কলকাতায় প্রভাবশালী তৃণমূল নেতাদের বাড়ি–অফিসে তল্লাশি ইডির, ভয় নেই বললেন মমতা

নরেন্দ্র মোদি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ফাইল ছবি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে কলকাতার তৃণমূল বিধায়ক দেবাশিস কুমারের বাসভবন ও অফিসে আয়কর দপ্তরের তল্লাশি চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফা নির্বাচন ২৩ এপ্রিল। তবে ওই দিন নির্বাচন রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় নয়, উত্তরবঙ্গে।

আজ শুক্রবার সকাল ছয়টা নাগাদ আয়কর বিভাগ দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী আসনের তৃণমূল বিধায়ক দেবাশিস কুমারের বাসভবন ও অফিসে তল্লাশি চালিয়েছে। মনোহরপুকুর রোডে তাঁর বাড়ি ও নির্বাচনী কার্যালয়ে একযোগে তল্লাশি শুরু হয়েছে।

তবে শুধু তৃণমূলের নেতা–কর্মী নন, দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরের প্রার্থী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম যিনি প্রস্তাব করেছিলেন, সেই মিরাজ শাহের বাড়িতেও দুপুরের দিকে তল্লাশি চালাতে শুরু করেছেন আয়কর দপ্তরের কর্মকর্তারা। ভারতে প্রার্থীরও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় অন্য কাউকে নাম প্রস্তাব করতে হয়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় সব ধর্ম যে সমান—এই বার্তা দিতে চার ধর্মের চার ব্যক্তিকে প্রস্তাবক করেছিলেন। এই চার প্রস্তাবকের অন্যতম মিরাজ শাহের বাড়িতে আজ শুক্রবার তল্লাশি হয়। দেবাশিস কুমারের বাড়িতে তল্লাশি চালানোর ফাঁকে, সেখানে পৌঁছে যান আয়কর দপ্তরের কর্তারা।

ইডির অভিযানের পর আজ শুক্রবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, ‘বেছে বেছে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের বাড়িতে তল্লাশি চলছে। কতজন বিজেপির নেতার বাড়িতে তল্লাশি হয়েছে, তা আমি জানতে চাই।’

মমতা আরও অভিযোগ করেন, ‘বিজেপি যে অবস্থায় গিয়েছে, তাতে ওরা শেষ মরণকামড় দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আমাদের দলীয় কার্যালয়ে তল্লাশি করতে পারে। ওদের বিষদাঁত উপড়ে ফেলতে হবে, এদের কোনো মূল্য নেই। ভোটের পরে সব শূন্য, আর ভোটের আগে ইডি, সিবিআই এসব দেখাচ্ছে। ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি তো ভয় পাচ্ছি না, আপনারা কেন পাবেন।’

মমতা অভিযোগ করেন, বিজেপি জালিয়াতি করে ভোট জেতার সব রকমের চেষ্টা চালাবে।

কলকাতায় তৃণমূলের একেবারে প্রথম সারির নেতা দেবাশিস কুমার। দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী, দেশপ্রিয় পার্ক, মনোহর পুকুর, হিন্দুস্তান পার্ক, গড়িয়াহাট থেকে বালিগঞ্জ—এসব এলাকা তাঁর নিয়ন্ত্রণে। এই অঞ্চলটি পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতার অন্যতম অভিজাত এলাকা। সেখানে বিপুল পরিমাণে দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে।

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) সম্প্রতি অমিত গাঙ্গুলি নামে এক ব্যবসায়ীর বিভিন্ন সংস্থায় তল্লাশি চালিয়েছিল। সেই তল্লাশি সূত্র ধরেই আজ শুক্রবার সকালে দেবাশিস কুমারের বাসভবন ও অফিসে অভিযান চালায় কেন্দ্রীয় আয়কর দপ্তর। তাদের মধ্যে কী ধরনের যোগাযোগ—সেটাই খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কলকাতার সংবাদমাধ্যম।

জমি জালিয়াতিসংক্রান্ত একটি মামলায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট সম্প্রতি দেবাশিস কুমারকে একাধিকবার তলব করেছিল। এপ্রিল মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে তিন দিন সল্টলেকে ইডির কার্যালয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছিল। তিনি কেন্দ্রীয় সংস্থাটির সামনে হাজিরাও দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে দেবাশিস কুমারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, যা বলার দল বলবে।

এই তল্লাশিকে কেন্দ্র করে দেবাশিসের বাসভবনের সামনে আজ শুক্রবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তৃণমূল কর্মীরা কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

দেবাশিস কুমারের বাড়িতে তল্লাশি শুরুর কিছুক্ষণ পরে দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ অপর এক ব্যবসায়ী তথা নেতা কুমার সাহার বাড়িতেও তল্লাশি চালাতে শুরু করে আয়কর দপ্তর। কলকাতার প্রচার মাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, কুমার সাহা তৃণমূল নেতা দেবাশিস কুমারের ঘনিষ্ঠ।

তৃণমূল নেতাদের গ্রেপ্তার নিয়ে গতকালই সাবধান করেছিলেন মমতা। গতকাল বৃহস্পতিবারই উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারে এক জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তাঁর দলের নেতা–কর্মীদের গ্রেপ্তার করার আশঙ্কা রয়েছে।

সবাইকে সাবধান করে মমতা বলেন, ‘অনেককে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। কাকে কখন গ্রেপ্তার করা হবে, তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ দক্ষিণ কলকাতা আসনে বিজেপি সাবেক সাংবাদিক দিল্লির স্বপন দাশগুপ্তকে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

নির্বাচনের ঠিক সাত দিন আগে তৃণমূলের নেতা ও প্রার্থীদের বাড়ি ও অফিসে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও আয়কর সংস্থার এই ধরনের তল্লাশি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মইদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এর ফলে তৃণমূল কংগ্রেস “ভিকটিম হুড”-এর কার্ড খেলবে। অর্থাৎ বলবে, তাদের ওপরে জোরজবরদস্তি করা হচ্ছে। নির্বাচনে হারাতে অন্যায়ভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো বলবেন, তুমি যদি আগে জানতে কেউ অন্যায় করেছে, তবে তিনি তাঁকে নির্বাচনে প্রার্থী করতেন না। এ কথা তিনি ২০২১ সালের নির্বাচনেও বলেছেন।’

তৃণমূল নেতা–কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, এতে দলের নেতা–কর্মীদের মনোবল কমবে না, বরং বাড়বে। আশা রায় নামে দক্ষিণ কলকাতার এক তৃণমূল কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে একটা ছন্নছাড়া ভাব ছিল নির্বাচনের সাত দিন আগে। এখন যেহেতু সংগঠিত আক্রমণ শুরু হয়েছে, আমরা হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করব। দল নির্বাচনে আরও ভালো ফল করবে, আরও শক্তিশালী হবে।’