ডিজিটাল ব্যক্তিগত সুরক্ষা আইনের খসড়া বিল নরেন্দ্র মোদি সরকার প্রথম এনেছিল ২০১৯ সালে। সেই বিলে রাষ্ট্রীয় ও সরকারের প্রশ্নহীন ক্ষমতা থাকায় নানা মহল সরব হয়। গঠিত হয় যুগ্ম সংসদীয় কমিটি। কমিটির বৈঠকে মতভেদ প্রকট হয়েছিল। বিজেপির সংসদ সদস্য প্রেম প্রকাশ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটির শাসক দলের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ওই বিলের আওতা থেকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীর মতো বিভিন্ন সংস্থাকে বাইরে রাখার সুপারিশ করেছিলেন। বিরোধীদের তীব্র আপত্তিতে সরকার ২০২২ সালের ৩ আগস্ট ওই বিল প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু তিন মাসের মধ্যে এবার নতুন বিলের যে খসড়া প্রকাশ করা হলো, তাতেও ‘জাতীয় স্বার্থে’ কেন্দ্রীয় সংস্থাদের ওই ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নতুন খসড়া চূড়ান্ত হলে সংবিধানস্বীকৃত ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘিত তো হবেই, রাষ্ট্রীয় বা সরকারি নজরদারিও হবে সীমাহীন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বিল যতটা ব্যক্তির অধিকার রক্ষায়, তার চেয়ে অনেক বেশি নজর দিয়েছে, কী করে সরকার সব ক্ষমতা ও অধিকার কুক্ষিগত করে ইচ্ছেমতো তার প্রয়োগ করতে পারে, সেই দিকে। এশিয়া প্যাসিফিক পলিসি কাউন্সিলের নম্রতা মাহেশ্বরীর মতে, ‘আগের বিলের আপত্তিকর বেশ কিছু বিষয় নতুন খসড়াতে আরও জোরালোভাবে রাখা হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর ছাড়ের ব্যাপকতা ও ক্ষমতার ব্যাপ্তিও বেড়েছে।’

যেমন খসড়া বিলে ‘জনস্বার্থ’–এর যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে থাকছে দেশের সংহতি ও সার্বভৌমত্ব, দেশের নিরাপত্তা, বিদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, প্ররোচনামূলক কাজকর্ম ও মিথ্যা প্রচার। এসব স্বার্থ রক্ষায় (এককথায় জনস্বার্থে) খসড়া আইনের বিধান মেনে চলা থেকে সরকার তার সংস্থাদের ছাড় দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারবে। বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারবে এমন কিছুর বিরুদ্ধে, যা সরকারের চোখে ‘স্পর্শকাতর’। এই স্পর্শকাতরতার সংজ্ঞা কিন্তু খসড়া বিলে নেই। তার বদলে কেন বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারবে, সেই ব্যাখ্যায় সরকার বলেছে, ‘জাতীয় স্বার্থ কখনো কখনো ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ পুরোনো বিল নিয়ে যুগ্ম সংসদীয় কমিটির আলোচনায় বিরোধীরা বলেছিলেন, সরকারের ছাড় হতে পারে ‘ন্যায়, ন্যায্য ও যুক্তিভিত্তিক’ ক্ষেত্রবিশেষে। নতুন বিলে তা রাখা হয়নি। সেখানে সরকারের অধিকার ও ক্ষমতা অপার। দিল্লিভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ‘ডায়ালগ’–এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কাজিম রিজভি মনে করেন, নতুন বিলে যুগ্ম সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। ব্যক্তি অধিকার রক্ষায় কোনো রক্ষাকবচই রাখা হয়নি। ডিজিটাল অধিকার গোষ্ঠী ‘ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন’–এর মতে, সরকারি সংস্থাদের ছাড়ের বিষয়গুলো ‘অস্পষ্ট ও দিগন্তবিস্তৃত’। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা হয়ে যাচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত। তারা মনে করে, আইন থেকে সরকারি সংস্থাদের বাদ দেওয়া হলে সরকারি নজরদারির আওতা থেকে কেউই বাদ পড়বে না।

ডিজিটাল জগতে ব্যক্তির যাবতীয় তথ্য নিরাপদ রাখা এই বিলের উদ্দেশ্য। এই বিল পাস হওয়ার পর গ্রাহকদের কাছ থেকে কোম্পানি যেসব তথ্য পাচ্ছে, তা গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তথ্যের অপব্যবহার করলে খসড়া বিলে জরিমানার প্রস্তাব রাখা হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা। তথ্য সংরক্ষণের জন্য যে সার্ভার ব্যবহার করা হবে, তা দেশের অথবা বন্ধুদেশের হতে পারে। বন্ধুদেশের এক তালিকা সরকার প্রস্তুত করবে। সে জন্য এক পৃথক বোর্ড গঠিত হবে। ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, তার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ব্যক্তি যদি কোনো পরিষেবা বন্ধ করে দেন, তা হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বলতে পারবেন তাঁর সব তথ্য মুছে দেওয়া হোক। খসড়ায় এ কথাও বলা হয়েছে, অপ্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে গ্রাহক অস্বীকার করলে তাঁকে পরিষেবা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। যদিও এ ক্ষেত্রে ‘অপ্রয়োজনীয়’ তথ্যের ব্যাখ্যা ও সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়নি।

ডিজিটাল দুনিয়ায় ব্যক্তিপরিসর মারাত্মকভাবে সংকুচিত। ২৪ ঘণ্টায় কে কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে দেখা করছে, প্রযুক্তির দৌলতে সবকিছু পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার নখদর্পণে। নতুন খসড়া বিল পাস হলে সরকার বা সরকারি সংস্থা সেই সব তথ্য ইচ্ছেমতো নিজের কাছে রাখতে পারবে। প্রয়োজনমতো ব্যবহারও করতে পারবে। ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ৯ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চের সর্বসম্মতভাবে রায় ছিল, গোপনীয়তা রক্ষা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, যা সংবিধানস্বীকৃত। ডিজিটাল ডেটা সুরক্ষা আইন কীভাবে আনা যায়, তা সুপারিশ করতে নরেন্দ্র মোদি সরকার সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বি এন শ্রীকৃষ্ণের নেতৃত্বে এক কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি তার প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর মোদি সরকার ২০১৯ সালে যে খসড়া বিল এনেছিল, বিচারপতি শ্রীকৃষ্ণ তা ‘বিপজ্জনক’ মনে করেছিলেন এবং ‘অরওয়েলিয়ান স্টেট’–এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। নতুন খসড়া বিলও সেই তুলনামুক্ত হতে পারল না। এখন দেখার, সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে সরকার খসড়া প্রস্তাবে প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচের বন্দোবস্ত করে কি না।