ভারতে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও মিলছে না সিলিন্ডার
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আশ্বাস দিয়েছেন, রান্নার গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ পুরীও সংসদে বলেছেন, অহেতুক উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। পর্যাপ্ত পেট্রল ও ডিজেল মজুত আছে। গ্যাসের সরবরাহও বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
অথচ রান্নার গ্যাস নিয়ে দেশজুড়ে হাহাকার বেড়েই চলেছে। রাজ্যে রাজ্যে অশান্তি ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যানটিনসহ রাস্তার পাশে চালু থাকা অগুনতি চা–নাশতার দোকান। শঙ্কায় পড়েছে বিভিন্ন শিল্প স্থাপনাও।
১০ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত জনগণকে যে সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছিল, ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিও দেশের মানুষকে সেই দিকে ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছে। এতে সরকারও বিচলিত।
রান্নার গ্যাসের আকাল নিয়ে অবিলম্বে আলোচনার দাবিতে বিরোধীরা সরব হলেও লোকসভার স্পিকার অনুমতি দিচ্ছেন না। ফলে আজ শুক্রবার দফায় দফায় লোকসভার অধিবেশন মুলতবি হয়ে যায়। বিরোধীরা সংসদ ভবন চত্বরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করেন।
পরিস্থিতি ক্রমেই গুরুতর আকার নিলেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো বাজেট অধিবেশনে সংসদের কোনো কক্ষেই উপস্থিত হননি। যদিও আজ অন্য এক অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে তিনি বলেন, কোভিড পরিস্থিতির মোকাবিলায় সরকার যেভাবে সফল হয়েছিল, সেভাবে এই সংকট থেকেও দেশ মুক্তি পাবে।
কিন্তু কীভাবে সেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব, রান্নার গ্যাসের সংকট কাটানোর উপায় ঠিক কী, এখনো সেই বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে সরকার পৌঁছে দিতে পারেনি। অভয় দেওয়া সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে, মাঠপর্যায়ে হাহাকার দেশজুড়ে বেড়ে চলেছে। গৃহস্থালির জন্য রান্নার গ্যাসের দ্বিতীয় সিলিন্ডার বুকিংয়ের সময় সরকার ২১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৫ দিন করেছে।
অর্থাৎ একটি সিলিন্ডার চালু থাকার ২৫ দিন আগে দ্বিতীয়টি বুক করা যাবে না। বুকিংয়ের আড়াই দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ করার কথা থাকলেও রাজ্যে রাজ্যে ও শহরে শহরে বুকিং করতেই মানুষকে নাজেহাল হতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বড় শহরের বাইরে ছোট শহর ও গ্রামে গ্যাস বুকিংয়ের সময়সীমা বাড়িয়ে ৪৫ দিন করা হয়েছে।
গৃহস্থালির জন্য রান্নার গ্যাসের দাম ইতিমধ্যেই সিলিন্ডারপ্রতি ৬০ রুপি ও বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম সিলিন্ডারপ্রতি ১১৫ রুপি বাড়ানো হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির হতাশা ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে জোগানের অপ্রতুলতা। সরকারের দাবি ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় কোনো মিলই নেই।
সংকটের সুযোগ সব সময়েই অসাধু ব্যবসায়ীরা নিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। কালোবাজারি ও মজুতদারদের বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি করার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ জারি রাখার জন্য রাজ্যে রাজ্যে ‘এসমা’ আইন জারি করা হয়েছে।
তা সত্ত্বেও রান্নার গ্যাস সরবরাহ নিয়ে মানুষের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। প্রতিটি রাজ্যে গ্যাসের দোকানের সামনে প্রতিদিন লম্বা লাইন পড়ছে। গ্রাহকদের অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অশান্তিও দেখা দিচ্ছে। অভিযোগও অন্তহীন।
গৃহস্থালির সুরাহার কথা সরকারের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে ঠিকই। কিন্তু প্রতিটি শহরের অগুনতি মানুষ ছোট, মাঝারি ও বড় হোটেল, রেস্তোরাঁর, রাস্তার ধারের চায়ের দোকান অথবা ‘পাইস হোটেল’, হাইওয়ের ধারের ধাবা, নানা ধরনের ক্যানটিন—তাদের হাল সবচেয়ে খারাপ। রাজ্যে রাজ্যে, জেলায় জেলায় সরকারি স্কুলে বন্ধ হয়ে গেছে ‘মিড ডে মিল’।
খোদ দিল্লিতে হাইকোর্টের আইনজীবীদের জন্য চালু ক্যানটিনে তিন দিন ধরে রান্না করা গরম খাবার বিক্রি বন্ধ রয়েছে। নোটিশ জারি করে বলা হয়েছে, গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়ায় এই ব্যবস্থা। স্যান্ডউইচ, ফ্রুট সালাদ বা ওই জাতীয় যেসব খাবার রান্না ছাড়াই তৈরি করা যায়, শুধু সেগুলোই বিক্রি হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের অভাবে সমুদ্রে ট্রলারে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না মৎস্যজীবীরা।
নামী হোটেলগুলো ইতিমধ্যেই দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করতে হয়, এমন খাবার মেনু থেকে বাদ দিয়েছে। কালোবাজারে গ্যাস কেনার জন্য সব রান্না করা খাবারের দাম বেড়ে যাচ্ছে। গ্যাসনির্ভরতা কমাতে মানুষ ঝুঁকছে বিদ্যুৎ–চালিত ‘ইনডাকশন কুকার’–এর দিকে। প্রবলভাবে বেড়ে গেছে এ ধরনের কুকারের বিক্রি। আচমকাই মানুষকে পেতে হচ্ছে অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা।
সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশদূষণের মোকাবিলায় নরেন্দ্র মোদি সরকার গরিব মানুষের জন্য চালু করেছিলেন ‘উজ্জ্বলা প্রকল্প’। রান্নার কাজে কাঠ, কয়লা কিংবা ঘুঁটের মতো দূষণ সৃষ্টিকারী জ্বালানি বন্ধ করে গ্যাসের রান্নায় উৎসাহিত করাই ছিল ওই প্রকল্পের লক্ষ্য।
রান্নার গ্যাসের জোগান অনিয়মিত ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীরা অনেকেই পুরোনো পদ্ধতিতে রান্নার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এবার সেই বন্দোবস্তের দিকে তাকাতে সরকারও আগ্রহী হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ নিয়মিত ও স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত মানুষ কাঠ, কয়লা বা ঘুঁটের ব্যবহার করতে পারবেন। আপাতত এক মাসের জন্য এসব ব্যবহারে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
গ্যাস নিয়ে রাজনীতিও উত্তাল। বিরোধীরা সংসদে এ নিয়ে আলোচনার দাবিতে সরব হলেও সরকার পক্ষ অবিচল। শাসক মহলের আক্রমণের লক্ষ্য কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের অভিযোগ, তিনিই মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছেন।
বিজেপি নেতাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাব কমবেশি সব দেশের ওপরেই পড়ছে। পরিস্থিতির মোকাবিলায় সরকার সচেষ্ট। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেউ কেউ অযথা আতঙ্ক ছড়িয়ে নিজেদের স্বরূপ প্রকাশ করে ফেলছেন। তাঁরা দেশের ক্ষতি করছেন।