দিল্লির অত্যাচারের জবাব ব্যালটে দিতে বললেন মমতা, তৃণমূল হারবে বলে আত্মবিশ্বাসী মোদি

নরেন্দ্র মোদি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ফাইল ছবি

বাংলা নববর্ষের সকালে বঙ্গবাসীর ওপর অত্যাচার ও জুলুমের বদলা নেওয়ার ডাক দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যবাসীর উদ্দেশে আজ বুধবার সকালে এক ভিডিও বার্তায় গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোট বাক্সে জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসুন, আজকের এই শুভ দিনে আমরা সমবেতভাবে শপথ নিই, সব রকম সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসব। কোনো বিভেদকামী স্বৈরাচারী শক্তি যেন আমাদের চিরকালীন শান্তি, ঐতিহ্যগত সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন ছিন্ন করতে না পারে।’

আজ সকাল নয়টায় ‘এক্স’ হ্যান্ডলে প্রচারিত ২ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিও বার্তায় মমতা কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপির নাম করে সমালোচনা করেন। বিজেপির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রের জমিদারেরা অনেক অত্যাচার করছে। ভোট কাটছে। অনধিকার প্রয়োগ করছে। বিজেপি ভ্যানিশ ওয়াশিং মেশিন। সব এজেন্সি দিয়ে বাংলার ওপর জুলুম ও অত্যাচার করছে। এই অত্যাচারের বদলা নিন।’

ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে মমতা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বাংলার জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি নিজে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে ৩২ লাখ বাদ যাওয়া মানুষের নাম তুলিয়েছি। বাকি যাঁরা আছেন, তাঁদেরও নাম আজ না হয় কাল উঠবে। এসআইআরের দরুন যাঁদের ভোট কাটা গেছে, যাঁরা আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের জন্য আমার মন কাঁদে। আমি জানি পরিবারের চারজন ভোট দেবেন অথচ একজন দিতে পারবেন না, সেটা কেউ মেনে নিতে পারে না।’

মমতা বলেন, ‘ওরা অনেক চমকাচ্ছে দিল্লি থেকে। দাঙ্গা নয়, রক্ত নয়, সন্ত্রাস নয়, অত্যাচার নয়, চমকানি নয়, আসুন আমরা নতুন ভোর নিয়ে আসি শান্তি, সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির বার্তা দিয়ে।’ মমতা তাঁর বার্তা শেষ করেছেন গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হয়ে ভোট প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। জানাতে ভোলেননি, রাজ্যের ২৯৪ আসনে তিনিই প্রার্থী।

নববর্ষের এই বার্তার ২৪ ঘণ্টা আগে মঙ্গলবার এক ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গ জয় করার ছয়টি ‘দাওয়াই’ বিজেপির বুথকর্মীদের শিখিয়ে দেন। বাছাই করা বুথকর্মীদের কথা শোনার পর সেই দাওয়াই বাতলে মোদি তাঁদের বলেন, সবচেয়ে জরুরি বিষয় বুথ কামড়ে পড়ে থাকা। বুথে বুথে যান। মানুষের কাছে দলের কথা তুলে ধরুন। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দেওয়া দলের অভিযোগ ও নিজেদের ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা বোঝান।

দুই. মোদি বলেছেন, নারী ও যুব সম্প্রদায়ের সঙ্গে বেশি করে কথা বলুন। ছোট ছোট জমায়েত করে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করুন। তাঁদের বলুন, আজ তৃণমূল মাথা নিচু করে ভোট চাইছে, ক্ষমতায় ফিরলে তারা কিন্তু অন্য রূপ নেবে।

তিন. বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাতে হবে, ভয়ের পরিবেশে কলকারখানা হয় না। ব্যবসা-বাণিজ্য হয় না। তৃণমূল সরকারই সবচেয়ে বড় ভয়।

চার. মতুয়া ও নমঃশূদ্রদের মনে আস্থা ফেরাতে হবে। তাঁদের বোঝাতে হবে, ভয় নেই, সিএএ মারফত তাঁদের এ দেশে রাখার ব্যবস্থা সরকার করবে। তাঁদের ভয় ও শঙ্কা দূর করতে হবে।

পাঁচ. শুধু জয় নয়, জয়ের ব্যবধান বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে বলেছেন মোদি। তিনি বলেন, তৃণমূল যে এবার হারছে, সেই বিশ্বাস চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে।

ছয়. কৃষকদের, বিশেষ করে রাজ্যের আলুচাষিদের কাছে গিয়ে তৃণমূলের ‘সিন্ডিকেট–রাজ’-এর চরিত্র ফাঁস করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তৈরি বিজেপির অভিযোগপত্রে মোট ছয়টি নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সেই গ্যারান্টিগুলোই বিজেপির রোডম্যাপ। ভোটারদের কাছে তা তুলে ধরতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পর্বের ভোট ২৩ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় পর্বের ভোট ২৯ এপ্রিল। এত দিন ধরে নির্বাচন কমিশন রাজ্যের ‘সন্দিগ্ধ’ আমলাদের বদলি করছিল। ইতিমধ্যে ৪৫০ জনের বেশি পদস্থ পুলিশ ও আমলাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এত বদল কোনো রাজ্যে কখনো হয়নি। পশ্চিমবঙ্গেও নয়। এখন ভোট শুরুর আগে অর্থ পাচার মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তারি শুরু হয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট পরিচালনা সংস্থা ‘আইপ্যাক’-এর কর্ণধার বিনেশ চান্দেলকে গত সোমবার ইডি গ্রেপ্তার করেছে। মঙ্গলবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক জৈনর স্ত্রী ও ভাইকে। কিছুদিন আগে এই সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক জৈনর বাড়ি ও দপ্তরে তল্লাশি করেছিল ইডি। তল্লাশি চলাকালে হাজির হয়ে সেখান থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ ও ল্যাপটপ নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তা নিয়ে এখন মামলা চলছে।

মুখ্যমন্ত্রীর আশঙ্কা, ভোটের ঠিক আগে দলের কোনো কোনো নেতাকেও ইডি, সিবিআই গ্রেপ্তার করতে পারে। তিনি সবাইকে সতর্ক করে বলেছেন, বিভিন্ন অভিযোগে দলের যেসব নেতাকে এর আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, তাঁদের গ্রেপ্তার করে দলকে চাপে ফেলার ছক কষেছে বিজেপি।

মমতার শঙ্কা, বুথ স্তরের কর্মীদেরও ভোটের আগে গ্রেপ্তার করা হবে। বিভিন্ন জনসভায় মমতা এ অভিযোগ জানিয়ে বলছেন, এত কিছু করেও বিজেপি জিতবে না। একজন বন্দী হলে হাজার হাজার কর্মী তৈরি আছেন।