মোদির জন্মদিনে প্রদীপ না জ্বালানোয় জরিমানা

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত ‘আশীর্বাদ কা দিয়া’ (আশীর্বাদের প্রদীপ) অনুষ্ঠানে কর্তব্যপথে তেলের প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন মানুষ। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ছবি: রয়টার্স

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনে প্রদীপ জ্বালানোর নির্দেশ ছিল। সরকারি পর্যায়ে তো বটেই, বেসরকারিভাবেও এই নির্দেশ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল দেশের সর্বত্র। সেই অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর, সারা দেশে প্রধানমন্ত্রী মোদির ৭৬তম জন্মদিনটি পালিত হয় প্রজ্বলিত প্রদীপের দীপ্তিতে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। বিতর্কের চরিত্রও বহুমুখী।

বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে জম্মুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম) কর্তৃপক্ষকে নিয়ে। তাদের হুকুম ছিল, সব পড়ুয়াকে প্রদীপ জ্বালানোর সময় হাজির থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর মঙ্গল কামনায় প্রদীপ জ্বালাতে হবে। নইলে ৫০০ রুপি জরিমানা।

এ বিষয়ে আইআইএম স্টুডেন্টস কাউন্সিলের তরফে একটি নির্দেশনামা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর সবাইকে প্রদীপ জ্বালানো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হবে। যদি কেউ অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তাকে কারণ দেখাতে হবে। নির্দেশ অনুযায়ী, একমাত্র অসুস্থতার কারণে কেউ হাজির না থাকতে পারে। তবে সে জন্য আইআইএম কর্তৃপক্ষ নিযুক্ত উপযুক্ত ডাক্তারের (সঞ্জীবনী) সার্টিফিকেট থাকা দরকার। তাতে ডাক্তারকে জানাতে হবে, সংশ্লিষ্ট ছাত্র এতটাই অসুস্থ যে তার বিছানা ছাড়ার উপায় নেই। এ ছাড়া অন্য কোনো ওজর আপত্তি গ্রাহ্য হবে না। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পড়ুয়ার ৫০০ রুপি জরিমানা হবে।

নির্দিষ্ট দিনে আইআইএম জম্মুর প্রশাসনিক ভবনের সামনে সেই অনুষ্ঠান হয়। তাতে অংশ নেন স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক যুধবীর শেঠি ও আইআইএম জম্মুর পরিচালক অধ্যাপক বি এস সহায়।

জরিমানার ওই সিদ্ধান্ত নিয়েই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। ওই অনুষ্ঠানে হাজির হননি বেশ কিছু পড়ুয়া। তাঁদের শৃঙ্খলাভঙ্গের নোটিস পাঠানো হয়েছে। বলা হয়, নোটিস প্রাপ্তির এক দিনের মধ্যেই জবাব দিতে হবে। জবাব যুক্তিযুক্ত মনে না হলে ৫০০ রুপি জরিমানা। জম্মু–কাশ্মীর কংগ্রেসের ভারপ্রাপ্ত নেতা সৈয়দ নাসির হুসেন প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালনে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হবে? কেন প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রচারের দায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপানো হবে? এটা তো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ হতে পারে না?

বিহারের আরজিডে নেতা ও সাংসদ সুহাকর সিংও এই ঘটনার নিন্দা করে এক বিবৃতি দিয়েছেন। তাতে বলেছেন, কেন জরিমানা? কেন জন্মদিনের প্রদীপ জ্বালানো বাধ্যতামূলক করা? এর চেয়ে ভালো হবে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় একটা ঘোষণা জারি করুক, যারা ‘মোদি মোদি’ করবে না, মোদি বন্দনায় অংশ নেবে না, তাদের আইআইএম বা আইআইটিতে ভর্তিই করানো হবে না।

জম্মু আইআইএম কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে, কোনো ছাত্রের কাছ থেকে জরিমানার টাকা নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে।

গত শনিবার মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ‘ছাত্রো কি গুঞ্জ’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পরের দিন ‘এক্স’ হ্যান্ডলে তিনি এই প্রসঙ্গ তোলেন। তির্যক ভঙ্গিতে রাহুল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে সরকার কোটি কোটি রুপি খরচ করে রাজ্যে রাজ্যে প্রদীপ জ্বালাচ্ছে। অথচ ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য হোস্টেল তৈরি করতে পারে না। সে জন্য টাকা বরাদ্দ হয় না। সরকারের সমালোচনা করে বলেন, বহু ছাত্রী থাকার অসুবিধার জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।’ প্রধানমন্ত্রীকে ট্যাগ করে ওই ‘এক্স’ বার্তায় ছাত্রীদের অসুবিধার উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘এই বাচ্চা মেয়েটির প্রশ্নের উত্তর কি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আছে?’

প্রদীপ জ্বালানো নিয়ে নানা মহলে নানা রকম কথাও হচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভিডিও পোস্ট করেছেন। তাতে দেখা যায়, ভাঙাচোরা আসবাবহীন দরজা–জানালাহীন জরাজীর্ণ এক আদিবাসী স্কুল–বাড়িতে একটি জ্বলন্ত প্রদীপ রেখে তিনি বলছেন, প্রিয় মোদিজি, আপনি প্রদীপ জ্বালাতে বলেছেন। এই প্রদীপ আপনার জন্য। এই ভাঙাচোরা স্কুল–বাড়ি আপনার অবদান। আপনার বারো বছরের শাসনের নিদর্শন।

দিল্লি, বিহার, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটসহ বিভিন্ন বিজেপিশাসিত রাজ্যে মোদির জন্মদিন প্রদীপ জ্বালিয়ে পালিত হয়। সে জন্য সরকারি নির্দেশ জারি করা হয়। স্কুল, কলেজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ জন্য নির্দেশ জারি করা হয়। অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আশীর্বাদের প্রদীপ’। সবাই নির্দেশ পালন করছে কি না, তা জানতে প্রত্যেককে ভিডিও করে নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠাতে বলা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে এক মাসের এক কর্মসূচি নিয়েছে বিজেপি। তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সেবা সংকল্প অভিযান’। আগামী ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ওই অভিযান চলবে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এই সরকারি প্রচেষ্টার কড়া সমালোচনা করেছে। পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ (পিইউসিএল) এই ‘স্তাবকতার’ সমালোচনা করে বলেছে, এভাবেই স্বাধীন চিন্তা ও ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার গলা টিপে ধরা হচ্ছে। জন্ম দেওয়া হচ্ছে স্তাবক শ্রেণির।