মানমন্দির থাকা যন্তর মন্তর কীভাবে হয়ে উঠল আন্দোলন–প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু

তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। ২২ জুলাই ২০২৬, নয়াদিল্লিছবি: রয়টার্স

দিল্লির যন্তর মন্তর সত্যি সত্যিই যদি বিক্ষোভকারী ও আন্দোলনকারীদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অধ্যায়ের অবসান ঘটবে। ভুলে যেতে হবে গণতন্ত্র ও আন্দোলনের সমান্তরাল অবস্থানের কথা।

অথচ আন্দোলনের জন্য যন্তর মন্তর গড়ে তোলা হয়নি। গড়া হয়েছিল জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণের জন্য।

মরুরাজ্য রাজস্থানের রাজধানী জয়পুরের মহারাজা সোয়াই জয় সিং (দ্বিতীয়) ১৭২৪ থেকে ১৭৩৫ সালের মধ্যে ভারতের পাঁচ শহরে পাঁচটি জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা মানমন্দির তৈরি করেছিলেন। লক্ষণীয়, ইউরোপের জেসুইট মিশনারিদের চোখে কোপার্নিকাস, গ্যালিলিওরা তখন ধর্মদ্রোহী। বিধর্মী।

জয় সিং প্রথম যন্তর মন্তরটি স্থাপন করেন দিল্লিতে, তারপর একে একে জয়পুর, উজ্জয়িনী, বারানসি ও মথুরায় গড়ে তোলেন একই ধরনের মানমন্দির। সূর্য, চাঁদ ও মহাবিশ্বের মহাকাশের অজস্র গ্রহ–নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, পৃথিবীর ওপর তাদের প্রভাব, সঠিক সময় ও কাল নির্ধারণ ছিল ওই মানমন্দিরগুলো স্থাপনের উদ্দেশ্য।

মথুরার মানমন্দিরটি বিলুপ্ত হলেও বাকি চার শহরে আজও তা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। যদিও আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লির যন্তর মন্তর জ্যোতির্বিদ্যা অধ্যয়নের চেয়েও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে।

স্বাভাবিক প্রশ্ন, এই মানমন্দিরগুলোর নাম যন্তর মন্তর কেন। উত্তর খুবই সহজ।

‘যন্তর’ হলো ‘যন্ত্র’ শব্দের অপভ্রংশ। যন্ত্র হলো সেই বস্তু, যা কাজে ব্যবহৃত হয়। একার্থে তা হাতিয়ারও বটে। ‘মন্তর’ শব্দটি ‘মন্ত্রণা’ বা ‘মন্ত্র’র অপভ্রংশ। অর্থাৎ, যন্তর মন্তর হলো গণনার যন্ত্র বা আকাশের সামঞ্জস্য পরিমাপের যন্ত্র। সহজ কথায়, এই মানমন্দির সূর্যের অবস্থান থেকে সঠিক সময় যেমন নির্ধারণ করে, তেমনই এখানে গ্রহ–নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা হয়।

দিল্লির যন্তর মন্তরে যেমন রয়েছে এক বৃহৎ রোদ্দুর ঘড়ি বা ‘সানডিয়াল’। আর আছে ‘রাম যন্ত্র’, যা দিয়ে বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের অবস্থান, উচ্চতা ও দিগংশ পরিমাপ করা হয়। ‘জয়প্রকাশ যন্ত্র’ দিয়ে সূর্য কোন রাশিচক্রে অবস্থান করছে দেখা হয়। ‘সম্রাট যন্ত্র’ সূর্যের আলো ও ছায়ার গতিবিধি দেখে সঠিক সময় নির্ধারণ করে। এই রকম মোট ১৩টি জ্যোতির্বিদ্যা–সংক্রান্ত স্থাপত্য রয়েছে যন্তর মন্তরে।

তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে যন্তর মন্তরে অবস্থান নেওয়া সিজেপির এক কর্মী রাতে মশারি টানিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। ২৯ জুন ২০২৬, নয়াদিল্লি
ছবি: রয়টার্স

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় দিল্লির এই মানমন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯০১ সালে জয়পুরের মহারাজা রাম সিং তা সংস্কার করেন।

দিল্লির যন্তর মন্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সমার্থক হয়ে ওঠে নব্বইয়ের দশকে। তার আগে যাবতীয় আন্দোলনের অকুস্থল ছিল বোট ক্লাব।

