আসামে ভোটার তালিকা সংশোধনে জালিয়াতি, ‘মৃত’ দেখিয়ে মুসলিমদের বাদ দেওয়া হচ্ছে

ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম পরীক্ষা করে দেখছেন আসামের বাসিন্দারা। এ বছরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। ১০ জানুয়ারি ২০২৬, গুয়াহাটিছবি: এএনআই

ভারতের আসাম রাজ্যের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী হাফিজুদ্দিন আহমেদ গত শুক্রবার একটি সরকারি নোটিশ পান। তাঁকে শুনানির জন্য অফিসে ডাকা হয়। সেখানে বলা হয়, আসামের নগাঁও-বাতাদ্রাবা বিধানসভা আসনের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। কারণ, তিনি নাকি ‘মৃত’।

হাফিজুদ্দিন বলেন, ‘আমি তাঁদের আমার ভোটার আইডি কার্ড দেখালাম। যেহেতু আমি জনস্বাস্থ্য কারিগরি বিভাগে কাজ করতাম। ফলে, সেখানকার কর্মকর্তাদের আমি চিনতাম। তাঁরা আমার কাগজপত্র দেখে বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।’

একই অবস্থা হাফিজুদ্দিনের প্রতিবেশী ৮০ বছর বয়সী শয্যাশায়ী প্রবীণ আইনজীবী আজিরুদ্দিন আহমেদের। তাঁর নামেও ‘মৃত’ হওয়ার অভিযোগে নোটিশ এসেছে। এমনকি তাঁর স্ত্রী ফারহানা ইয়াসমিনের নামেও নোটিশ এসেছে, তিনি নাকি এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন।

ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ধিং কলেজের ৭৭ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবদুল সালাম সস্ত্রীক পশ্চিমবঙ্গে ভ্রমণে ছিলেন। তিনিও খবর পান, তাদের দুজনকে ‘মৃত’ দেখিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বাইরে থাকায় ছেলেকে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁকে বলা হয়েছে, আমাদের সশরীরে উপস্থিত হতে হবে।’

ভোটার তালিকা সংশোধনের লক্ষ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চলছে। নির্বাচন কমিশনের এই সংশোধন নিয়ে বিতর্ক চলছে। কংগ্রেসসহ বিরোধীরা অভিযান করছে, মুসলিম, আদিবাসী ও ভিন্নমতের ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগকারী কে

তদন্তে দেখা গেছে, এসব নোটিশের পেছনে একজনই অভিযোগকারী, যাঁর নাম বিশাল রায়। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশাল রায় একই পোলিং বুথের ৬৪ ব্যক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই তালিকায় ওই বুথের সরকারি কর্মকর্তা (বিএলও) নুরুদ্দিন আহমেদ ও তাঁর স্ত্রীর নামও রয়েছে।

বিএলও নুরুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি জানি না, এই ব্যক্তি (বিশাল রায়) কে? তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ট হিসেবেও আমাদের সঙ্গে কাজ করেননি।’

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও সতর্কতা

নগাঁও জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা দেবাশীষ শর্মা বলেছেন, নগাঁও একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা হওয়া সত্ত্বেও এখানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে বিশৃঙ্খলা এড়াতে ও পরিকাঠামো উন্নত করতে শুনানি স্থগিত রাখা হয়েছে।

দেবাশীষ সতর্ক করে বলেন, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর অভিযোগ দেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপযুক্ত নথিপত্র থাকলে কোনো বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে না।

ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে বা অতি-উৎসাহী হয়ে কেউ কেউ এমনটা করছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

অনুরূপ পরিস্থিতি দেখা গেছে উত্তর আসামের লখিমপুর জেলাতেও। সেখানেও প্রশাসন ভুয়া অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

কেন এই সংশোধন চলছে

আসাম রাজ্যে চলতি বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন চলছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ৪ লাখ ৭৮ হাজার মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।

এলাকা ছেড়ে গেছেন, এমন ৫ লাখ ২৩ হাজার ভোটার শনাক্ত করা হয়েছে।

নিয়ম কী

কেউ যদি মনে করেন, ভোটার তালিকায় কোনো নাম ভুল আছে, তবে তিনি ‘ফর্ম-৭’ পূরণ করে আপত্তি জানাতে পারেন। তবে এটি করার সময় তাঁকে ঘোষণা দিতে হয়, তথ্যটি সত্য। যদি তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়, তবে ওই ব্যক্তির এক বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা হতে পারে।

আপত্তি জানানোর সময় বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সব অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হবে। ১০ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে।