যৌথ ঘোষণাপত্রে একমত ব্রিকস

  • আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও ডব্লিউটিওর সংস্কারের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা ব্রিকসের।

  • পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো নীতির বিরুদ্ধে ঐক্য প্রদর্শনের চিন্তা।

ব্রিকস সম্মেলনে সামনের সারিতে একসঙ্গে হাঁটছেন (বাঁ থেকে) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাঁদের পেছনে রয়েছেন বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা। গতকাল ভারতের নয়াদিল্লিতেছবি: রয়টার্স

উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই যৌথ ঘোষণাপত্রের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন জোটের নেতারা। নয়াদিল্লিতে গতকাল শনিবার দুই দিনের এ শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে। জোটের বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধি করাই এ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য বলে জানা গেছে।

এমন এক সময়ে এ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরান যুদ্ধ ছয় মাস পেরিয়েও সমঝোতার কোনো আভাস নেই। এ যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত জটিল আকার ধারণ করেছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর অঞ্চলে তাদের অবস্থান সংহত করেছে। ব্রিকস জোটের দুই সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) সরাসরি এ সংঘাতের শিকার। ব্রিকসের সদস্যরা ওই দুই দেশের মতপার্থক্য কমিয়ে আনতেও কাজ করছে।

সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, জোটের সদস্যদেশগুলোর নেতারা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রের বিষয়ে একমত হয়েছেন। যদিও ঘোষণাপত্রে সরাসরি কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে একপক্ষীয় যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানানো হবে। গতকালই জোটের নেতারা ঘোষণাপত্রের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন। আগামী বছর ব্রিকস সম্মেলন চীনে অনুষ্ঠিত হবে বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।

ঘোষণাপত্রের বিষয়ে জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও দিল্লির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই জোটের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল, মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে এমন একটি কূটনৈতিক ভাষা চূড়ান্ত করা, যা আবুধাবি ও তেহরান—উভয় পক্ষই মেনে নিতে পারে, যাতে যৌথ ঘোষণাপত্রের পথ সুগম হয়। সেখানে তারা সফল হয়েছে।

এর আগে গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরান ও আমিরাতের মতভেদের কারণে কোনো যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, গতকাল একমত হওয়া যৌথ ঘোষণাপত্র বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে খুব বড় পরিবর্তন না আনলেও পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো নীতির বিরুদ্ধে উদীয়মান দেশগুলোর এই জোটের ঐক্য প্রদর্শন করবে।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্য

ব্রিকস জোট আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ও নীতিনির্ধারণে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টার করছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। জোটের অনেক সদস্যের মতে, এই সংস্থাগুলোতে পশ্চিমা শক্তির প্রভাব রয়েছে।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিল রামাফোসা, আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ অনেকে।

যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরায়েল, ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা ভারত বর্তমানে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধি, বাধা দূরীকরণ ও ব্যবসার সুযোগ প্রসারের আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের প্রভাব ঘিরে ইরান ও আমিরাতের দ্বন্দ্বে মধ্যস্থতা করা ব্রিকসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ে আমিরাত গত আগস্টে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করে।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে ব্রিকস জোট গঠিত। যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করতে ২০০৯ সালে ব্রিকস গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্ব জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই জোটের অন্তর্ভুক্ত।

সম্পর্ক জোরদারে সম্মত রাশিয়া–ভারত

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত শুক্রবার বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরও গভীর করতে সম্মত হয়েছেন। পুতিন বলেছেন, পশ্চিমা নিয়মকানুন থেকে মুক্ত বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্রিকস জোটের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা উচিত। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আগের দিন ভারতের রাজধানীতে বৈঠকে বসেন মোদি ও পুতিন।

পুতিনের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভ জানিয়েছেন, ব্রিকস এখন ভূরাজনৈতিক জোট থেকে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপান্তরিত হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সহযোগিতা সহজ করা। পাশাপাশি পেমেন্ট সিস্টেম ও যৌথ অবকাঠামোর উন্নতি করা।

দিল্লিতে শুক্রবার ব্রিকস বিজনেস ফোরামের এক অনুষ্ঠানে পুতিন বলেন, দুর্ভাগ্যবশত, আজ পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাদের আগের নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য যেকোনো পথ অবলম্বন করছে।

পেজেশকিয়ান, মোদি ও রামাফোসার উপস্থিতিতে পুতিন বলেন, ‘এই প্রতিযোগিতা কখনো কখনো কুরুচিকর রূপ নিচ্ছে। এমনকি এর মধ্যে সরাসরি শারীরিক আক্রমণ বা শিল্প ও লজিস্টিক সুবিধা, পাইপলাইন ইত্যাদির ধ্বংসসাধনও করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরিবহন করিডর বন্ধ করা এবং জাহাজ জব্দের চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, যাঁরা অন্যদের স্বার্থে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে তথাকথিত নিষেধাজ্ঞার কথা বলে অবৈধ বিধিনিষেধও আরোপ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ব্রিকস ‘বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি নতুন ও টেকসই প্ল্যাটফর্ম’ গড়ে তুলবে।

গত বছর ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষের কারণ হয়েছিল। তিনি ব্রিকস জোটের ‘আমেরিকাবিরোধী নীতি’র সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা যেকোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন।

ভারত, চীনের মতো বড় ক্রেতাসহ রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, মোদি ও পুতিন পশ্চিম এশিয়া এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের সংঘাতের বিষয়ে মতবিনিময় করেছেন, যা সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং ভারতীয় নাবিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দুই দেশের মধ্যকার বিশেষ ও কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও জোরদার করার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকতে দুই নেতা একমত হয়েছেন।