বাংলাভাষী মুসলমান, রোহিঙ্গা ও দলিতদের নিয়ে ভারতকে জাতিসংঘের কড়া বার্তা
ভারতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এবং সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এসব মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভারতকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘের একটি নজরদারি কমিটি এ কথা জানিয়েছে।
জাতিসংঘের জাতিগত বৈষম্য বিলোপবিষয়ক কমিটি (সিইআরডি) আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেছে। তারা জানিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এ দেশে বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধ (হেট ক্রাইম) ঘটছে। এগুলো বন্ধে ভারতকে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কমিটি একটি বিষয়ে বিশেষভাবে আলোকপাত করেছে। কমিটি বলছে, রোহিঙ্গা, বাংলাভাষী মুসলমান, সাধারণ অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের লক্ষ্য করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান বেড়েছে।
কমিটি তাদের তদন্তের পর দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবরে কমিটি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপর এসব ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে তফসিলি উপজাতি, তফসিলি জাতি—বিশেষ করে দলিত সম্প্রদায় এবং যাঁরা ভারতের নাগরিক নন, তাঁরাও রয়েছেন।’
এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে রয়েছে জাতিগত বিদ্বেষ থেকে তৈরি সহিংসতা ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ। এ ছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যা, কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ইচ্ছেমতো দীর্ঘদিন আটকে রাখা, নির্যাতন, অসদাচরণ ও যৌন সহিংসতার মতো ঘটনাও ঘটছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে রয়েছে জাতিগত বিদ্বেষ থেকে তৈরি সহিংসতা ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ। এ ছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যা, কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই ইচ্ছেমতো দীর্ঘদিন আটকে রাখা, নির্যাতন, অসদাচরণ ও যৌন সহিংসতার মতো ঘটনাও ঘটছে।’
এ ধরনের সব অভিযোগ তদন্ত করে দেখার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিটি। একই সঙ্গে এসব ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচারের আওতায় আনতে বলা হয়েছে।
সিইআরডির মতামত বা সুপারিশগুলো মানতে কোনো দেশ আইনগতভাবে বাধ্য নয়। তবে এসব সুপারিশ কোনো দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
ভারতে সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বর্ণপ্রথা এখনো একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। সম্পদ, শিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কে কতটা পাবে, তা অনেক সময় এই বর্ণপ্রথাই নির্ধারণ করে দেয়।
হাজার বছরের পুরোনো এ সামাজিক প্রথা হিন্দুদের পেশা ও সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরে ভাগ করেছে।
কমিটির আগের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এর সদস্য স্টামাতিয়া স্তাভরিনাকি বলেন, দলিতদের ক্ষেত্রে বৈষম্য বা ভেদাভেদ যে সত্যিকার অর্থে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, তা প্রমাণ করার মতো সূচক বা তথ্য থাকাটা খুব জরুরি।
কমিটি জানিয়েছে, জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে রাস্তায় আটকে পুলিশি তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ফলে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই অনেককে ইচ্ছেমতো গ্রেপ্তার করে আটকে রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের খবরও পাওয়া গেছে।
সিইআরডি হলো ১৮ জন স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের একটি কমিটি। এ কমিটির ১৮২টি সদস্যদেশ রয়েছে। সদস্যদেশগুলো সব ধরনের জাতিগত বৈষম্য দূর করার সনদ ঠিকমতো মেনে চলছে কি না, তা নজরদারি করে এ কমিটি।
সনদটি ১৯৬৯ সালে কার্যকর হয়। এটির অধীন সদস্যদেশগুলোকে অবশ্যই জাতিগত বৈষম্য ও মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করতে হবে। একই সঙ্গে আইনের চোখে সবার সমানাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
রোহিঙ্গা ও আশ্রয়প্রার্থী
চলতি মাসের শুরুর দিকে সিইআরডির পর্যালোচনায় অংশ নিয়েছিল ভারত। ২০০৭ সালের পর এটিই ছিল তাদের প্রথম অংশগ্রহণ। ভারতের প্রতিনিধিদলটির নেতৃত্ব দেন দেশটির সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা।
কমিটি একটি বিষয়ে বিশেষভাবে আলোকপাত করেছে। তারা বলছে, রোহিঙ্গা, বাংলাভাষী মুসলমান, সাধারণ অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের লক্ষ্য করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান বেড়েছে।
কমিটি জানিয়েছে, জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে রাস্তায় আটকে পুলিশি তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ফলে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই অনেককে ইচ্ছেমতো গ্রেপ্তার করে আটকে রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের খবরও পাওয়া গেছে।
যাদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা প্রয়োজন, তাদের জোর করে দেশে ফেরত পাঠানো বা তাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি।
এসব জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হওয়া ‘বৈষম্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও বিদ্বেষমূলক অপরাধ’ জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা করার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিইআরডি। তাদের অধিকার রক্ষা করতে এবং গণহারে তাড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
এক সংবাদ সম্মেলনে স্তাভরিনাকি বলেন, জবাবদিহির অভাব এক বড় চিন্তার বিষয়। কারণ, যদি আইন থাকে কিন্তু তার প্রয়োগ না হয়, তবে ‘বিদ্বেষমূলক অপরাধ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়’।
কমিটির এই সদস্য আরও বলেন, ভারতের ক্ষেত্রে আরেক বড় ঘাটতি হলো ‘ব্যক্তিগত পর্যায়ে জাতিগত বৈষম্যকে আইনে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি’।
স্তাভরিনাকি জানান, আলোচনায় ভারত দাবি করেছে, তারা মানবাধিকারকর্মীদের সম্মান করে। তবে তিনি বলেন, বাস্তবে মানবাধিকারকর্মীদের যে হুমকি, বিদ্বেষমূলক অপরাধ, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও নেতিবাচক পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়, তা পুরোপুরি রোধ বা সমাধান করা হচ্ছে না।
এ পর্যালোচনার পর ভারতের মিশন এক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের প্রতিনিধিদল ভারতের ‘বহুত্ববাদ, বৈচিত্র্য, (দেশের) বিশালতা ও জটিলতা এবং সাংবিধানিক ও আইনি সুরক্ষার’ বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ‘সব ভারতীয়র জন্য সমতা, মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের যাত্রা অব্যাহত রয়েছে।’