পশ্চিমবঙ্গে বিতর্কিত এসআইআর-ই কি তাহলে তৃণমূলকে হারিয়ে দিল, কী বলছে তথ্য-উপাত্ত

  • পরিকল্পিতভাবেই ভোটার তালিকা কাটছাঁটের কাজটি করা হয়েছে। আগের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিগুলোয় এসআইআরের বড় প্রভাব পড়েছে।

  • ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনায় ২৬টি আসনের মধ্যে ২৩ আসনে জয় পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। এসআইআরে এবার সে ফল পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

  • মোট ১৫০টি আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা সে আসনে জয়ী-পরাজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়ে বেশি।

নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় অনেক সময় খুব সামান্য ভোটের ব্যবধানেও ফল নির্ধারিত হয়। সেখানে প্রতিটি ভোটই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এবার তামিলনাড়ুতে একটি আসনের ফল নির্ধারিত হয়েছে মাত্র এক ভোটে। একইভাবে রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশেও অতীতে লোকসভা নির্বাচনে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার ঘটনা রয়েছে। এতে বোঝা যায়, প্রতিটি ভোটেরই মূল্য আছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিতর্কিত ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল। এ প্রক্রিয়ার পরিধি ছিল বিশাল। এতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ৯১ লাখ নাম। এর মধ্যে খসড়া সংশোধনের সময় এএসডিডি বা অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, বাতিল ও বাস্তুচ্যুত এই চার শ্রেণিতে ৫৮ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’(ইউএ) বা বিচারিক পর্যালোচনার পর আরও ২৭ লাখ ভোটারকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নতুন ১ লাখ ৮৮ হাজার ভোটার যুক্ত হয়েছে। দুটি তালিকার তথ্য মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, ভোটার–সংক্রান্ত এই পুনর্বিবেচনা কার্যক্রম নির্বাচনের গাণিতিক সমীকরণ নির্ধারণ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা প্রভাব পড়েছে।

জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকায় বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়া আসনগুলোর ৩০ শতাংশের অবস্থানই কলকাতার আশপাশের দুই জেলায়। এই দুটি জেলা হলো উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা। উত্তর চব্বিশ পরগনায় এ ধরনের ২৬টি আসনের মধ্যে ২০২১ সালের নির্বাচনে ২৩ আসনে জয় পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তবে এবার সে ফল পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকায় বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়া আসনগুলোর ৩০ শতাংশের অবস্থানই কলকাতার আশপাশের দুই জেলায়। এই দুটি জেলা হলো উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা। উত্তর চব্বিশ পরগনায় এ ধরনের ২৬টি আসনের মধ্যে ২০২১ সালের নির্বাচনে ২৩ আসনে জয় পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তবে এবার সে ফল পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

এবারের নির্বাচনে এই ২৬ আসনের মধ্যে বিজেপি ২১ আসনে জয় পেয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলায় এ ধরনের ১৯টি আসনের মধ্যে ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস সব কটি আসনে জয়ী হয়েছিল। এবার ভোটার তালিকা সংশোধনের পর বিজেপি সেখানে তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। নির্বাচনে ওই আসনগুলোর মধ্যে ১০টিতে জয় পেয়েছে তারা।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনায় দলের এগিয়ে থাকার খবর শোনার পর ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির সমর্থকেরা উল্লাস শুরু করেন। ৪ মে ২০২৬
ছবি: এএফপি

এর বাইরে আরও কয়েকটি জেলায় এই পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে মুসলিম-অধ্যুষিত ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকাগুলোয় প্রভাব পড়েছে। মুর্শিদাবাদে এবার জয়ের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি ছিল এমন আসনের সংখ্যা ১৫। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১৩টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। এবার সেই সংখ্যা ৬-এ নেমে এসেছে। এখানে বিজেপি ৭টি আসন এবং কংগ্রেস ২টি আসনে জয়ী হয়েছে।

পূর্ব বর্ধমান জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে থাকা এ ধরনের ১৩টি আসনের মধ্যে এবার তারা ১১টিতেই হেরেছে। সেই আসনগুলো এবার বিজেপির দখলে গেছে।

হাওড়া ও হুগলি জেলায়ও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এই দুই জেলায় জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি হওয়া আসনের সংখ্যা ২২টি। ২০২১ সালে এর সব কটিই তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে ছিল। সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপি এরই মধ্যে ১৪টি আসন জিতে নিয়েছে।

