পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয় দফায় এসআইআরে বাদ পড়া ভোটারদের ৬৫ শতাংশই মুসলিম
পশ্চিমবঙ্গে চূড়ান্ত তালিকায় ৯১ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদে, যেখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ মুসলিম।
৩০ শতাংশ বা ২০ শতাংশ মুসলিম ভোটার থাকা ১১২ আসনের ১০৬টি গতবার জিতেছিল তৃণমূল।
রোগী দেখে ডাক্তারদের নিদান দেওয়ার ঢংয়ে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শুরু হওয়ার আগে শুভেন্দু অধিকারীর মতো বঙ্গ-বিজেপির মুরব্বিরা বলেছিলেন, ১ কোটি ২০ লাখের মতো ‘বেনোজল’ বের করে পশ্চিমবঙ্গের ভোট হবে। সেই বেনোজলে কারা থাকবেন, তা জানাতেও তাঁরা দ্বিধা করেননি। রাখঢাক না রেখেই জানিয়েছিলেন, বাদ দেওয়া হবে ‘বাংলাদেশি সব ঘুষপেটিয়া’ ও রোহিঙ্গাদের।
রাজ্যের প্রথম দফার ভোট গ্রহণের আগে দফায় দফায় বাতিল ও ছাঁটাইয়ের সংখ্যা জানানোর পর চূড়ান্ত তালিকায় দেখা যাচ্ছে, ৯১ লাখ মানুষ এবার ভোট দিতে পারছেন না। এঁরা সবাই মাস কয়েক আগে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। এবার নতুন করে ভোটার হয়েছেন মাত্র ১ লাখ ৯০ হাজারের মতো।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবটাই তুলে দেওয়া যাক। ২০২৪ সালে মোট ভোটার ছিলেন ৭ কোটি ৬৬ লাখ ১০ হাজার ৬ জন। নিবিড় সংশোধন শুরু হওয়ার পর প্রথম ধাক্কায় বাদ যায় ৫৮ লাখ ২০ হাজার ৮৯৯ জনের নাম।
কমিশন দাবি করছে, এঁদের কেউ মৃত, কেউ অন্যত্র চলে গেছেন, কারও নাম একাধিক স্থানে ভোটার হিসেবে রয়েছে, কাউকে তাঁদের ঠিকানায় পাওয়াই যায়নি। মানে ভুয়া ভোটার।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফার যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়, তাতে বাদ যায় আরও ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৫৩ জনের নাম। এরপর তৃতীয় ধাপে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যানসি’ বা যুক্তিপূর্ণ অসংগতি লক্ষ করে কমিশন বাদ দেয় আরও ৬১ লাখ। প্রবল বিতর্ক শুরু হয় সেই থেকে।
নামের ভুল বানান ও পদবির কারণে বাদ বেশি
নির্বাচন কমিশন যুক্তিপূর্ণ অসংগতি কাদের ক্ষেত্রে দেখল? সেটা বড় তাজ্জব বিষয়। অধিকাংশ আপত্তি নাম ও পদবির বানানের ক্ষেত্রে। যেমন কারও পদবি বন্দ্যোপাধ্যায় বা মুখোপাধ্যায়, পুরোনো ভোটার তালিকায় লেখা রয়েছে ব্যানার্জি বা মুখার্জি। কমিশনের এতে আপত্তি।
কোনো নারী বিয়ের পর পদবি বদলেছেন, সেখানেও কমিশন অসংগতি দেখছে। কোনো মিজানুরের নামের বানান এক জায়গায় ‘জে’ দিয়ে তো অন্য কোনো নথিতে ‘জেড’। রহমানের বানান এক নথিকে একরকম, অন্য নথিতে একটা ‘এ’ বেশি বা কম।
কমিশন জানিয়ে দেয়, তৃতীয় দফায় বাদ যাওয়া ভোটারদের আইনি প্রক্রিয়ায় (অ্যাডজুডিকেশন) যেতে হবে। এ নিয়ে মামলা করার পর সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেন, অ্যাডজুডিকেশনে যাঁরা সন্দেহের নিরসন ঘটাতে পারবেন না, তাঁদের যেতে হবে বিচার বিভাগীয় ট্রাইব্যুনালে। আইনি প্রক্রিয়ার পর শেষমেশ দেখা গেল, ৬১ লাখের মধ্যে ৩২ লাখ ৬৮ হাজার ১১৯ জন বৈধ, অবৈধের সংখ্যা ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৩৯৩।
অর্থাৎ ২০২৪ সালে যত মানুষ ভোট দিতে পেরেছেন, বছর দেড়েকের মধ্যে তাঁদের প্রায় ৯১ লাখ গায়েব। ভোজবাজির মতো উবে যাওয়া এই মানুষদের মধ্যে মৃত আছেন, রাজ্য ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষ আছেন, একাধিক জায়গায় নাম থাকা মানুষ আছেন এবং আছেন ‘অবৈধ’ মানুষজন। এই ‘অবৈধরা’ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে ভোটার তালিকায় আবার নাম তোলানোর অধিকারী থাকছেন। তবে এবারের ভোটে তাঁরা তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না।
বড় বিতর্ক ও সমালোচনা এ নিয়েই। এত তাড়াহুড়া করে নির্বাচন কমিশন এসআইআর না করালে, আরও সময় নিয়ে কাজটা হাতে নিলে এই ২৭ লাখ মানুষকে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়তে হতো না। আইন বলে, দোষীর ছাড়া পাওয়া ঠিক নয়। কিন্তু দেখতে হবে, একজনও নিরপরাধ যেন শাস্তি না পান।
ভোটের পর যদি দেখা যায় ওই ‘অবৈধ’ ২৭ লাখের মধ্যে ৫–১০ হাজার, কিংবা ৫–১০ লাখ মানুষ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ‘বৈধ’ বিবেচিত হন, তা হলে তাঁদের সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের দায় নিশ্চিতভাবে বর্তাবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। কিন্তু সেই অপরাধে কে শাস্তি দেবে কমিশনকে?
