‘পুশব্যাকে’র অভিযোগে মিজোরামে বিক্ষোভ

যাজকের মৃত্যুর প্রতিবাদে মিজোরামের রাজধানী আইজলে বিক্ষোভ হয় গতকাল সোমবারছবি: সংগৃহীত

উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্য মিজোরামের রাজধানী আইজলে মিজো জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের পুশব্যাকের অভিযোগ এনে গতকাল সোমবার দুপুরে বিক্ষোভ হয়েছে। মিজোরামের প্রভাবশালী ছাত্রযুব সংগঠন সেন্ট্রাল ইয়াং মিজো অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে পাঁচ শরও বেশি মানুষ বিক্ষোভ দেখান রাজধানীর রাজ্যপালের ভবনের সামনে।

কিছুদিন আগে মিজোরামে ঢুকতে এসেছিলেন ৮৫ বছর বয়সী জ্যেষ্ঠ যাজক সমখুপা। ওই যাজককে মিজোরামের ভেতর ঢুকতে দেয়নি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)। দিন সাতেক মিজোরাম এবং সীমান্তবর্তী বনে ঘুরে বেড়ানোর পরে ঠান্ডায় এবং না খেতে পেয়ে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন মিজো সংগঠনের প্রতিনিধিরা এ প্রতিবেদককে জানান।

সেই ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল সোমবারে বিক্ষোভ দেখান মিজোরামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সংগঠনের সদস্যরা। বর্তমানে প্রায় ৫০০ মিজো জাতিগোষ্ঠীর মানুষ মিজোরামে ঢুকে শরণার্থী শিবিরে রয়েছেন বলে অ্যাসোসিয়েশনের তরফে দাবি করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছাত্র সংগঠনের এক নেতা সুরিম রালটেক সোমবার রাতে টেলিফোনে এ প্রতিবেদককে বলেন, ইয়াং মিজো অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা ছাড়াও দুটি ছাত্র সংগঠন মিজো স্টুডেন্টস ইউনিয়ন এবং মিজো জিরলাই এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিল। একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও মিজোরামের নাগরিক সমাজের মানুষও সোমবারের বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন।

খ্রিষ্টান যাজক সমখুপার মৃত্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আর. ললনঘেটা বলেন, ‘আমাদের এক ভাই মারা গিয়েছে। সে আর হাঁটতে পারছিল না। সে কোনোরকমে আমাদের রাজ্যে পালিয়ে এসেছিল শরণার্থী হিসেবে, কিন্তু তাকে পুশব্যাক করা হয়। আমরা মিজোরা এই আচরণের বিরোধিতা এবং প্রতিবাদ করছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শুধু মিজোদের নিয়ে গঠিত একটি বিএসএফ ব্যাটেলিয়ানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে মন্তব্য করে ললনঘেটা বলেন,  ‘আমরা চাই তিনি প্রতিশ্রুতি পালন করুন এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এমন একটি বাহিনী মোতায়েন করুন, যা মিজোদের ভালো–মন্দের খেয়াল রাখবে।’

এই বক্তব্যের থেকে আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে মিজো জিরলাইয়ের সভাপতি লালনুনমাউইয়া পাউটু বলেন, ‘বিএসএফ যদি সারাক্ষণ আমাদের ভাইদের পুশব্যাক করে, তবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’

মিজো স্টুডেন্টস ইউনিয়নের সভাপতি স্যামুয়েল জোথানপুইয়া বলেন, ‘আমরা কখনোই এসব মানুষকে শরণার্থী বলতে পারি না। কারণ, এই মিজোরা শরণার্থী নন। তাঁরা তাঁদের প্রকৃত বাসস্থানে ফিরছেন মাত্র। বিএসএফের অমানবিক ব্যবহার মানা সম্ভব নয়।’

এই প্রসঙ্গে স্যামুয়েল জোথানপুইয়া মিজোদের ইতিহাস সম্পর্কেও ভারত সরকারকে সচেতন করে দেন। তিনি বলেন, কুকি-চিনরা এই ভূমিরই বাসিন্দা। ব্রিটিশ শাসকদের ঔপনিবেশিক নীতির কারণে তারা তিনটি দেশে বিভক্ত হয়ে রয়েছে (বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার)।

স্যামুয়েল জোথানপুইয়া  বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ভারতে থাকতে চাই। আমাদের সম্মান দিতে হবে, যেমনটা অন্য রাজ্যের ক্ষেত্রে দেওয়া হয়। আমরা বলব, ভারত সরকার আমাদের সাহায্য করুক আমাদের মানুষ ও আমাদের জনজাতির সঙ্গে এক হতে। তবে এটাও বলছি, আমরা ভিতু নই, শেষ পর্যন্ত লড়াই করব।’ মিজোরামের বিভিন্ন জেলায় এই দিন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন বিভিন্ন মিজোদের সংগঠন এবং জনগোষ্ঠীর মানুষ।

স্থানীয় বিধানসভার সদস্য এবং বিরোধী নেতা লালদুহোমা স্থানীয় প্রচারমাধ্যমকে বলেন, যাজকের মৃত্যু এড়ানো যেত। কিন্তু কেন তা যায়নি, সেটা একটা প্রশ্ন। কারণ, কেন্দ্রে যে সরকার রয়েছে, তার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে মিজোরামের সরকার। তাদের মধ্যে কেন এত বোঝাপড়ার অভাব, তা বোঝা যাচ্ছে না। এই ঘটনা না ঘটলে আজ সাধারণ মানুষকে এভাবে রাস্তায় নামতে হতো না।

ইয়াং মিজো অ্যাসোসিয়েশনের তরফ থেকে গতকাল কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠিও দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে বলা হয় যে অন্তত ৫০০ মিজো জাতিগোষ্ঠীর মানুষ রাজ্যে প্রবেশ করেছে।

লংটলাই জেলার এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে কিছুদিন আগে জানান, শরণার্থীদের সবাই নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে মিজোরামে ঢুকছেন। বর্তমানে তাঁরা একাধিক ত্রাণশিবিরে রয়েছেন। এই ত্রাণ শিবিরে পরিকাঠামোর অপর্যাপ্ততা নিয়ে নানান অভিযোগ রয়েছে মিজো সংগঠনগুলোর।