কোন ক্ষোভ থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতির হাত থেকে সনদ নেবেন না শিক্ষার্থীরা
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তর ওপর ‘জেন–জি’দের রাগ কিছুতেই কমছে না। হায়দরাবাদের ন্যাশনাল একাডেমি অব লিগাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের (নালসার) বার্ষিক সমাবর্তনে সূর্যকান্তকে প্রধান অতিথি করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন সেই প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা। সেই সিদ্ধান্ত ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক ও জটিলতা। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রীয় আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে সেই বিতর্কে ঢুকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আইন পেশার সব তেলাপোকা একত্র হলে কী হবে?’
এই অবস্থায় পিছু হটতে চলেছে নালসার কর্তৃপক্ষ। প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানালেও সমাবর্তনের তারিখ ঘোষণা করেনি। পিছু হটেছে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়াও, যারা জানিয়েছিল কাউন্সিলের নির্দেশ ছাড়া নালসার থেকে পাস করা কাউকে কোথাও আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত করা যাবে না। তেলাপোকাদের চাপে বার কাউন্সিল সেই নির্দেশ প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছে। মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিসিআই। যদিও তেলাপোকারা জানিয়েছে, বিসিআইকে তদন্তের হুকুম ও দোষীদের চিহ্নিত করার নির্দেশও প্রত্যাহার করতে হবে।
চাপে পড়ে নালসার কর্তৃপক্ষ এখনো সমাবর্তনের দিন স্থির করতে পারেনি। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তও জানাননি, সমাবর্তন উপলক্ষে প্রধান অতিথির আমন্ত্রণ গ্রহণ করছেন কি না। তবে শুক্রবার বিসিআইকে একহাত নিয়ে সূর্যকান্ত বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার কোনো এখতিয়ারই বার কাউন্সিলের নেই। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে ও আইন মেনে প্রতিবাদ বন্ধে আদালত হস্তক্ষেপ করবে না। সূর্যকান্ত এ কথাও বলেন, ‘বিসিআই যা করেছে, তা একেবারেই অনভিপ্রেত। একসময় আমিও ছাত্র ছিলাম। আমিও বিক্ষোভে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছি। এখানে যা হচ্ছে তা আমার ও ছাত্রদের সংলাপ। বিসিআইয়ের হস্তক্ষেপের অধিকারই নেই।’ বিসিআইয়ের ওই নির্দেশিকার বিরুদ্ধে করা এক আবেদনে প্রধান বিচারপতি শুক্রবার ওই মন্তব্য করেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, নালসারের কোনো পড়ুয়া ও অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যেন গ্রহণ করা না হয়।
ভারতের কোনো প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে অতীতে এমন অনভিপ্রেত বিতর্ক দেখা যায়নি। সূর্যকান্ত দেশের একশ্রেণির বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা ও পরজীবী’ বলায় নতুন প্রজন্ম ককরোচ জনতা পার্টি গঠন করে। সেই মন্তব্য জেন–জিকে শুধু জোটবদ্ধই করেনি, দেশের শাসক দল বিজেপিকেও কোণঠাসা করেছে। গত ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদি সরকার জনতার চাপে যা করেনি, তা করতে বাধ্য হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির জন্য শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। তেলাপোকাদের চাপ ও বিরোধীদের দাবির মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ টানা তিন সপ্তাহ সংসদের অধিবেশনে গরহাজির থেকেছেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তটস্থ করে রেখেছে ঝাড়খন্ড সরকারকেও। আচমকাই তরুণ প্রজন্ম হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক ভাগ্যনিয়ন্তা। নালসারের ঘটনাও তারই প্রমাণ।
বিতর্কের সূত্রপাত কীভাবে
তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদের নালসার বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের আইন শিক্ষার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। নালসারের উপাচার্য ২০২৬ সালের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে সম্প্রতি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তকে। এই সিদ্ধান্ত ক্ষুব্ধ করে ওই প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের। শিক্ষার্থীদের একাংশ উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও অধ্যাপকদের চিঠি লিখে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য, যিনি জন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচারের অভিযোগ শুনতে ও অত্যাচারের ভিডিও দেখতে অস্বীকার করেছিলেন, তাঁর হাত থেকে তাঁরা ডিগ্রি নিতে রাজি নন।