বাংলা দখলে বিজেপির দোসর এবার নির্বাচন কমিশন। বিরোধীদের এই অভিযোগ আর কিছু না হোক, নানা কারণে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার যার জবাবদিহিতে ডাহা ফেল।
ইসি বিজেপির হয়ে কাজ করছে: মমতার অভিযোগ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই বলে আসছেন, ভোটে হারাতে না পেরে বিজেপি এবার কমিশনকে দিয়ে গোড়ায় কোপ মারতে চাইছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে, সেই সন্দেহ ও অভিযোগ নিতান্ত অমূলক নয়। কেননা ৬১ লাখ অ্যাডজুডিকেশনের যে তালিকা প্রকাশিত, দেখা যাচ্ছে তার ৬৫ শতাংশই মুসলিম।
এসআইআরের পর যে ১২ শতাংশ ভোটার ‘অবৈধ’ ঘোষিত, তার ৫ শতাংশই মুসলিম! মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুরে হিসাবটা চোখে পড়ার মতো। সবচেয়ে বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে মুর্শিদাবাদ জেলায়, যেখানকার জনসংখ্যার প্রায় ৬৭ শতাংশ মুসলিম।
এই জেলার সমশেরগঞ্জে বাদ গেছে ৭৪ হাজার ৭৭৫ জনের নাম। লালগোলা, ভগবানগোলা, রঘুনাথগঞ্জ, ফারাক্কা, সুতি, জঙ্গিপুরের মতো আসনে বাদ গেছে সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার থেকে সর্বনিম্ন ৩৬ হাজার ভোটারের নাম। কলকাতার ‘মিনি লক্ষ্ণৌ’ বলে পরিচিত মেটিয়াবুরুজে বাদ গেছে ৪০ হাজার। কলকাতার ভবানীপুর আসনের ওপর নজর সারা দেশের।
গত ভোটে নন্দীগ্রামে দাঁড়ানো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেড় হাজার ভোটে হারানো (মামলা এখনো বিচারাধীন) বিজেপির শীর্ষ নেতা শুভেন্দু অধিকারী এবার ভবানীপুরে মুখ্যমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জার। অমিত শাহ ইতিমধ্যে সেখানে রোড শো করেছেন। নরেন্দ্র মোদিও আসবেন। সেখানে বাদ গেছে ৫১ হাজার ভোটারের নাম।
সর্বত্র অধিকাংশ মুসলিম, যাঁদের প্রশ্নাতীত আনুগত্য তৃণমূলের প্রতি। আনুগত্য কতখানি, তার প্রমাণ দিয়েছে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট। ৩০ শতাংশ বা তার বেশি মুসলিম ভোট থাকা ৮৯টি আসনের মধ্যে সেবার তৃণমূল পেয়েছিল ৮৭টি। ২০ শতাংশ বা তার বেশি মুসলিম ভোটার থাকা আসন রয়েছে ১১২টি। গতবার সেগুলোর মধ্যে ১০৬ আসন জিতেছিল তৃণমূল।
মমতা সরাসরি বলেছেন, বিজেপির নির্দেশে নির্বাচন কমিশন বেছে বেছে তাই কোপ মেরেছে ওই সব আসনে। বিবেচনাধীন তালিকা থেকে ৬৫ শতাংশ মুসলিমের নাম বাদ যাওয়ার পর ক্ষুব্ধ মমতা তাই বলতে ছাড়েননি, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, চব্বিশ পরগনা, উত্তর দিনাজপুরের মতো ভবানীপুরও পুরো বরবাদ করে দেওয়া হয়েছে। ভোট ডাকাতি করে বিজেপি চাইছে রাজ্য দখল করতে।
কোপ মতুয়াদের ওপরও
মুসলিম ভোটে কোপ পড়া বিজেপির উল্লাসের কারণ হলে চিন্তার ছাপ মতুয়া শিবির নিয়ে। ওপার বাংলা থেকে চলে আসা লাখ লাখ হিন্দু, যাঁদের অধিকাংশের পরিচয় মতুয়া, যাঁদের গুরু হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুর, বাংলাদেশ সফরে গিয়ে গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে যাঁদের মন্দিরে মাথা ঠেকিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং এত বছর ধরে যাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা তিনি বলে এলেও আজও দেননি, তাঁদের নাম হু হু করে কাটা গেছে।
সিএএ সত্ত্বেও নাগরিকত্বের আশায় বসে থাকা মতুয়া সম্প্রদায়ের হিন্দুরা নাম বাদ যাওয়ায় এবার বিজেপি থেকে মুখ ফেরাবে কি না, সেই আলোচনা শুরু হয়েছে জোরেশোরে। নদীয়ার কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, উত্তর চব্বিশ পরগনার গাইঘাটা, বনগাঁ, ঠাকুরনগরের বিধানসভা আসনগুলো বিজেপির কপালের ভাঁজ গাঢ় করেছে।
এবারের লড়াই যতটা তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির, ততটাই ক্ষুরধার বাংলার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের। এই প্রথম ভোটের প্রতিপক্ষ হয়ে গেছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। স্বাধীন ভারতে কোনো দিন এই ভূমিকায় নির্বাচন কমিশনকে দেখা যায়নি। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হলেও কমিশন জানাল না কতজন ‘বাংলাদেশি ঘুষপেটিয়া’ ও কত ‘রোহিঙ্গা’র নাম তারা ছেঁটে দিল।