শহরাঞ্চলও এই বিস্তৃত পরিবর্তনের ঢেউ থেকে বাদ যায়নি।

আদালতের পর্যবেক্ষণ কী ছিল

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এসআইআর–সংক্রান্ত শুনানির সময় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছিলেন, ‘যদি ১০ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে না পারেন এবং জয়ী হওয়ার ব্যবধান ১০ শতাংশের বেশি হয়…তাহলে কীই–বা হবে? এখন ধরুন, ব্যবধান ২ শতাংশ আর তালিকাভুক্ত ভোটারদের মধ্যে ১৫ শতাংশ ভোটই দিতে পারলেন না, তাহলে কিছু হয়ে থাকতে পারে…আমরা এখনই কোনো মত দিচ্ছি না, কিন্তু বিষয়টিকে অবশ্যই আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।’

আসনভিত্তিক তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল না। এর রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। কারণ, অনেক আসনেই বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়ে বেশি ছিল।

পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ছবি: রয়টার্স

রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণে এসআইআরের বড় ভূমিকা ছিল কি না, তা বুঝতে হলে সেই সব আসনের দিকে তাকাতে হবে, যেখানে জয়ী-পরাজিত প্রার্থীর ব্যবধান মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে কম ছিল। অর্থাৎ, এএসডিডি ও ইউএ—এই দুই ধরনের বাদ পড়া ভোটার মিলিয়ে যে সংখ্যা দাঁড়ায়, তা অনেক ক্ষেত্রেই জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গেছে।

এএসডিডি শ্রেণিতে এবং ইউএ বা আইনি প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা একত্র করলে দেখা যায়, ১৫০টি আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা সে আসনে জয়ী-পরাজিত প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় মোট আসন ২৯৪টি। অর্থাৎ জয়ের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকায় বেশি মানুষ বাদ পড়েছে—এমন আসনের সংখ্যা বিধানসভার মোট আসনের অর্ধেকেরও বেশি।

পশ্চিম বর্ধমান জেলায় বিজেপি ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। সেখানে জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি হওয়া আটটি আসনের সব কটিতেই দলটি জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি আসন আগে তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে ছিল।

এমনকি উত্তর কলকাতা ও দক্ষিণ কলকাতার কিছু এলাকাতেও বিজেপি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল এ ধরনের ১১টি আসনে জিতেছিল। এবার এর মধ্য থেকে ছয়টি আসন বিজেপির দখলে চলে গেছে। এসব আসনের ওপর ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়ার প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে ভবানীপুর আসনও আছে। সেখানে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন।

২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ফল বদলে যাওয়া ১৩৭টি আসন বিশ্লেষণ করে দেখা যায় এর মধ্যে ৮৭টি আসনের ফলের ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা সংশোধনের সরাসরি প্রভাব থাকতে পারে। যদি এসআইআর না হতো, তাহলে এই ৮৭টি আসন হয়তো আগের মতোই ২০২১ সালের বিজয়ী দলের কাছেই থাকতে পারত।

এলাকাভিত্তিক বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ভোটার তালিকা কাটছাঁটের কাজটি পরিকল্পিতভাবেই করা হয়েছে। আগের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটিগুলোয় এ সংশোধনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে। ভোটার তালিকা কাটছাঁটের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি ১৫০টি গুরুত্বপূর্ণ আসনের মধ্যে ১০০টিতে জয় ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে।

সাতগাছিয়া আসনে বিজেপি প্রার্থীর জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৪০১ ভোট। কিন্তু সেখানে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। এএসডিডি তালিকায় ১৭ হাজার ৬৬৯ জনের নাম বাদ যায় এবং অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হন আরও ৮ হাজার ৭৮৫ জন ইউএ ভোটার। সব মিলিয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ২৬ হাজারেরও বেশি।

একইভাবে রাজারহাট নিউ টাউন আসনে দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র ৩১৬ ভোট, অথচ সেখানে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজারেরও বেশি।

আবার রাইনা আসনে বিজেপি এগিয়ে ছিল ৮৩৪ ভোটে, কিন্তু সেখানে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ২৩ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

সবচেয়ে বেশি বাদ পড়া ভোটারের এলাকাগুলো কি বিজেপির পক্ষে গেছে

শুধু যদি এএসডিডি শ্রেণিতে বাদ পড়া ভোটারদের হিসাবে ধরা হয়, তাহলেও এর প্রভাব বিশাল। শুধু এএসডিডি শ্রেণিতে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার চেয়ে জয়ের ব্যবধান বেশি ছিল—এমন আসনের সংখ্যা ১১০।

