জেন-জির ক্ষোভ সামলাতে জোড়া ব্যবস্থা বিজেপির

ভারতের পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টির সমর্থকদের মিছিলে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। ২০ জুলাই ২০২৬ছবি: রয়টার্স

শুধু জেন–জি নয়, নতুন প্রজন্মের মন জিততে বিজেপি এখন থেকে জেন আলফাকেও সমান গুরুত্ব দিতে চলেছে। কারণ, আজ যারা ১৬–১৭, ২০২৯ সালে লোকসভা ভোটে তারা ভোটাধিকার পেয়ে যাবে। সংগঠনের দায়িত্ব নতুন নেতৃত্বের হাতে সঁপে দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৈরি করে দেওয়া ‘রোড ম্যাপ’ অনুযায়ী বিজেপি এখন নতুন প্রজন্মের মন জেতার ওপরই বেশি করে নজর দিতে চলেছে।

সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের নেতৃত্বে সদ্য গঠিত ৬৫ সদস্যের জাতীয় টিমের প্রথম বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত শনিবার ওই সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন, এত দিন দলীয় নেতারা সবাইকে কর্তব্য সম্পর্কে জানিয়ে এসেছেন। কী কী করতে হবে, সেসব ‘বাণী’ শুনিয়ে এসেছেন। এবার থেকে চলতে হবে নতুন করে। বাণী নয়, ভাষণ নয়, নেতাদের এবার থেকে নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি বসতে হবে। তাঁদের প্রশ্ন করতে দিতে হবে। অভিযোগ ও চাহিদার কথা বলতে দিতে হবে। নেতাদের মন দিয়ে সেসব কথা শুনতে হবে। সেই অনুযায়ী দলকে চালনা করতে হবে। ওপর থেকে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।

অর্থাৎ বিজেপিতে নেতাদের একতরফা ভাষণবাজির দিন শেষ হতে চলেছে। প্রাধান্য পেতে চলেছে নয়া প্রজন্মের সঙ্গে সংলাপ শুরুর দিন।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণও আছে। ভুঁইফোড়ের মতো গজিয়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে দেশের যুবসমাজ বা জেন–জি যেভাবে দিকে দিকে প্রতিবাদী হয়ে উঠছে, বিজেপির কাছে তা অশনিসংকেত। শুধু বিজেপিই নয়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও (আরএসএস) নয়া প্রজন্মের এই অসন্তোষ টের পেয়ে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে সজাগ করে দিয়েছে। আরএসএস ও তার সঙ্গী সংগঠনগুলো, যাদের ‘সংঘ পরিবার’ মনে করা হয়, তাদের নেতারা সম্প্রতি অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপট্টনমে এক সমন্বয় বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। সংঘ নেতৃত্বের উপলব্ধি, তরুণদের মধ্যে হতাশা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর ধারাবাহিক প্রশ্ন ফাঁস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, উপযুক্ত চাকরির আকালসহ নানা কারণে তারা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। সরকারের ওপর তাদের আস্থা ও ভরসা টলে যাচ্ছে। সংঘ প্রধান মোহন ভাগবত এই উপলব্ধির কথা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়ে বলেছেন, সরকারকে যেমন যথাযথ পদক্ষেপ করতে হবে, দলকে তেমন পরিচালনা করতে হবে নতুনভাবে, নতুন ভাবনায়।

একদিকে সংলাপ, অন্যদিকে প্রতিরোধ: বিজেপির সাঁড়াশি নীতি

তবে শুধু ‘ভুল শোধরানো’ নয়, তেলাপোকাদের দল সিজেপির মোকাবিলায় বিজেপি নেতৃত্ব কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নৈরাজ্য বন্ধে প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিচ্ছে এবং সেটা প্রয়োগ করা হচ্ছে সিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে।

স্বাধীনতা দিবসের দিন, অর্থাৎ ১৫ আগস্ট থেকে সিজেপি দেশজুড়ে এক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ‘স্কুল ঠিক করো’। দলীয় নেতা–কর্মীরা রাজ্যে রাজ্যে সরকারি স্কুল পরিদর্শনে যাচ্ছেন। স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছেন কি না, অবকাঠামো কেমন, শিক্ষার পরিবেশ কেমন, পড়ুয়ারা কতটা সন্তুষ্ট—এসব তাঁরা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন, যাতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। সিজেপির এই কর্মসূচির কথা জানাজানি হওয়ার পর বহু জেন আলফা স্কুলপড়ুয়া নিজেরাই বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছে। বিজেপি এই কর্মসূচির বিরোধিতা করছে। কোথাও সিজেপি নেতাদের মারধর করা হয়েছে। তাঁদের গাড়িবহরে হামলা করা হয়েছে। স্কুলে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কোথাওবা অনধিকার চর্চার মামলা করা হয়েছে।

