আটক হওয়া বিক্ষোভকারীরা ছাড়া পেয়েই যাচ্ছেন যন্তর মন্তরে
লেখাপড়া শেষে অধ্যাপক হতে চায় দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী কৃষ্ণা। তাকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর থেকে আটক করে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তার অভিযোগ, আটক করার সময় কয়েকজন নারী পুলিশ সদস্য তাকে চুল ধরে টানাহেঁচড়া করেছেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রতিবাদে এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ঘিরে কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলন চলছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে এ আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সারা দেশ থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি আসছেন।
গত সোমবার বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তর থেকে রাইসিনা মার্গ হয়ে লোকসভা ভবনের দিকে যাত্রা করেছিলেন। দিল্লি পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়, বেধড়ক লাঠিপেটা করে ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। সেখান থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
লোকসভা অভিমুখে মিছিল থেকে আটক হওয়ার ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আবার অনেক বিক্ষোভকারী যন্তর মন্তরে ফেরেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আসেন সরাসরি থানা থেকেই। রাতে থানায় ছিলেন তাঁরা।
এই বিক্ষোভকারীদের একজন ২১ বছর বয়সী সমীর দোরওয়াল। তলস্তয় রোড থেকে আটক হওয়ার পর রাতে তাঁকে মন্দির মার্গ থানায় রাখা হয়েছিল। ছাড়া পাওয়ার পর সেখান থেকে সরাসরি যন্তর মন্তরে ফেরেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওপেন লার্নিংয়ের এই শিক্ষার্থী।
পুলিশের ব্যারিকেড, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেলের মুখোমুখি হওয়ার চেয়েও সমীর এখন অন্য এক কারণে বেশি উদ্বিগ্ন, তাঁকে এবার মা–বাবার মুখোমুখি হতে হবে।
অধ্যাপক হওয়ার স্বপ্ন দেখা দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী কৃষ্ণাকে আটক করে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কৃষ্ণা জানায়, ‘আমি আগে ভাবতাম, পুলিশ মানুষের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু গত সোমবার তারা আমার চুল ধরে টেনেছে এবং আমাকে জেলে যেতে বলেছে।’
সমীর বলেন, ‘আমি মা–বাবাকে বলেছিলাম যে এক বন্ধুর বাড়িতে থাকছি। আমাকে যে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না।’ তবে একটি বিষয়ে এ তরুণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তিনি বাড়ি ফিরবেন এবং আবারও বিক্ষোভস্থলে আসবেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থা ভেতর থেকে পচে গেছে। আমরা যদি এখন কিছু না করি, তবে কে করবে?’
পাঁচ হাজার রুপির একটি বন্ড জমা দিয়ে সমীর জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। তাঁকে আগামী আগস্টে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে আইপি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ বছর বয়সী আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সিদ্ধার্থের কাছে আটকের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়ের। তিনি বলেন, ‘(সোমবার) পুলিশ যখন আমাকে আটক করেছিল, তখন আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। এরপর কী হবে, তা নিয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। অবাক করার বিষয়, পুলিশ আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহারই করেছে।’
অন্তত ২০ জন পুলিশ সদস্য আমাকে ও আমার মেয়েকে আটক করেন। এরপর আমাদের আলাদা করে দেন এবং আমাকে প্রায় এক কিলোমিটার টেনে নিয়ে যান। একপর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।সীমা যাদব, যন্তর মন্তরের বিক্ষোভকারী
গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিন দিন ধরে যন্তর মন্তরে অবস্থান করেছেন সিদ্ধার্থ। তিনি বলেন, সোমবারের ঘটনাগুলো তাঁর সংকল্প আরও দৃঢ় করেছে। শিক্ষাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তাই এ ইস্যুতে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে যন্তর মন্তরজুড়ে উল্লাসধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছিল। ককরোচ জনতা পার্টির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা ঘোষণা দেন যে সোমবারের বিক্ষোভে আটক হওয়া সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
৩৮ বছর বয়সী সীমা যাদব ও তাঁর ১৬ বছর বয়সী মেয়ে কৃষ্ণা যন্তর মন্তরে এসেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের খবর জেনে তাঁরা আলিগড় থেকে দিল্লিতে এসেছেন। দিল্লিতে তাঁদের কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। তাই পাঁচ দিন ধরে গুরুদুয়ারা বাংলা সাহিবে অবস্থান করেছেন তাঁরা।
সীমার অভিযোগ, ‘সোমবার অন্তত ২০ জন পুলিশ সদস্য আমাকে ও আমার মেয়েকে আটক করেন। এরপর আমাদের আলাদা করে দেন এবং আমাকে প্রায় এক কিলোমিটার টেনে নিয়ে যান। একপর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।’
অধ্যাপক হওয়ার স্বপ্ন দেখা দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী কৃষ্ণাকে আটক করে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কৃষ্ণা জানায়, ‘আমি আগে ভাবতাম, পুলিশ মানুষের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু সোমবার তারা আমার চুল ধরে টেনেছে এবং আমাকে জেলে যেতে বলেছে।’
এক দিনের কম সময়ের মধ্যে এই মেয়ে ও মা আবার বিক্ষোভস্থলে ফিরে এসেছেন। সেখানে তাঁরা ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় আছেন।