রাইসিনা হিলসের এক প্রান্তে অবস্থিত ভারতের রাষ্ট্রপতির বাসভবন। তার সামনের প্রশস্ত পথ এসে মিশেছে বিজয় চকে। সেখান থেকে শুরু হয়ে যে রাস্তাটি কোনো দিকে না বেঁকে সোজা চলে গেছে ন্যাশনাল স্টেডিয়াম পর্যন্ত, ব্রিটিশ জমানায় পৌনে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ওই সড়কের নাম ছিল ‘কিংসওয়ে’। স্বাধীনতার পর তার নাম বদল হয়। নতুন নাম হয় ‘রাজপথ’।

নরেন্দ্র মোদির জমানায় আরও অনেক নামের মতো রাজপথেরও নাম বদলে যায়। রাষ্ট্রপতি ভবনের অভ্যন্তরের ‘মোগল গার্ডেন’–এর নাম যেমন হয়েছে ‘অমৃত উদ্যান’, তেমনই রাজপথের নাম বদলে হয় ‘কর্তব্য পথ’। ওই পথের দুই ধারের সবুজ লন ও তারই পাশে টানা লম্বা অগভীর জলাধার, যা ইন্ডিয়া গেট পর্যন্ত বিস্তৃত।

সেই জলাধারে প্যাডেল নৌকা চালানোর বন্দোবস্ত ছিল। পরিবার নিয়ে ছুটির দিনে মানুষ নৌকা চড়ার সাধ মেটাতেন। সেই উন্মুক্ত অঞ্চলের পরিচিত বোট ক্লাব বলে। মোদি আমলে জলাধার আছে, বোট ক্লাব নামও আছে, কিন্তু নৌকা অন্তর্হিত। এই বোট ক্লাবই হয়ে উঠেছিল স্বাধীন ভারতের জনসমাবেশ ও জনবিক্ষোভের প্রধান জায়গা।

রাষ্ট্রপতি ভবন, নর্থ ও সাউথ ব্লক এবং সংসদ ভবনের মুখোমুখি অবস্থানের জন্য বোট ক্লাব হয়ে ওঠে সরকার ও শাসককে চ্যালেঞ্জ জানানো, বিভিন্ন দাবি সরকারের গোচরে আনার উপযুক্ত জায়গা। গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বরের মঞ্চ।

১৯৮৮ সালের কৃষক বিক্ষোভ প্রথম সরকারের টনক নড়ায়। সেই বছর পশ্চিম উত্তর প্রদেশের কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকায়েতের নেতৃত্বে কয়েক লাখ কৃষক ৩৫ দফা দাবি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন বোট ক্লাবে।

রাজপথের ওপর ও বোট ক্লাবের সর্বত্র তাঁবু খাটিয়ে, ট্রাক্টর ও গরুর গাড়িতে সংসার পেতে কৃষকেরা এক সপ্তাহ অবস্থা করেছিলেন। বোট ক্লাব ও রাজপথে উঠে এসেছিল উত্তর ভারতের গ্রাম। শেষ পর্যন্ত তাঁদের দাবির মুখে মাথা নোয়াতে হয়েছিল রাজীব গান্ধীর সরকারকে। টিকায়েতও দলবল নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন।

পরের বছরই ঘনিয়ে উঠেছিল রাজীব গান্ধী ও কংগ্রেসের রাজনৈতিক সংকট। বোফর্স, ফেয়ারফ্যাক্স, সাবমেরিন, কাটমানি, ঘুষের অভিযোগে সরকারকে জেরবার করে তোলেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। কংগ্রেসবিরোধী জনসভা তিনিও করেন বোট ক্লাবে। ক্ষমতার বদল হয়। দিল্লির মসনদে বসেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং, যিনি ভি পি সিং নামে পরিচিত ছিলেন।

১৯৯১ সালের মে মাসে লোকসভা ভোট চলাকালে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুমবুদুরে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে নিহত হন রাজীব গান্ধী। সেদিন ছিল ২১ মে। তার ঠিক আগের দিন শেষ হয়েছে প্রথম দফার ভোট গ্রহণ। রাজীব হত্যার দরুণ দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার ভোট স্থগিত করে দেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) টি এন শেষন। জুন মাসে ভোটের ফল বেরোলে সরকার গড়ে কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী হন নরসিংহ রাও।

