ভিডিও দেখার সময় আমাদের নেই: ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার ভিডিও দেখার অনুরোধে প্রধান বিচারপতি

ভারতের সুপ্রিম কোর্টছবি: এএনআই

ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর দিল্লি পুলিশের হামলার বিষয়টি তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রধান বিচারপতি আজ বুধবার সেই আবেদনের জরুরি শুনানির অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে গড়ে ওঠা একটি দল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে এ বিক্ষোভ এখন ভারতের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছেন।

আজ সুপ্রিম কোর্টে শিক্ষার্থীদের পক্ষের এক আইনজীবী প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে জানান, পুলিশের বর্বরতা প্রমাণের ভিডিও তাঁদের কাছে রয়েছে। সেই ভিডিও চিত্র আদালতকে দেখার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

এ সময় বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘আমাদের সময় নষ্ট করবেন না এবং নিজের সময়ও নষ্ট করবেন না।’ এরপর প্রধান বিচারপতি আরও মন্তব্য করেন, ‘ভিডিও দেখার সময় আমাদের নেই।’

সিজেপি নামটি তৈরি হয়েছে ২০২৬ সালের মে মাসে। তার কয়েক দিন আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানির সময় বেকার ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণদের ‘ককরোচ’ অর্থাৎ ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এই অপমানজনক মন্তব্যটিকে নিজেদের করে নিয়ে শাসক দল বিজেপির নামের অনুকরণে একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন সংগঠন হিসেবে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তৈরির ঘোষণা দেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা বিজেপিকে ছাড়িয়ে যায়।

শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার প্রসঙ্গ উত্থাপন করে আজ শিক্ষার্থীদের পক্ষে তাঁদের আইনজীবী যুক্তি দেন, শিক্ষার্থীরা জাতীয় স্তরে প্রতিযোগিতামূলক ‘নিট’ পরীক্ষার যথাযথ পরিচালনা এবং ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’-এর সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরছেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকেরা যন্তর মন্তরে অবস্থান অব্যাহত রেখেছেন। ২২ জুলাই ২০২৬, নয়াদিল্লি
ছবি: এএনআই

এ পর্যন্ত বলার পরে ওই আইনজীবীর কথায় বাধা দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।’

আইনজীবী আদালতকে বলেন, পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ভিডিও তাঁদের কাছে রয়েছে। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা ভিডিওতে আগ্রহী নই, এটি দেখার সময় আমাদের নেই।’

গতকাল মঙ্গলবার দিল্লি হাইকোর্টও একই ধরনের একটি আবেদনের জরুরি শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আদালতকে এর মধ্যে টানবেন না।’

প্রধানত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং ভিডিও থেকে পাওয়া যাবতীয় প্রতিবেদন স্পষ্টই প্রমাণ করছে, দিল্লির পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপরে বারবার কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়েছে, তাঁদের লাঠিপেটা করেছে ও প্লাস্টিকের ব্যাটন দিয়ে বিক্ষোভকারীদের পিটিয়েছে।

যন্তর মন্তরে অবস্থান নেওয়া এক তরুণীর হাতে লাদাখের পরিবেশবাদী কর্মী সোন ওয়াংচুকের ছবি। ২২ জুলাই ২০২৬, নয়াদিল্লি
ছবি: এএনআই

শিক্ষাব্যবস্থার নানা সমস্যার প্রতিবাদে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ অভিমুখে পদযাত্রায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। এ সময় তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকার দৃশ্যতেই নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করেছে।

গত এক দশকের মধ্যে ভারতের রাজধানীতে সবচেয়ে বড় এই ছাত্র বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অবশ্য সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নির্বাচনগুলোয় বড় জয় পেয়েছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সরকার।

গত সোমবার ​নতুন অধিবেশন শুরুর আগে ভারতের সংসদে যাওয়ার পথে দেওয়া কিছু ব্যারিকেড বিক্ষোভকারীরা ভেঙে ফেলার পর নিরাপত্তা বাহিনী তাদের লাঠিপেটা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা ছবিগুলোতে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের তাড়া করে লাঠি ও ব্যাটন দিয়ে পেটাচ্ছে পুলিশ।

অনেকে আশা করেছিলেন, এই বিক্ষোভ কিছুদিনের মধ্যে গতি হারাবে। কিন্তু তা হয়নি, বরং সংসদ শুরু হওয়ার পরে ছাত্রদের বিক্ষোভ আরও বড় আকার ধারণ করেছে। অনেকে বলছেন, এই বিক্ষোভকে বিজেপি নিজেই কিছুটা বাড়তে দিয়েছে।

কারণ হিসেবে তারা বলছে, সংসদের এই অধিবেশনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিল তারা বিতর্ক ছাড়াই পাস করাতে চায়। সংসদের ভেতরে কী হচ্ছে, তা থেকে নজর ঘোরাতে এই আন্দোলনকে জোরদার করে তুলেছে বিজেপি নিজেই। তবে, এই বক্তব্যের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বড় অংশ এখন আর একমত নয়।