এসব আসনেও বিজেপি তুলনামূলক সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে। তারা ৭২টি আসন জিতেছে, যা তৃণমূল কংগ্রেসের জেতা ৩৬টি আসনের ঠিক দ্বিগুণ। কংগ্রেস জিতেছে ২টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই ১১০টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ১০২টি, আর বিজেপি জিতেছিল মাত্র ৮টি আসন।

এএসডিডি বাদ পড়া ভোটারদের বড় অংশ সেই সব আসনেই কেন্দ্রীভূত ছিল, যেগুলো আগে তৃণমূল জিতেছিল। আর যেসব এলাকায় ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে তৃণমূলের আগের শক্ত অবস্থান কার্যত ভেঙে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা বিজয় উদ্‌যাপন করছেন। কলকাতা, ৪ মে ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা—এই দুই জেলা মিলে এএসডিডি বাদ পড়া ভোটারের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসন। এখানেই চিত্রটা অনেকটা স্পষ্ট, আসলে এসআইআরের ফল কী হয়েছিল।

উত্তর চব্বিশ পরগনায় ২০২১ সালে তৃণমূল ১৯টির মধ্যে ১৮টি আসনে জয় পেয়ে প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য গড়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। বিজেপি সেখানে ১৫টি আসন দখল করে নেয় এবং তৃণমূলের আসনসংখ্যা নেমে আসে মাত্র ৪টিতে।

একইভাবে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় ২০২১ সালে তৃণমূল ১৬-০ ব্যবধানে সব আসনে জয়ী হয়েছিল। কিন্তু এবার ভোটার তালিকা সংশোধনের পর বিজেপি উল্লেখজনক অগ্রগতি করে এবং এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর ৮টি দখল করতে সক্ষম হয়।

হাওড়া ও হুগলি জেলায় আগের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস যথাক্রমে ১২টি এবং ৮টি প্রভাবিত আসনের সব কটিতেই জয় পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে পরিস্থিতি বদলে যায়। হাওড়ায় ওই ধরনের আসনের মধ্যে বিজেপি ৬টিতে জয় পায় এবং হুগলিতে প্রায় পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করে ৭টি আসন দখল করে নেয়।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা মুর্শিদাবাদে জয়ের ব্যবধানের চেয়ে ভোটার তালিকায় বাদ পড়াদের সংখ্যা বেশি হওয়া ১০টি আসনের মধ্যে তৃণমূল ২টিতে, বিজেপি ৬টিতে এবং কংগ্রেস বাকি ২টি আসনে জয়ী হয়েছে। অথচ ২০২১ সালে তৃণমূল ৯টি আসনে জয়ী হয়েছিল।

শহরকেন্দ্রিক এলাকাগুলোয়ও এসআইআরের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। পশ্চিম বর্ধমানে এ ধরনের ৬টি আসনের সব কটিতে বিজেপি জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে ৫টি আসন আগে তৃণমূলের দখলে ছিল।

একইভাবে উত্তর কলকাতায় বিজেপি তৃণমূলের পূর্ববর্তী একচেটিয়া অবস্থান ভেঙে চারটি আসন দখল করে নিয়েছে।

ভোটার তালিকা সংশোধন না করলে কী হতো

এসআইআরের প্রকৃত গুরুত্ব ও প্রভাব বুঝতে হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাল্পনিক প্রশ্ন তুলতে হয়। সেটি হলো, যদি ভোটার তালিকায় এত বড় আকারের সংশোধনপ্রক্রিয়া কখনোই না চালানো হতো, তাহলে ২০২৬ সালের নির্বাচনী চিত্র কেমন হতো?

নতুন যুক্ত হওয়া বা বাদ পড়া ভোটারদের কে কাকে ভোট দিয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা অসম্ভব। তাই, এই বিশ্লেষণকে একটি গাণিতিক ‘স্ট্রেস টেস্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এখানে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া নতুন ভোটার, এএসডিডি শ্রেণিতে বাদ পড়া ভোটার এবং ইউএ আইনিপ্রক্রিয়ায় বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যাকে জয়ের ব্যবধানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কী দেখা গেল তাতে?