পরের বছরই ধ্বংস করে দেওয়া হয় বাবরি মসজিদ। সেই অস্থিরতার মধ্যে ১৯৯৩ সালে সরকার জানিয়ে দেয়, বোট ক্লাবে আর কোনো সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। নতুন বিক্ষোভস্থল হিসেবে মাথা চাড়া দেয় অনতিদূরের যন্তর মন্তর। আর রাজনৈতিক জনসভার জন্য পছন্দের হয়ে উঠতে থাকে পুরোনো দিল্লির রামলীলা ময়দান।

সেই থেকে যন্তর মন্তর শত শত ছোট–বড়–মাঝারি বিক্ষোভ দেখে এসেছে। দেখেছে তাঁবু খাটিয়ে অনাদিকাল ধরে কোনো কোনো পরিবারের অবস্থান। কোনো কোনো আন্দোলন যেমন সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনই কত শত আন্দোলন ও ধরনাকারী সুবিচারের মুখ দেখেননি। কালের নিয়মে তাঁরা সরে গেছেন।

মেধা পাটকর নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন শুরু করেছিলেন অনশন দিয়ে। ২০০৬ সালে যন্তর মন্তরে ২০ দিন অনশন করেছিলেন তিনি। ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনার সুবিচারের দাবিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা এখানেই তাঁবু খাটিয়ে ধরনা দিয়েছিলেন মাসের পর মাস। প্রবীণ গান্ধীবাদী আন্না হাজারে যখন ২০১১ সালে প্রথম দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন, অনশনে বসেন, তখন তিনি যন্তর মন্তরকেই বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে যদিও তিনি বৃহত্তর পরিসর বলে চলে যান রামলীলা ময়দানে।

যন্তর মন্তরে ১৮ শতকে স্থাপন করা মানমন্দিরের একাংশ
ফাইল ছবি–রয়টার্স

২০১৫ সালে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যরা ‘এক পদ এক পেনশনের’ দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেন। যন্তর মন্তর হয়ে উঠেছিল তাঁদের ঘরবাড়ি। ২০১৭ সালে খরা ও ঋণের দায়ে জর্জরিত তামিলনাড়ুর কৃষকেরা ৪১ দিন অনশনে বসেছিলেন যন্তর মন্তরে। ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনেরও আঁতুরঘর ছিল এই এলাকা। পরে যদিও তা সরে যায় শাহীনবাগ অঞ্চলে। যৌন হেনস্তার প্রতিবাদে ২০২৩ সালে অলিম্পিক পদজয়ীরাও বিজেপি নেতা ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন এখানে।

ককরোচ জন পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্মানে ঘা দিয়েছে। ১২ বছরে যা তিনি কখনো করেননি, ‘তেলাপোকারা’ তা করাতে তাঁকে বাধ্য করেছে। দাবির মুখে তিনি বাধ্য হয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে। সেই ‘তেলাপোকাদের’ ঠেকাতে মোদি সরকার যন্তর মন্তরকে আন্দোলনস্থল হিসেবে নিষিদ্ধ করেছে।

মোদি সরকার জানিয়ে দিয়েছে, আর কোনো দিন কাউকে অশোক রোড, জনপথ ও টলস্টয় রোডের মধ্যে গাছগাছালিতে ঢাকা বাঁকানো এই এলাকায় বিক্ষোভ আয়োজন করতে দেওয়া হবে না। বিক্ষোভকারীদের বেছে নিতে হবে রামলীলা ময়দান, সিবিডি গ্রাউন্ড ও বুরারির ময়দানের মতো তিন বিকল্প স্থানের একটিকে, দিল্লির প্রাণকেন্দ্র থেকে যথাক্রমে ৪, ১২ ও ২২ কিলোমিটার দূর। অথচ এতগুলো দশক ধরে যন্তর মন্তর লন্ডনের হাইড পার্কের সমতুল্য হয়ে উঠেছিল।

ভরসা এখন সুপ্রিম কোর্ট। সরকারের সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ আদালত সিলমোহর দিলে শাসকের চোখের সামনে ও ক্ষমতার অলিন্দের কাছে আর কেউ দাবি সনদ নিয়ে হাজির হতে পারবেন না। ভারতীয় গণতন্ত্রের পক্ষে তা সুখকর হতে পারে না।