আরএসএসের নিয়ন্ত্রণমুক্ত বিজেপি, নতুন সভাপতি নীতিনের খুঁটির জোর কোথায়

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নতুন সভাপতি নীতিন নবীনছবি: এএনআই

এখন হয়তো বলা যেতে পারে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) হাত ছেড়ে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এবার সত্যি সত্যিই সাবালক হলো। এই প্রথম এমন একজনকে দলের সভাপতি বেছে নেওয়া হলো, যিনি সংঘের আঙিনায় বড় হননি, সংঘের শাখা থেকে উঠে আসেননি এবং যাঁর বয়স মাত্র ৪৫! নীতিন নবীনের মতো এত কম বয়সে আজ পর্যন্ত কেউ কখনো বিজেপির সভাপতি হতে পারেননি। দলের শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার আগে এমন ‘অজ্ঞাতকুলশীল’ও কেউ ছিলেন না।

সংঘের হাত ছেড়ে বিজেপি যে একা একা হেঁটে চলে বেড়ানোর মতো সাবালকত্ব অর্জন করে ফেলেছে, সংগঠনে নীতিন নবীনের উত্তরণ তারই প্রমাণ। নীতিনকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে এই বার্তাও দেশের কোণে কোণে পৌঁছে দেওয়া গেল, আগামী দিন বিজেপি চালিত হবে শুধু নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর ইচ্ছানুযায়ী। তাঁরাই প্রথম, তাঁরাই শেষ কথা। যন্ত্রী তাঁরাই, নীতিন নবীন যন্ত্র মাত্র।

অথচ, গত এক বছর ধরে সভাপতি পদে কাউকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবল দড়ি টানাটানি চলছিল আরএসএস ও মোদি–শাহর মধ্যে। সংঘ চাইছিল এমন একজনকে, যিনি সংঘের আদর্শে লালিত ও পালিত, সংঘের চেতনায় দল পরিচালনা করবেন। কিন্তু মোদি–শাহ জুটি চাইছিলেন তাঁদের অনুগত কাউকে বেছে নিতে যাতে সরকার ও দলের কাজেকর্মে সামঞ্জস্য থাকে, সরকারি সিদ্ধান্ত রূপায়ণে দল থেকে বাধা পেতে না হয়। এক কথায়, সরকারের সফল পরিচালকেরা চাইছিলেন তাঁদের অনুগত ও বিশ্বাসভাজন কাউকে দলের সভাপতি হিসেবে দেখতে, যাতে নিশ্চিন্তে থাকা যায়। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর সেই অদৃশ্য লড়াইয়ে মোদি–শাহ জুটিই জয়ী হলেন। নীতিন নবীনের উত্তরণ মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে সংঘও বুঝিয়ে দিল, নীতি ও আদর্শের সঙ্গে বাস্তববাদী রাজনীতির সংঘাতে নরেন্দ্র মোদিকে অসুবিধার মধ্যে ফেলতে তারা রাজি নয়।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নীতিন নবীন সভাপতি হলেন তিন বছরের জন্য। স্পষ্টতই, ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচন তাঁকে সামনে রেখেই মোদি–শাহর বিজেপি লড়তে চলেছে।

নীতিন বিহারী। অবিভক্ত বিহারের ঝাড়খন্ডে ১৯৮০ সালের মে মাসে তাঁর জন্ম। জাতপাত সর্বস্ব বিহারী রাজনীতিতে তিনি উচ্চবর্ণ। কায়স্থ। বাবা নবীন কিশোর প্রসাদ সিনহা বিজেপির বিধায়ক ছিলেন। ২০০৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর নীতিনের রাজনীতিতে আসা। সেই অর্থে তিনিও পরিবারবাদী রাজনীতিক, যে দোষে বিজেপি বরাবর কংগ্রেসসহ অন্যদের গালমন্দ করে আসছে।

