাবে মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের সমালোচনা করে চলেছেন।

ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও। শঙ্করাচার্যের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির পুরোনো এক অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে উত্তর প্রদেশ পুলিশ শঙ্করাচার্যের বিরুদ্ধে ‘পকসো’ আইনে (শিশুদের সঙ্গে যৌন অপরাধ রোধ আইন) মামলা দায়ের করেছে। মামলা দায়েরের পর প্রয়াগরাজ মেলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আদালতের রায় আসা পর্যন্ত কাউকে জ্যোতিষ পীঠের শঙ্করাচার্য হিসেবে গণ্য করা হবে না। ফলে মিটমাট তো দূরের কথা, সংঘাত তীব্রতর হয়েছে।

যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রাজ্যের ব্রাহ্মণ সমাজ নিজেদের কোণঠাসা মনে করতে থাকে। সন্ন্যাস নিলেও জাতপাতের নিরিখে যোগী ক্ষত্রিয়। উত্তর ভারতে যাঁদের সামাজিক পরিচয় ‘ঠাকুর’ হিসেবে। কংগ্রেসের শাসনকাল পর্যন্ত রাজ্যে ব্রাহ্মণদের যে আধিপত্য ছিল, ক্ষত্রিয় মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং মন্ডল কমিশনের রিপোর্ট চালু করার পর থেকে ক্রমেই তা ক্ষয়িষ্ণু আকার নিয়েছে। শূদ্র জাগরণের মোকাবিলায় বিজেপির অযোধ্যা অভিযান ব্রাহ্মণ সমাজকে তাদের ছাতার তলায় নিয়ে এলেও যোগী আদিত্যনাথের শাসনে তারা আধিপত্য হারিয়েছে। প্রাধান্য পেয়েছে ক্ষত্রিয়রা। ক্রমেই শঙ্করাচার্য হয়ে ওঠেন ব্রাহ্মণ সমাজের প্রতিবাদী চরিত্র।

প্রতিবাদের প্রথম ঝলক দেখা যায় কোভিডের সময়। যোগী নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন শঙ্করাচার্য। পেহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও কাঠগড়ায় তুলেছিলেন এই শঙ্করাচার্য। গণমাধ্যমের সামনে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন, সরকারের ত্রুটিতেই এমন হয়েছে। নিরাপত্তার ত্রুটির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করে তিনি বলেছিলেন, দেশের চৌকিদারেরই উচিত গাফিলতির জবাবদিহি করা। বাড়িতে চুরি চামারি হলে চৌকিদারকেই জবাবদিহি করতে হয়। কারণ, বাড়ির নিরাপত্তার দায়িত্ব তাঁর। দেশের নিরাপত্তার দায়িত্বে যিনি রয়েছেন, নিজেকে যিনি চৌকিদার বলে পরিচয় দেন, পেহেলগাঁও হামলার দায়ও তাঁর। তাঁকেই জবাবদিহি করতে হবে।

জ্যোতিষ পীঠের শঙ্করাচার্য অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এক সিদ্ধান্তেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইউজিসির এই নতুন নীতিতে বলা হয়েছে, তফসিল জাতি, উপজাতি ও অনগ্রসর শ্রেণির পড়ুয়াদের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে এক নতুন কমিটি গঠন করতে হবে। রাখতে হবে হেল্পলাইনও। শঙ্করাচার্যের দাবি, এই নীতি এক জাতিকে অন্য জাতির বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেবে। এতে হিন্দুধর্মেরই ক্ষতি হবে। অবিলম্বে এই নীতি প্রত্যাহার করা উচিত।

জানুয়ারি মাসে প্রয়াগরাজে মাঘমেলা স্নান বিতর্কের পর একটা সময় মনে করা হয়েছিল বিবাদের অবসান হয়তো ঘটতে চলেছে। শোনা গিয়েছিল, প্রয়াগরাজের প্রশাসন শঙ্করাচার্যের কাছে ক্ষমা চাইবে। কিন্তু তা হয়নি। স্নানে বাধা পেয়ে ক্ষিপ্ত শঙ্করাচার্য বারানসি ফিরে যান। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের অনমনীয় মনোভাব শঙ্করাচার্যকেও অনড় করে তুলেছে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে এটা হয়ে উঠেছে অশনিসংকেত। রাজ্যের সাধু–সন্তরা হিন্দুত্ববাদের জন্য এতকাল যে বিজেপিকে সমর্থন করে এসেছে, এই সংঘাত সেই ভোটব্যাংকে ঘা মারলে তা চিন্তার বিষয়। উত্তর প্রদেশের দুই উপমুখ্যমন্ত্রী এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু সফল হননি। আদিত্যনাথ এখনো অনড়।

মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ এখন সিঙ্গাপুরে। সে দেশের ইউনিভার্সাল সাকসেস গ্রুপ উত্তর প্রদেশে সাড়ে ৬ হাজার কোটি রুপি লগ্নি করতে রাজি হয়েছে বলে রাজ্য সরকার জানিয়েছে। সেই সফরকে কটাক্ষ করে সমাজবাদী পার্টির নেতা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গাপুর ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর যোগীর পুলিশ তদন্তের নামে সাধু সন্তদের অপমান করছে। রাজ্যের মানুষ এর উপযুক্ত জবাব দেবে।