মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কি রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগই ধনখড়ের কাল হলো

সঞ্জয় রাউতের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে (বাঁ থেকে) ডেরেক ওব্রায়ান (তৃতীয়), কপিল সিবাল (চতুর্থ) ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল (পঞ্চম)। ২৩ মার্চ ২০২৬, নয়াদিল্লিছবি: সংগৃহীত

ভারতের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়ের পদত্যাগের কারণ কি তাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাব, যা কেন্দ্রীয় সরকারের পছন্দ হচ্ছিল না? সেই কারণেই তাঁকে কি পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল? প্রায় এক বছর ধরে চলা এই রাজনৈতিক জল্পনার অবসান ঘটিয়েছেন শিবসেনা (উদ্ধব) নেতা রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় রাউত।

সদ্য প্রকাশিত এক বইয়ে সেই রহস্য উদ্ঘাটন করে রাউত লিখেছেন, নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে হঠাৎ রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যত হওয়ায় এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) সক্রিয় হয়ে ওঠে। উপরাষ্ট্রপতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।

সঞ্জয় রাউতকে বেআইনিভাবে অর্থ পাচারের অভিযোগে ইডি গ্রেপ্তার করেছিল ২০২২ সালে। ১০০ দিন মুম্বাইয়ের আর্থার জেলে বন্দী থাকার পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। কারাবাসের দিনগুলোর অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে মারাঠি ভাষায় তিনি একটি বই লিখেছেন, ‘নরকাটলা স্বর্গ’, যার অর্থ ‘নরকের স্বর্গ’।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে সেই বইয়েরই ইংরেজি অনুবাদ ‘আনলাইকলি প্যারাডাইস’–এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে অন্যান্যের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সেই দলের রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় সিং, কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং, তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ডেরেক ওব্রায়ান, সাকেত গোখলে, বিশিষ্ট আইনজীবী কপিল সিব্বাল।

ধনখড় যে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, ইস্তফা দিতে তাঁকে যে বাধ্য করা হয়েছিল, এই জল্পনা রাজনৈতিক মহলে শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু কী কারণে সেই পদক্ষেপ, এত দিন জানা যায়নি। সঞ্জয় এই বইয়ে তারই উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মরুরাজ্য রাজস্থানের জয়পুরে ধনখড় দম্পতি নিজেদের বাড়ি বিক্রি করে দেন। বাড়ি বিক্রির কিছু টাকা তাঁরা নাকি বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। ইডি সেই তথ্য জোগাড় করে।

সরকারের বিরুদ্ধে ধনখড় কিছু পদক্ষেপ করতে চলেছেন অনুমান করে ইডি সেই ফাইল তাঁর কাছে পেশ করে এবং পদত্যাগ করার ইঙ্গিত দেয়। বইয়ে সঞ্জয় লিখেছেন, ধনখড় প্রাথমিকভাবে সেই প্রস্তাবে আপত্তি জানালে ইডির খানাতল্লাশি বেড়ে যায়। তিনি অসহায় বোধ করতে থাকেন। একসময় ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।

জগদীপ ধনখড় ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি, যিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের কারণ ছিল ভগ্ন স্বাস্থ্য।

শুধু ধনখড়ই নন, ওই বইয়ে আরও অনেক পুরোনো বিতর্কের উপস্থাপনা করা হয়েছে। যেমন দেশের সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসার পদত্যাগ। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের প্রচারে বিভিন্ন জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বিরুদ্ধে আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন সুনীল অরোরা।

ওই সময় অশোক লাভাসা ছিলেন তিন সদস্যের কমিশনের অন্যতম সদস্য। কমিশনের দুই সদস্য মোদি ও শাহকে ‘ক্লিনচিট’ দিলেও লাভাসা ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। তাঁর মতে মোদি–শাহ আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছিলেন এবং সেই ভিন্নমত তিনি লিপিবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা তাঁকে করতে দেওয়া হয়নি।

এরপর লাভাসার স্ত্রী ও মেয়ের বিরুদ্ধে আয়কর বিভাগ থেকে নোটিশ পাঠানো হয়। জেরা করা হয়। তল্লাশি চালানো হয়। ২০২০ সালে অশোক লাভাসা নির্বাচন কমিশনের সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ান ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন।

ভারতের সাবেক উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়
ছবি: এএনআই

সঞ্জয় রাউত এই বিষয়টিরও উল্লেখ করেছেন তাঁর বইয়ে। তিনি লিখেছেন, আদর্শ অচরণবিধি লঙ্ঘনের ৮টি অভিযোগ কমিশনের কাছে এসেছিল। লাভাসা চেয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের আস্থা অটুট রাখতে। তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই চাপের কাছে মাথা নোয়াতে চাননি।

সেই কারণে প্রত্যাশিতভাবেই লাভাসা ও তাঁর পরিবারকে প্রচণ্ডভাবে ভুগতে হয়েছিল। ইডির তল্লাশি তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল। রাউত লিখেছেন, ২০২০ সালে অশোক লাভাসা নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগ করেন। তারপরও তাঁর ওপর নজরদারি জারি চলেছিল।

কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ইউপিএ সরকারের আমলে গুজব ছড়িয়েছিল, গোধরাকাণ্ডের পর গুজরাট দাঙ্গার জন্য নরেন্দ্র মোদি গ্রেপ্তার হতে পারেন। মোদি সেই সময় ছিলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী।

সেই ঘটনাবলির উল্লেখ করে সঞ্জয় রাউত তাঁর বইয়ে লিখেছেন, শারদ পাওয়ার তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন।  শারদ পাওয়ার সেই সময় ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। মোদির গ্রেপ্তারিতে তিনি মত দিতে পারেননি।

রাউত লিখেছেন, সেই সময় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনার সময় পাওয়ার বলেন, রাজনৈতিক মতানৈক্য যাই থাকুক, একজন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে কারাগারে পাঠানো ঠিক নয়।

নিজের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে কথা বলছেন সঞ্জয় রাউত। ২৩ মার্চ ২০২৬, নয়াদিল্লি
ছবি: সংগৃহীত।

রাউত লিখেছেন, অনেকেই ওই অভিমত সমর্থন করেছিলেন। মোদিকে কারাগারে পাঠানোর পক্ষে ছিলেন না। মোদি কি সেই বদান্যতা ও রাজনৈতিক নৈতিকতার কথা মনে রেখেছেন?

বইয়ে অমিত শাহর প্রসঙ্গও এনেছেন সঞ্জয় রাউত। তাঁর অভিযোগ, একাধিক মামলায় অভিযুক্ত অমিত শাহ শরণাপন্ন হয়েছিলেন শারদ পাওয়ার ও শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের। সে সময় শাহর জামিনের বিরোধিতা করেছিল সিবিআই। সেই কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থায় তখন মহারাষ্ট্র ক্যাডারের এক কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি শাহর জামিনের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।

অমিত শাহ তখন শরদ পাওয়ার ও বাল ঠাকরের কাছে যান। বাল ঠাকরেকে তিনি বলেন, আপনি যদি বিচারককে বলেন, উনি শুনবেন। আপনার অনুরোধ ফেলতে পারবেন না।

রাউত লিখেছেন, বালাসাহেব ডেকে পাঠিয়েছিলেন শিবসেনার বিশিষ্ট নেতা ও মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মনোহর যোশিকে। বিচারকের নাম ও তাঁকে কী বলতে হবে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যোশিকে। সঞ্জয় লিখেছেন, তার পর থেকে অমিত শাহর রাজনৈতিক জীবনের লেখচিত্র বদলে যায়।