যেমন রাজস্থানের এক গ্রামে সিজেপির শীর্ষ নেতা আশুতোষ রাংকাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কলকাতার কোথাও তাঁদের মিলনায়তন ভাড়া দেওয়া হয়নি। কোথাও প্রতিনিধিদের মারধর করা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের লাতুর জেলায় সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকের বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। অভিযোগ, দিপকেসহ সিজেপি নেতারা ওই স্কুলে বিনা অনুমতিতে ঢুকেছিলেন। পড়ুয়াদের সঙ্গে স্কুলের হালহকিকত নিয়ে আলোচনা করেছেন। সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের কাজে বাধা দিয়েছেন।

বিজেপির ‘হার্ড লাইনাররা’, মানে কট্টরপন্থীরা মনে করছেন, সংলাপের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তার পাশাপাশি সিজেপিকে হতোদ্যম করাও জরুরি। তাদের এমন কিছু করতে দেওয়া ঠিক হবে না, যাতে সমাজে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। অরাজকতা দেখা যায়। এই কট্টরপন্থীদের কাছে ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রধান অভিজিৎ দিপকে ভারতের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে নিজ বাড়িতে। ৪ আগস্ট ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

নৈরাজ্য–তত্ত্ব ও রাহুল গান্ধীর দাদাগিরি

শুধু তেলাপোকারাই নয়, নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধেও বিজেপির শীর্ষ নেতারা তুলতে শুরু করেছেন। দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গত ২০ জুলাই সাহিল লোচাব নামে ১৯ বছরের এক তরুণ পুলিশের ছোড়া ‘পেলেট’ বা ছররা গুলিতে আহত হন। তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি ছররার কারণে লোপ পেয়েছে। সাহিলের অভিযোগ, দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে তিনি এফআইআর করতে পারছিলেন না। পুলিশ কোনো না কোনো উসিলায় তাঁর এফআইআর নিচ্ছিল না। ফিরিয়ে দিচ্ছিল। উপায়ান্তর না দেখে তিনি রাহুল গান্ধীর শরণাপন্ন হন।

সাহিল, তাঁর মা ও সাহিলের আইনজীবীকে নিয়ে রাহুল সম্প্রতি দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে ধরনায় বসেন। পুলিশের বড় কর্তাদের তিনি বলেন, দিল্লি পুলিশকে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআর নিতেই হবে। কোনো অজুহাতেই তা এড়ানো যাবে না। পুলিশ টালবাহানা করলে সাহিল, তাঁর মা ও আইনজীবীকে নিয়ে রাহুল থানার সামনে ধরনায় বসে যান। তাঁদের সঙ্গ দিতে একে একে চলে আসেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, জয়রাম রমেশ, সলমন খুরশিদ, পবন খেরাসহ বহু কংগ্রেস নেতা ও কর্মী। পার্লামেন্ট স্ট্রিটে বন্ধ হয়ে যায় গাড়ি চলাচল। কংগ্রেসিরা সরকারবিরোধী স্লোগানে তল্লাট মুখর করে তোলেন। সাড়ে ছয় ঘণ্টা ধরনার পর অবশেষে দিল্লি পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য হয়।

রাহুলের ওই প্রতিবাদী চরিত্র, থানার সামনে ধরনায় বসে যাওয়ার সমালোচনায় মুখর হন বিজেপির শীর্ষ নেতারা। সাবেক সভাপতি জে পি নাড্ডা বলেন, রাহুল নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে চাইছেন। এইভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনেও ধরনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। রবিশংকর প্রসাদ সংবাদ সম্মেলন করে রাহুলের ‘অগণতান্ত্রিক’ মনোভাবের নিন্দা করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রাহুলকে তাঁরা টলাতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে থেকে কংগ্রেসিদের বলপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে থেকে তা করা যায়নি, যেহেতু আইনত পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য। রাহুলের অনমনীয়তার দরুন এত দিন টালবাহানা করা দিল্লি পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য হয়। রাহুল তারপর বলেন, এটাই প্রতিবাদের জয়। ন্যায়ের জয়। পুলিশ এফআইআর নিতে বাধ্য। অথচ তা না নিয়ে তারাই আইন লঙ্ঘন করছিল।

বিজেপির ‘নৈরাজ্য–তত্ত্ব’ এবং মামলা দায়ের তেলাপোকাদের দমাতে পারছে না। এফআইআর করা সত্ত্বেও তারা ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি থেকে সরছে না। একইভাবে রাহুল গান্ধীও বন্ধ করছেন না ‘ছাত্র কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি। গত শনিবার মহারাষ্ট্রের পুনেয় রাহুলের সমাবেশে ছাত্র–ছাত্রীদের বিপুল ভিড় দেখা যায়। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব ও প্রশাসনের বাধা সত্ত্বেও ওই সমাবেশে জেন–জি ও জেন আলফার ভিড় ছিল চমকে দেওয়ার মতো। রাজ্যে রাজ্যে কংগ্রেস এই কর্মসূচির আয়োজন করছে।

রাহুলকে ঘিরে এই ভিড় বিজেপির বাড়তি চিন্তার কারণ। সরকারের প্রতি হতাশ ও ক্ষুব্ধ জেন–জি এবং জেন আলফার সমর্থন কংগ্রেসের দিকে যাতে ঢলে না পড়ে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর বিজেপি জোর দেওয়ার সেটাও একটা বড় কারণ।