পড়ুয়াদের ক্ষোভ ও আপত্তির কথা জানাজানি হতে নড়েচড়ে বসে নালসার কর্তৃপক্ষ এবং বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (বিসিআই)। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না নিলেও বিসিআই গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক নির্দেশিকা জারি করে। তাতে বলা হয়, বিসিআই পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ২০২৬ সালে নালসার থেকে পাস করা কোনো গ্র্যাজুয়েট দেশের কোনো রাজ্যের বার কাউন্সিলে নাম নথিভুক্ত করতে পারবেন না। সেই সঙ্গে নালসার কর্তৃপক্ষকে বলা হয়, ঘটনার উপযুক্ত তদন্ত করতে। কোন কোন শিক্ষার্থী ও অধ্যাপক এর সঙ্গে জড়িত, তাঁদের চিহ্নিত করে বিসিআইয়ের কাছে সেই রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। বিসিআইয়ের এই নির্দেশ তেলাপোকাদের জাগিয়ে দেয়। ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে বৃহস্পতিবার রাত আটটায় ‘এক্স’ হ্যান্ডলে এক লাইনের একটা পোস্ট করেন। বিসিআইয়ের নির্দেশিকা ট্যাগ করে তিনি লেখেন, ‘আইন পেশার সব তেলাপোকা একসঙ্গে এগিয়ে এলে কী হবে?’ স্পষ্টতই, ওই একলাইনের পোস্ট ছিল বিসিআইয়ের প্রতি এক প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি, যার মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছিল, নির্দেশ প্রত্যাহার করা না হলে তেলাপোকারা আন্দোলনে নামবে।
অভিজিৎ দিপকের পোস্ট ট্যাগ করে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস সঙ্গে সঙ্গেই ‘এক্স’ মারফত জানিয়ে দেন, ‘এটাই দরকার। বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। মনন কুমার মিশ্র ২০১২ সাল থেকে এর চেয়ারম্যান। এতগুলো বছর উনি কী করেছেন? সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আইনি পেশার সঙ্গে যুক্ত সব তেলাপোকার কাজ একটাই। বিসিআই ও মনন মিশ্রর দায়বদ্ধতার হিসাব নিতে হবে।’
রাত ১০টায় অভিজিৎ দিপকে আরও একটা এক লাইনের পোস্ট করেন। তাতে বলেন, ‘সময় এসেছে মনন মিশ্রর ইস্তফা দেওয়ার।’ এই পোস্টের পরেই বিসিআই চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্র জানান, তাঁরা তাঁদের নির্দেশিকা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ককরোচ জনতা পার্টির ‘এক্স’ হ্যান্ডেল থেকে বলা হয়, ‘বিসিআই নির্দেশ পরিবর্তন করেছে, প্রত্যাহার নয়। তদন্তের নির্দেশ এখনো জারি রয়েছে।’ একই সঙ্গে সিজেপি জানিয়ে দেয় মনন কুমার মিশ্রর পরিচয়ও। বলে, বিসিআইয়ের নির্দেশ যিনি দিয়েছেন তিনি একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব পালন করছেন। মনন কুমার মিশ্র শুধু বিসিআইয়ের চেয়ারম্যানই নন, তিনি বিজেপির রাজ্যসভার সদস্যও।
অর্থাৎ সিজেপি এটা বুঝিয়ে দিল, যন্তর মন্তরের ঘটনাবলি বিজেপির আঘাতে এখনো সেভাবে প্রলেপ দিতে পারেনি। বিসিআইকে হাতিয়ার করে দেশের প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের তারা ‘শিক্ষা’ দিতে উদ্গ্রীব। নালসারে তা যা করতে চেয়েছে, তা ‘উইচ হান্ট’–এরই শামিল। বেছে বেছে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের তারা শিক্ষা দিতে চাইছে। তেলাপোকাদের এই আচরণ বোঝাচ্ছে, দেশের প্রধান বিচারপতিকে তারা এখনো ক্ষমা করেনি। একই সঙ্গে বোঝা গেল, বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার মতো এক প্রতিষ্ঠান দখল রেখেও বিজেপি তার ইচ্ছেমতো আইন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় ব্যর্থ। ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেট আইনে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিধিবদ্ধ সংস্থা আইন পেশা, আইনজীবীদের পেশাগত মানদণ্ড তৈরি ও দেশের সর্বত্র আইনি শিক্ষায় নজরদারি করে। নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু এই বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর নালসার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিসিআই তাদের যে নির্দেশ দিয়েছে সেই এখতিয়ার তাদের আছে কি না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা খতিয়ে দেখবে।
মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে নির্দেশ প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি তেলাপোকাদের রীতিমতো ভয় পেতে শুরু করেছে।