প্রথম সম্ভাব্য পরিস্থিতি

এ ক্ষেত্রে ধরা হয়েছে, প্রতিজন বাদ পড়া ভোটার নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারীকে এবং নতুন যোগ হওয়া প্রতিজন ভোটার বিজয়ী প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।

২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ফল বদলে যাওয়া ১৩৭টি আসন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে ৮৭টি আসনের ফলের ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা সংশোধনের সরাসরি প্রভাব থাকতে পারে। অর্থাৎ যদি এসআইআর না হতো, তাহলে এই ৮৭টি আসন হয়তো আগের মতোই ২০২১ সালের বিজয়ী দলের কাছেই থাকতে পারত।

এই ৮৭টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গাণিতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ আসনের সব কটিই ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছিল। তবে ২০২৬ সালে বিজেপি এর মধ্য থেকে ৮৪টি আসন দখল করে নেয় এবং কংগ্রেস জেতে ২টি আসন।

সুতরাং বলা যায়, এসআইআর না হলে তাত্ত্বিকভাবে তৃণমূল এই ৮৭টি আসন ধরে রাখতে পারত। যদি তা ঘটত, তাহলে বিধানসভার চূড়ান্ত আসনচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। বিজেপির মোট আসন বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যজনকভাবে কমে যেতে পারত।

দ্বিতীয় সম্ভাব্য পরিস্থিতি

দ্বিতীয় বিশ্লেষণে ‘নো-এসআইআর কাউন্টার ফ্যাকচুয়াল মডেল’ ব্যবহার করা হয়েছে।

এখানে ধরে নেওয়া হয়নি যে সব বাদ পড়া ভোটার বিজয়ীর বিপক্ষে ভোট দিতেন; বরং প্রতিটি আসনের ক্ষেত্রে ২০২১ সালের ভোটের ধরনকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।

এই মডেল তিনটি ধাপে কাজ করেছে-

প্রথমত, বাদ পড়া সব ভোটারকে আবার ভোটার তালিকায় যোগ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এসব ভোটারকে ২০২১ সালের দলভিত্তিক ভোটের অনুপাতে বিভিন্ন দলের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। অর্থাৎ ধরে নেওয়া হয়েছে, বাদ পড়া ভোটাররা আগের নির্বাচনের মতোই ভোট দিতেন।

তৃতীয়ত, এসআইআর চলাকালে ভোটার তালিকায় নতুন যুক্ত হওয়া ভোটারদের ২০২৬ সালের দলভিত্তিক ভোটের অনুপাতে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব আলাদা করে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন
ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

এটিও ভোটারদের প্রকৃত আচরণ নিয়ে নিশ্চিত দাবি নয়। এটি একটি আসনভিত্তিক স্ট্রেস টেস্ট। এর মূল প্রশ্ন ছিল-

বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা কি যথেষ্ট বড় ছিল? এবং তা কি রাজনৈতিকভাবে এমনভাবে বণ্টিত হয়েছিল যে নির্বাচনের ফল বদলাতে পারত?

এই ‘নো-এসআইআর’ মডেল অনুযায়ী, ১১টি আসনের ফল বদলে যেতে দেখা গেছে এবং সব কটিই তৃণমূলের দিকে গেছে।

ফলে এ মডেল অনুযায়ী বিজেপির আসনসংখ্যা ২০৭ থেকে কমে ১৯৮-এ নেমে আসে, তৃণমূলের আসনসংখ্যা ৮০ থেকে বেড়ে ৯১ হয় এবং কংগ্রেসের আসন ২ থেকে কমে শূন্যে নেমে আসে। মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনকে বিশ্লেষণে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণের সময় একটি আসনের গণনা শেষ না হওয়ায় সেটিকে বাদ রাখা হয়েছে।

নির্বাচনের ফল কি পুরোপুরি ভিন্ন হতে পারত

এসআইআর বা ভোটার তালিকা নিবিড় সংশোধনের কারণে সামগ্রিক ফলাফল যে পুরোপুরি উল্টে গেছে, তা নয়। দ্য ওয়্যারের ‘নো-এসআইআর’ বিশ্লেষণেও বিজেপিই এগিয়ে আছে। তবে খুব হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কিছু আসনে এই ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রভাব থাকতে পারে।

তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, এএসডিডি শ্রেণিতে ভোটাররা বাদ পড়ার কারণে কম ব্যবধানের আসনগুলোয় বিজেপি তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেয়েছে। অন্যদিকে ইউএ বা আইনি প্রক্রিয়ায় ভোটারদের বাদ পড়ার বিষয়টি সংখ্যালঘু-প্রধান আসনগুলোয় বেশি প্রভাব ফেলেছে।

যে রাজ্যে বহু আসনের ফল অল্প ভোটের ব্যবধানে নির্ধারিত হয়, সেখানে এসআইআর শুধু এর পরিসংখ্যানগত প্রভাবের কারণে নিজেই একটি বড় নির্বাচনী ফ্যাক্টরে পরিণত হয়েছিল।