বিহার নির্বাচনের আগেও নীতিন ছিলেন অজ্ঞাত। যদিও তিনি নীতীশ মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। সড়ক ও নগরোন্নয়নের পাশাপাশি আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেছেন। সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটের আগে অমিত শাহই তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন সংগঠক হিসেবে। বিহারের বাইরে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ছত্তিশগড়ের। তারপর দিল্লি বিধানসভার ভোটেও। তাঁর মধ্যে অমিত শাহ নিশ্চিতই এমন কিছু দেখেছিলেন, যার দরুন তাঁকে বেছে নিতে দেরি করেননি। নীতিনও নিশ্চিতই বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন। নইলে এই বয়সে বিহারের ভোটের দায়িত্বও তাঁর হাতে ছেড়ে দেওয়া হতো না। বিহারের বিপুল জয় বুঝিয়ে দেয় অমিত শাহর পছন্দ ভুল ছিল না। সংঘ পরিবারও তা মেনে নিতে বাধ্য হয়। রাজনীতিতে ভোটে জেতাই প্রথম ও শেষ কথা। সাফল্যই একমাত্র মাপকাঠি। মোদি–শাহ জুটির সেই সাফল্যকে অস্বীকার ও উপেক্ষা করার মতো অবস্থা এই মুহূর্তে আরএসএসের নেই। নীতিনের বিজেপি সভাপতি হওয়া বুঝিয়ে দিচ্ছে সরকার ও দল পরিচালনার ক্ষেত্রে সংঘ নয়, মোদি–শাহর ইচ্ছাই প্রথম ও শেষ কথা।

শুধু নীতিনই নন, বিহার নির্বাচনের আগে ও পরে সম্রাট চৌধুরীকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়েও মোদি–শাহ জুটি তাঁদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নজির রেখেছিলেন। নীতীশ মন্ত্রিসভায় সম্রাটকে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়। দল ও সংগঠনে মোদি–শাহ জুটির ছায়া যে ক্রমশ বড় হচ্ছে, আরএসএসও তা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে, সেটা ছিল তার বড় উদাহরণ। নীতি ও আদর্শের চেয়েও বাস্তববাদী রাজনীতি যে বেশি গ্রহণযোগ্য, সম্রাট চৌধুরীর উত্তরণ ছিল তার প্রমাণ। সম্রাট ছিলেন লালু প্রসাদের দল আরজেডির নেতা। তাঁর বাবা শকুনি চৌধুরী ছিলেন লালু–ঘনিষ্ঠ। আরএসএসের সঙ্গে তাঁদের বিন্দুমাত্র যোগাযোগও কোনোকালে ছিল না। সেই সম্রাটকে মোদি–শাহ শুধু বিজেপিতেই টানলেন না, সরকারে গুরুদায়িত্ব দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, আদর্শ ও নীতির চেয়েও বাস্তববাদী রাজনীতি তাঁদের কাছে বড়। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার মতো সম্রাট চৌধুরী ও নীতিন নবীনরা সেই ধারবাহিকতারই অংশ।

নীতিন নবীনকে বিজেপি সভাপতি করার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে দল কীভাবে এগোবে, তারও একটা ইঙ্গিত মোদি–শাহ দিতে চেয়েছেন। বিহার জিততে মোদি ও শাহ টিকিট বণ্টনের সময় বেশি নজর দিয়েছিলেন অনগ্রসর শ্রেণির দিকে। জাত গণনার দাবি তুলে কংগ্রেস ও আরজেডি দলিত ও অনগ্রসরদের মন জিততে চেয়েছিল। টিকিট বণ্টনের ক্ষেত্রেও ওই দুই দল এই শ্রেণির প্রতি বেশি নজর দিয়েছিল। বিজেপিকেও সেই রাস্তায় হাঁটতে হয়েছে। জাতপাতভিত্তিক বিহারে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের ভোট হারানোর একটা শঙ্কা ওই মনোভাব থেকে দেখা গিয়েছিল। কায়স্থ নীতিনকে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে বেছে নিয়ে সেই শঙ্কা বিজেপি দূর করতে চেয়েছে। নীতিনের প্রথম বড় পরীক্ষা অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গ। ইতিমধ্যেই তিনি পশ্চিমবঙ্গ সফরের তোড়জোড় শুরু করেছেন। এই রাজ্য জিততে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহর পরিকল্পনা মসৃণভাবে রূপায়ণ করার গুরুদায়িত্ব তাঁর। মোদি তাঁকে ইতিমধ্যেই ‘আমার বস’ বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন নীতিন তাঁর ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটাবেন। নীতিনের সুবিধা এটাই যে পশ্চিমবঙ্গে সফল না হলে কেউ তাঁকে দোষারোপ করবে না। সবাই জানে, জিতলে কৃতিত্ব মোদি–শাহর, হারলে তার দায়ও তাঁদেরই। নীতিন নবীন সভাপতি হলেও দলের চাবি ও রিমোট রয়েছে অন্যত্র। নীতিন যন্ত্র, অমিত শাহ যন্ত্রী।