অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অভয়ার মরদেহ দ্রুত দাহের অভিযোগ, সাবেক তৃণমূল বিধায়ক রিমান্ডে

পশ্চিমবঙ্গের আর জি কর হাসপাতালের নারী চিকিৎসক ‘অভয়ার’ (ছদ্মনাম) ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কলকাতায় প্রতিবাদ সমাবেশপ্রথম আলো ফাইল ছবি

কলকাতার আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নারী চিকিৎসক ‘অভয়ার’ (ছদ্মনাম) ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দ্বিতীয় দফার তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ঘটনার পর ওই নারী চিকিৎসকের মরদেহ দ্রুত দাহ করার জন্য অস্ত্রের ভয় দেখানো হয়েছিল। আর এই দাহের সময় উপস্থিত ছিলেন পানিহাটির সাবেক তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষসহ স্থানীয় তৃণমূলের কয়েকজন নেতা।

মরদেহ দ্রুত সৎকারের ব্যবস্থা করার অভিযোগে করা মামলায় নির্মল ঘোষকে আরও দুই দিনের পুলিশ হেফাজতে রাখার অনুমতি দিয়েছেন ব্যারাকপুর আদালত। গতকাল শনিবার মামলাটি আদালতে উঠলে পুলিশ তদন্তের স্বার্থে তাঁকে আরও দুই দিন হেফাজতে রাখার আবেদন করে। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। আগামীকাল সোমবার তাঁকে আবার আদালতে তোলা হবে।

সরকারি কৌঁসুলি যদুনাথ ঘোষ আদালতকে বলেন, অভয়ার বাবা গোপন জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, তাঁর মেয়ের মরদেহ সৎকারের সময় নির্মল ঘোষ অস্ত্র দেখিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন পানিহাটি শ্মশানে অভয়ার মরদেহের আগে আরও দুটি মরদেহ সৎকারের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু নির্মল ঘোষের হুমকির কারণে অন্য দুটি মরদেহের আগে অভয়ার মরদেহ দাহ করা হয়।

পুলিশের অভিযোগ, নির্মল ঘোষ এবং তৃণমূলের আরও দুই নেতা অভয়ার বাবা-মাকে মেয়ের মরদেহ শেষবার দেখার সুযোগ দেননি। প্রচলিত হিন্দুধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ না করেই দ্রুত দাহ করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অভয়ার মরদেহকে ‘ভিআইপি’ মর্যাদা দিয়ে দ্রুত পানিহাটি শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

অভয়ার সৎকারে অনিয়মের অভিযোগে নির্মল ঘোষসহ তিন তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে মামলা করেন তাঁর বাবা। পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেট তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর করে। এরপর ওডিশায় আত্মগোপনে থাকা নির্মল ঘোষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভয়ার হত্যার দুই বছর পূর্ণ হওয়ার দিন পানিহাটির একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রীও ওই নারী চিকিৎসকের মরদেহ দ্রুত সৎকারের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, অভয়ার মা–বাবার আবেদন উপেক্ষা করে কেন এত দ্রুত মরদেহ সৎকার করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ ছিল, কোনো ধরনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ছাড়াই মরদেহ দাহ করা হয়েছিল।

অভয়ার মরদেহ দাহের সময় পানিহাটি পৌরসভার চেয়ারম্যান সোমনাথ দে ও পৌর কাউন্সিলর সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁদের বিরুদ্ধেও দ্রুত সৎকারের ব্যবস্থা করার অভিযোগ রয়েছে।

নির্মল ঘোষ পানিহাটির সাবেক তৃণমূল বিধায়ক। তাঁকে ওডিশা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে গত ১৩ জুলাই তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সংঘর্ষ এবং এক কোটি টাকার লটারি টিকিট নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তীর্থঙ্কর ঘোষ এবার পানিহাটি বিধানসভা আসনে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন। একই আসনে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন অভয়ার মা রত্না দেবনাথ।

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট রাতে কলকাতার আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্তব্যরত অবস্থায় ওই নারী চিকিৎসক ধর্ষণের শিকার হন এবং পরে মারা যান। তাঁর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হয়। ঘটনার পর মরদেহের সৎকারের প্রক্রিয়া নিয়েও নানা প্রশ্ন ওঠে। এবার সেই সৎকারের ঘটনায় দ্বিতীয় দফায় তদন্ত করছে পুলিশ।